তোমরা অনেকে গলদঘর্ম হচ্ছ তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এই গুমট গরমে কোন আক্কেলে জামা কাপড় পরে আছ? শিশু আর পশুর মতন সরল হও, সব টান মেরে খুলে ফেলে দাও, সর্বাঙ্গে হাওয়া লাগুক। এই গরম দেশে বৎসরে ন মাস ধুতি পাঞ্জাবি প্যাণ্ট শার্ট ব্লাউজ একেবারেই অনাবশ্যক, স্বচ্ছন্দে দিগম্বর হয়ে থাকতে পার। শুধু মাথায় একটা পাতলা ধাতুর টুপি আর পায়ে এক জোড়া জুতো, এ ছাড়া কিছুই পরবে না। তবে হাঁ, কাঁধ থেকে ফিতে দিয়ে একটা ঝুলি ঝোলাতে পার, তাতে টাকাকড়ি নোটবুক, পেনসিল কলম রুমাল ইত্যাদি থাকবে। আরশি পাউডার মুখে আর গায়ে লাগাবার রংও তাতে রাখতে পার। অবশ্য শীতের সময় সবাই উপযুক্ত জামা কাপড় পরবে রবার বা প্লাস্টিকের। ইওরোপ আমেরিকার মেয়েদের তবু একটু বুদ্ধি আছে, তারা ক্রমশ দিগম্বরী হচ্ছে। কিন্তু ওখানকার পুরুষরা বড় বোকা আর লাজুক, অনর্থক কাপড়ের বোঝা বয়ে বেড়ায়। তোমরা ভাবছ আমি নিজের শরীর আগাগোড়া ঢেকে রেখেছি কেন। ভুল বুঝেছ আমার অঙ্গে যা দেখছ তা বস্ত্র নয়, এই পৃথিবীর ভীষণ অভিকর্ষের চাপে পাছে আমার হালকা শরীরটি চেপটে যায় এবং এখানকার অত্যধিক অক্সিজেন পাছে বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে তাই বর্ম ধারণ করেছি। এই বর্মের অভ্যন্তরে আমি সদ্যোজাত শিশুর মতন নেংটা।
তোমাদের এই পৃথিবীতে পুরুষের তুলনায় নারীর অবস্থা বড় মন্দ দেখছি। ভোট আর জীবিকার ক্ষেত্রে, পুরুষের সমান অধিকার পেলেও স্ত্রীজাতির সুবিধা হবে না। গহনা আর শৌখিন বস্ত্রে ওদের ভুলিয়ে রাখলেও ন্যায়বিচার হবে না। ওদের দুর্দশার কারণ প্রাকৃতিক। মানুষ জাতির স্ত্রীরা গর্ভধারণ করে কিন্তু পুরুষরা করে না, প্রকৃতির এই পক্ষপাতের ফলে স্ত্রীজাতি পূর্ণভাবে আত্মনির্ভর হতে পারে না, পুরুষ কিংবা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ না পেলে তাদের চলে না। কুমারী থাকলে অথবা গর্ভরোধ করলে অবস্থার উন্নতি হবে না। প্রাণী মাত্রেই সন্তান চায়, এই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা দমন করা অন্যায়। একমাত্র উপায়—স্ত্রী আর পুরুষের ভেদ লোপ করা, অর্থাৎ স্ত্রী যেমন মাঝে মাঝে গর্ভবতী হয় পুরুষও তেমনি মাঝে মাঝে গর্ভবান হবে। স্ত্রী আর পুরুষ দুরকম মানুষ থাকাই অন্যায়। যেমন শামুক প্রভৃতি কয়েক প্রকার প্রাণী তেমনি আমরা মাঙ্গলিকরা উভয়লিঙ্গ হার্মাফ্রোডাইট, প্রত্যেকেই অর্ধনারী অর্ধপুরুষ। আমাদের স্বামী—স্ত্রী ভেদ নেই। কিন্তু দম্পতি আছে, সন্তানের প্রয়োজন হলে দম্পতির দুজনেই পালা করে গর্ভধারণ করে। মানুষেরও সেই ব্যবস্থা দরকার। তোমাদের কেন্দ্রীয় সংসদে পুংস্ত্রীসমীকরণের জন্যে একটা আইন পাস করিয়ে নাও, তারপর যা করবার আমরা করব। মাঙ্গলিক শরীরবিজ্ঞানীরা অনায়াসে তোমাদের দেহের অবদলবদল করে দিতে পারবেন এবং এক বার করে দিলে বংশানুক্রমে তা বজায় থাকবে।
এখন পলিটিকস সম্বন্ধে দু—চারটে কথা বলছি। এই পৃথিবীতে রাষ্ট্রচালনার দু রকম রীতি আছে দেখছি। একটি হচ্ছে স্বৈরতন্ত্র অর্থাৎ এক জন বা এক দল ধূর্ত লোক সমস্ত ক্ষমতা হস্তগত করে রাখে, তাদের শাসন আর সবাই ভেড়ার পালের মতন মেনে নেয়। অন্য রীতি হচ্ছে লোকতন্ত্র, অর্থাৎ জনসাধারণ যাদের নির্বাচন করে তারাই রাষ্ট্র চালায়। কিন্তু নির্বাসিত সদস্যদের মধ্যে বিস্তর অকর্মণ্য আর দুশ্চরিত্র লোক থাকে। দেশের অধিকাংশ লোক যদি সাধু বুদ্ধিমান হত তবে লোকতন্ত্রে মোটামুটি কাজ চলত। কিন্তু মানুষের বুদ্ধি এখনও অত্যন্ত কাঁচা আর চরিত্রেও বিস্তর গলদ আছে। এমন অবস্থায় স্বৈরতন্ত্র আর লোকতন্ত্র দুটোই তোমাদের পক্ষে অনিষ্টকর। তোমরা মনে কর, স্বাধীনতা পেয়েছ। ছাই পেয়েছ। আসল স্বাধীনতা লাভের উপায় বলছি শোন।
তোমাদের মধ্যে কজন এয়ারোপ্লেন জাহাজ রেলগাড়ি বা গরুর গাড়ি চালাতে পার? রাষ্ট্রচালনা কি তার চাইতে সহজ মনে কর? সবাই মিলে দেশ শাসন করবে এ দুর্বুদ্ধি ত্যাগ কর। আনাড়ী লোকের তা সাধ্য নয়। হয়তো লক্ষ বৎসর পরে মানুষ জাতি লায়েক হবে, কিন্তু তত দিন তোমাদের হিতকামী গুরু বা অভিভাবক দরকার। আমরা মাঙ্গলিকরা সেই গুরুদায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছি। তোমাদের নানা রাজনীতিক দল আছে, ও সবে যোগ দিও না। নতুন দল তৈরি কর—ইণ্ডোমার্স বা ভারত—মঙ্গল পার্টি। আগামী ইলেকশনে তোমরা প্রতিনিধি খাড়া করবে, আমরা সর্বতোভাবে তোমাদের সাহায্য করব। সমস্ত আসনই তোমরা দখল করতে পারবে তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। তারপর প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সভায় একমাত্র দল হয়ে ঢুকে পড়, আমাদের হাতে শাসনের ভার ছেড়ে দাও। তোমরা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুবে, খাবে দাবে ফুর্তি করবে, কবিতা আর গল্প লিখবে, গান শুনবে, হরেক রকম নাচ দেখবে, আর রাষ্ট্রচালনার সমস্ত ঝক্কি আমরা নেব। শুধু ভারত নয়, সমস্ত পৃথিবীতেই এই ব্যবস্থা চালাতে হবে। মানুষ আর মাঙ্গলিকের এই নিবিড় সম্পর্ক ঘটলেই তোমরা বুঝতে পারবে—আমাদের যা মতামত তোমাদেরও তাই, আমরা যা ভাল মনে করি তাই তোমাদের পক্ষে ভাল। আসল স্বাধীনতা আর ডিমোক্রাসি একেই বলে। অ্যাটম আর হাইড্রোজেন বোমার ভয় খাচ্ছ? ও সব ছেলে—ভুলনো জুজু আমরা গ্রাহ্য করি না, সমস্ত ফুঁয়ে উড়িয়ে দেব, বদমাশ গুণ্ডাদের ঝাড়ে বংশে সাবাড় করব।
