মহেশের খাট তখন তীর বেগে ছুটছে, হরিনাথ পাগলের মতন পিছু পিছু দৌড়াচ্ছেন। কর্নওয়ালিস স্ট্রীট, গোলদিঘি, বউবাজারের মোড়—সব পার হয়ে গেল। কুয়াশা ভেদ ক’রে সামনের সমস্ত পথ ফুটে উঠেছে—এ পথের কি শেষ নেই? রাস্তা কি ওপরে উঠেছে না নীচে নেমেছে? এ কি আলো না অন্ধকার? দূরে ও কি দেখা যাচ্ছে—সমুদ্রের ঢেউ, না চোখের ভুল?
হরিনাথ ছুটতে ছুটতে নিরন্তর চিৎকার করছেন—’থাম, থাম।’ ও কি, খাটের ওপর উঠে বসেছে কে? মহেশ? মহেশই তো। কি ভয়ানক! দাঁড়িয়েছে, ছুটন্ত খাটের ওপর খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিছন ফিরে লেকচারের ভঙ্গীতে হাত নেড়ে কি বলছে?
দূর দূরান্তর থেকে মহেশের গলার আওয়াজ এল—’হরিনাথ—ও হরিনাথ—ওহে হরিনাথ—’
‘কি কি? এই যে আমি।’
‘ও হরিনাথ—আছে, আছে, সব আছে, সব সত্যি—’
মহেশের খাট অগোচর হয়ে এল, তখনও তাঁর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে—’আছে আছে…’
হরিনাথ মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে ওয়েলেসলি স্ট্রীটের পুলিশ তাঁকে দেখতে পেয়ে মাতাল ব’লে চালান দিলে। তাঁর স্ত্রী খবর পেয়ে বহু কষ্টে তাঁকে উদ্ধার করেন।
বংশলোচনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন—’গয়ায় পিণ্ডি দেওয়া হয়েছিল কি?’
‘শুধু গয়ায়। পিণ্ডিদাদনখাঁএ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোন ফল হয়নি, পিণ্ডি ছিটকে ফিরে এল।’
‘তার মানে?’
‘মানে—মহেশ পিণ্ডি নিলেন না, কিংবা তাঁকে নিতে দিলে না।’
‘আশ্চর্য!—মহেশ মিত্তিরের টাকাটা?’
‘সেটা ইউনিভার্সিটিতে গচ্ছিত আছে। কিন্তু কাজ কিছুই হয় নি, ভূতের বিপক্ষে প্রবন্ধ লিখতে কোন ছাত্রের সাহস নেই। এখন সেই টাকা সুদে—আসলে প্রায় পঁচিশ হাজার হয়েছে। একবার সেনেটে প্রস্তাব ওঠে টাকাটা প্রত্নবিভাগের জন্য খরচ হ’ক। কিন্তু ছাদের ওপর এমন দুপদাপ শব্দ শুরু হ’ল যে সব্বাই ভয়ে পালালেন। সেই থেকে মহেশফাণ্ডের নাম কেউ করে না।’
১৩৩৭ (১৯৩০)
মাঙ্গলিক
সভাপতি বললেন, ওঃ, আমাদের কি অচিন্তনীয় সৌভাগ্য! যে মহাপুরুষ আজ এই মহতী সভায় পদার্পণ করেছেন তাঁর সমুচিত সংবর্ধনা করি এমন সামর্থ্য আমাদের নেই। এঁর মুখের ভাষা আমাদের অবোধ্য। আমাদের বাগযন্ত্র এঁর নাম উচ্চারণ করতে পারে না, আমাদের লেখনীও তা ব্যক্ত করতে পারে না। তবে এই মহান অতিথির কি পরিচয় দেব? শুধু বলতে পারি ইনি মাঙ্গলিক। এদেশে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে অমানুষী প্রতিভার বলে ইনি আমাদের বাংলা ভাষা আয়ত্ত করেছেন এবং তাতেই নিজের বাণী দেবেন। এঁর সময় অতি অল্প, আধ ঘণ্টা পরেই স্বলোকে প্রত্যাবর্তন করবেন। আপনারা প্রশ্ন করে বাধা দেবেন না, এঁর শ্রীমুখ থেকে যে সুসমাচার নিঃসৃত হবে তাই ভক্তিভরে শ্রবণ মনন ও হৃদয়ে ধারণ করুন।
সামনের মাইক্রোফোনটা ঠেলে ফেলে দিয়ে সর্বজনীন পূজোর লাউড স্পীকারের মতন কান ফাটা নিনাদে মাঙ্গলিক বলতে লাগলেন।—
ওহে সভাপতি আর উপস্থিত মানুষরা— গোড়াতেই জানিয়ে রাখছি, বাজে কথা আমি বলি না। তোমাদের এই সভাপতি মাননীয় কি না, মহাশয় কি না, তার প্রমাণ নেই, সেজন্য ও সব না বলে শুধু সভাপতি বলেছি। যারা আমার বাণী শুনতে এখানে এসেছে তাদের ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাগণ বলতেও আমি রাজী নই। তোমাদের মধ্যে কত জন ভদ্র আর কত জন অভদ্র আছে তা আমি জানব কি করে? কোনও প্রাণীজাতির উল্লেখ করতে হলে কেউ ভেড়া—ভেড়ী বা ছাগল—ছাগলী বলে না, শুধু ভেড়া বা ছাগল বললে তৎ তৎ প্রাণীর স্ত্রীপুরুষ দুই—ই বোঝায়। অতএব ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলা না বলে আমি তোমাদের যে শুধু মানুষ বলে সম্বোধন করেছি তাই যথেষ্ট। যাক, এখন আমার বক্তব্য শোন। তোমাদের অসংখ্য জিজ্ঞাস্য আছে, নানা বিষয় জানবার জন্য ছটফট করছ, তা আমি বুঝি। কিন্তু আমার সময় অতি অল্প আর তোমাদের বোধশক্তিও অতি ক্ষীণ, সেজন্যে অতি সংক্ষেপে ভাষণ দিচ্ছি।
তোমাদের কৌতূহল কিয়ৎ পরিমাণে নিবৃত্তির জন্যে জানাচ্ছি—আমরা বিশ জন মঙ্গল গ্রহ থেকে এই ভারতের বিভিন্ন স্থানে অবতরণ করেছি। পরে অন্যান্য দেশেও আমরা যাব। আমাদের উদ্দেশ্য—মানবজাতির কিঞ্চিৎ মঙ্গল সাধন। কি করে এসেছি জানতে চাও? উড়ন চাকতিতে চড়ে আসি নি, থালা বা রেকাবিতে চড়েও আসি নি। অতি সোজা উপায়ে ঝুপ করে নেমেছি, উল্কাপাত যেমন করে হয়। পতনের দারুণ বেগ কি করে সয়েছি, তোমাদের স্থূল বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যাই নি কেন—এ সব জানতে চেয়ো না, জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তোমরা বুঝতে পারবে না। আমাকে যেমন দেখছ আমার আসল মূর্তি তেমন নয়, উপস্থিত প্রয়োজনে এই পৃথিবীর উপযুক্ত দেহ ও বেশ ধারণ করেছি। আর একটা কথা তোমাদের হৃদয়ঙ্গম করা দরকার। তোমাদের অর্থাৎ মানবজাতির এখন শৈশবদশা চলছে, কিন্তু মঙ্গলগ্রহবাসী আমরা অত্যন্ত প্রবীণ ও পরিপক্ক। আমাদের তুলনায় তোমরা নিরতিশয় অপোগণ্ড, বিদ্যাবুদ্ধিতে দশ কোটি বৎসর পিছিয়ে আছ। অতএব আমি যে সদুপদেশ দিচ্ছি তা নিয়ে তর্ক করো না, নির্বিচারে মেনে নাও, তাতেই তোমাদের মঙ্গল হবে।
আগে তোমাদের বহিরঙ্গ অর্থাৎ দেহ, বেশ, চাল—চলন ইত্যাদি সম্বন্ধে কিছু বলছি তার পর অন্তরঙ্গ অর্থাৎ পলিটিকসের আলোচনা করব। মানুষ জাতির দেহের গড়ন মন্দ নয়, তবে কদাচারের ফলে তোমরা তা কুৎসিত করে ফেলেছ। কেউ দেদার লুচি মণ্ডা মাংস ঘি দুধ খেয়ে মোটা থপথপে হয়েছ, কেউ হরদম চা সিগারেট পান দোক্তা প্রভৃতি বিষ খেয়ে চেহারাটি পাকাটে করে ফেলেছ। বোকামি আর অত্যাচারের ফলে কেউ কেউ ব্যাধিগ্রস্ত হয়েছ। তোমাদের পরিচ্ছন্নতার অত্যন্ত অভাব দেখছি। জীবাণুতত্ত্ব তোমরা একটু আধটু জান, তবু গতানুগতিক ফ্যাশনের বশে নিজের শরীর আর গৃহকে ব্যাকটিরিয়ার ভাণ্ডার বানিয়েছ। এখানে অনেকের গোঁফ দেখছি, কয়েক জনের দাড়িও দেখছি। দশ—বারো জন টেকো মানুষ ছাড়া আর সকলের মাথায় চুলও দেখছি। আর মেয়েদের মাথায় তো চুলের জঙ্গল। ছি ছি ছি! এও কি জান না যে গোঁফ দাড়ি আর চুল হচ্ছে জীবাণুর আড়ত? তোমাদের স্বাস্থ্যবিশারদগণ অতি অকর্মণ্য, তাই এই কদর্য প্রথা তুলে দেবার কোন চেষ্টা করেন নি। কামিয়ে ফেল, স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই নেড়া হও আর গোঁফ দাড়ি উৎপাটন করে ফেল। আমার শিরস্ত্রাণ দেখছ তো, পাতলা টাইটেনিয়ম ধাতুর তৈরী। এতে চুলের কাজ হয় অথচ ময়লা জমে না। এরকম জিনিস যদি এদেশে দুর্লভ হয় তবে এ্যালুমিনিয়ামের টুপি পর। মেয়েরা যদি তাদের সেকেলে ফ্যাশন বজায় রাখতে চায় তবে টুপির পেছনে খোঁপার মতন একটা ঘটি জুড়ে দিতে পারে। ইচ্ছা হলে তাতে বেল ফুলের মালা জড়ানো চলবে। কিন্তু স্ত্রী আর পুরুষের আলাদা সাজের দরকারই হবে না, সে কথা পরে বলছি। তোমাদের বাড়িতে যেসব কম্বল রগ কার্পেট শতরঞ্চি আর পরদা আছে, নির্মম হয়ে পুড়িয়ে ফেল। যাতে ধুলো আর ব্যাকটিরিয়া জমতে পারে এমন জিনিস রেখো না।
