মহেশের আর দেরি নেই, মৃত্যুর ভয়ও নেই। বললেন—’হরিনাথ তোমায় ক্ষমা করলুম। কিন্তু ভেবো না যে আমার মত কিছুমাত্র বদলেছে। এই রইল আমার উইল, তোমাকেই অছি নিষুক্ত করেছি। আমার পৈতৃক দশ হাজার টাকার কাগজ ইউনিভার্সিটিকে দান করেছি, তার সুদ থেকে প্রতি বৎসর একটা পুরস্কার দেওয়া হবে। যে ছাত্র ভূতের অনস্তিত্ব সম্বন্ধে শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ লিখবে সে ঐ পুরস্কার পাবে। আর দেখ—খবরদার, শ্রাদ্ধ—ট্রাদ্ধ ক’রো না। ফুলের মালা চন্দন—কাঠ ঘি এসব দিও না, একদম বাজে খরচ। তবে হাঁ, দু—চার বোতল কেরোসিন ঢালতে পার। দেড় সের গন্ধক আর পাঁচ সের সোরা আনানো আছে, তাও দিতে পার, চটপট কাজ শেষ হয়ে যাবে। আচ্ছা, চললুম তা হ’লে।’
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। মহেশের আত্মীয়স্বজন কেউ কলকাতায় নেই, থাকলেও বোধ হয় তারা আসত না। বড়দিনের বন্ধ, কলেজের সহকর্মীরা প্রায় সকলেই অন্যত্র গেছেন। হরিনাথ মহা বিপদে পড়লেন। মহেশবাবুর চাকরকে বললেন পাড়ার জনকতক লোক ডেকে আনতে।
অনেকক্ষণ পরে দুজন মাতব্বর প্রতিবেশী এলেন। ঘরে ঢুকলেন না, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন—’চুপ ক’রে ব’সে আছেন যে বড়? সৎকারের ব্যবস্থা কি করলেন?’
হরিনাথ বললেন—’আমি একলা মানুষ, আপনাদের ওপরেই ভরসা।’
‘ওই বেলেল্লা হতভাগার লাশ আমরা বইব? ইয়ারকি পেয়েছেন নাকি।’ এই কথা বলেই তাঁরা সরে পড়লেন।
হরিনাথের তখন মনে পড়ল, বড় রাস্তার মোড়ে একটা মাঠকোঠায় সাইনবোর্ড দেখেছেন—বৈতরণী সমিতি, ভদ্রমহোদয়গণের দিবারাত্র সস্তায় সৎকার। চাকরকে বসিয়ে রেখে তখনই সেই সমিতির খোঁজে গেলেন।
অনেক চেষ্টায় সমিতি থেকে তিনজন লোক যোগাড় হ’ল! পনর টাকা পারিশ্রমিক, আর শীতের ওষুধ বাবদ ন—সিকে। সমস্ত আয়োজন শেষ হ’লে হরিনাথ আর তাঁর তিন সঙ্গী খাট কাঁধে নিয়ে রাত আড়াইটার সময় নিমতলায় রওনা হলেন।
অমাবস্যার রাত্রি, তার ওপর আবার কুয়াশা। হরিনাথের দল কর্নওয়ালিস স্ট্রীট দিয়ে চললেন। গ্যাসের আলো মিটমিট করছে, পথে জনমানব নেই। কাঁধের বোঝা ক্রমেই ভারী বোধ হতে লাগল, হরিনাথ হাঁপিয়ে পড়লেন। বৈতরণী সমিতির সর্দার ত্রিলোচন পাকড়াশী বুঝিয়ে দিলেন—এমন হয়েই থাকে, মানুষ ম’রে গেলে তার ওপর জননী বসুন্ধরার টান বাড়ে।
হরিনাথ একলা নয়, তাঁর সঙ্গীরা সকলেই সেই শীতে গলদঘর্ম হয়ে উঠল। খাট নামিয়ে খানিক জিরিয়ে আবার যাত্রা।
কিন্তু মহেশ মিত্তিরের ভার ক্রমশই বাড়ছে, পা আর এগোয় না। পাকড়াশী বললেন—’ঢের ঢের বয়েছি মশাই, কিন্তু এমন জগদদল মড়া কখনও কাঁধে করি নি। দেহটা তো শুকনো, লোহা খেতেন বুঝি? পনর টাকায় হবে না মশায়, আরো পাঁচ টাকা চাই।’
হরিনাথ তাতেই রাজী, কিন্তু সকলে এমন কাবু হয়ে পড়েছে যে দু—পা গিয়ে আবার খাট নামাতে হ’ল। হরিনাথ ফুটপাতে এলিয়ে পড়লেন, বৈতরণীর তিন জন হাঁপাতে হাঁপাতে তামাক টানতে লাগল।
ওঠবার উপক্রম করছেন এমন সময় হরিনাথের নজরে পড়ল—কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা আবছায়া তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এলে দেখলেন—কাল র্যাপার মুড়ি দেওয়া একটা লোক। লোকটি বললে—’এঃ, আপনারা হাঁপিয়ে পড়েছেন দেখছি। বলেন তো আমি কাঁধ দিই।’
হরিনাথ ভদ্রতার খাতিরে দু—একবার আপত্তি জানালেন, কিন্তু শেষটায় রাজী হলেন। লোকটি কোন জাত তা আর জিজ্ঞাসা করলেন না, কারণ মহেশ মিত্তির ও বিষয়ে চিরকাল সমদর্শী, এখন তো কথাই নেই। তা ছাড়া যে লোক উপযাচক হয়ে শ্মশানযাত্রার সঙ্গী হয় সে তো বান্ধব বটেই।
ত্রিলোচন পাকড়াশী বললেন,—’কাঁধ দিতে চাও দাও, কিন্তু বখরা পাবে না, তা বলে রাখছি।’
আগন্তুক বললে—’বখরা চাই না।’
এবার হরিনাথকে কাঁধ দিতে হল না, তার জায়গায় নতুন লোকটি দাঁড়ালো। আগের চেয়ে যাত্রাটা একটু দ্রুত হল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আর পা চলে না, ফের খাট নামিয়ে বিশ্রাম।
পাকড়াশী বললেন—’কুড়ি টাকার কাজ নয় বাবু, এ হল মোষের গাড়ির বোঝা। আরও পাঁচ টাকা চাই।’
এমন সময় আবার একজন পথিক এসে উপস্থিত—ঠিক প্রথম লোকটির মতন কাল র্যাপার গায়ে। এও খাট বইতে প্রস্তুত। হরিনাথ দ্বিরুক্তি না ক’রে তার সাহায্য নিলেন। এবার পাকড়াশী রেহাই পেলেন।
খাট চলেছে, আর একটু জোরে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আবার ক্লান্তি। মহেশের ভার অসহ্য হয়ে উঠেছে, তার দেহে কিছু ঢোকে নি তো? খাট নামিয়ে আবার সবাই দম নিতে লাগল।
কে বলে শহুরে লোক স্বার্থপর? আবার একজন সহায় এসে হাজির, সেই কাল র্যাপার গায়ে। হরিনাথের ভাববার অবসর নেই, বললেন, ‘চল, চল।’
আবার যাত্রা, আরও একটু জোরে, তারপর ফের খাট নামাতে হ’ল। এই যে, চতুর্থ বাহক এসে হাজির, সেই কাল র্যাপার। এরা কি মহেশকে বইবার জন্যই এই তিন পহর রাতে পথে বেরিয়েছে। হরিনাথের আশ্চর্য হবার শক্তি নেই, বললেন—’ওঠাও খাট, চল জলদি।’
চার জন অচেনা বাহকের কাঁধে মহেশের খাট চলেছে পিছনে হরিনাথ। আর বৈতরণী সমিতির তিন জন। এইবার গতি বাড়ছে, খাট হনহন ক’রে চলছে। হরিনাথ আর তাঁর সঙ্গীদের ছুটতে হ’ল।
আরে অত তাড়াতাড়ি কেন, একটু আস্তে চল। কেই বা কথা শোনে! ছুট—ছুট। ‘আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ, থাম থাম, বীডন স্ট্রীট ছাড়িয়ে গেলে যে! লোকগুলো কি শুনতে পায় না? ওহে পাকড়াশী, থামাও না ওদের?’ কোথায় পাকড়াশী? তিনি বিচক্ষণ লোক, ব্যাপারটা বুঝে টাকার মায়া ত্যাগ করে সদলে পালিয়েছেন।
