জগদগুরু। তুমি এখানে এসে ভাল করনি বাপু। তোমার গুরু রুশিয়া থেকে আসবেন, এখন ধৈর্য ধ’রে থাক।
গুহা। দশহাজার টাকা চাঁদা তুলতে পারিস? ইউনিয়ন খুলে এমন হুড়ো লাগাব যে এখনি তোদের মজুরি পাঁচগুণ হয়ে যাবে।
মিস্টার গ্র্যাব। সাবধান, আমার চটকলের ত্রিসীমানার মধ্যে যেন এস না।
গুহা। (চুপি চুপি) তবে আপনার বাড়ি গিয়ে দেখা করব কি?
কাঙালীচরণ। দেবতা আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?
জগদগুরু। তোমার আবার কি চাই? ব’লে ফেল।
কাঙালী। যদি কখনও মহাবিদ্যা ধরা পড়ে যায়, তখন অবস্থাটা কি রকম হবে?
জগদগুরু। (ঈষৎ হাসিয়া বেদী হইতে নামিয়া পড়িলেন)।
ঘণ্টা ও কোলাহল
ভারতবর্ষ, ফাল্গুন ১৩২৯ (১৯২২)
মহেশের মহাযাত্রা
কেদার চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন—’আজকাল তোমরা সামান্য একটু বিদ্যে শিখে নাস্তিক হয়েছ, কিছুই মানতে চাও না। যখন আরও একটু শিখবে তখন বুঝবে যে আত্মা আছেন। ভূত, পেতনী—এঁরাও আছেন। বেম্মদত্যি, কন্ধকাটা—এঁয়ারাও আছেন।’
বংশলোচনবাবুর বৈঠকখানায় গল্প চলিতেছিল। তাঁহার শালা নগেন বলিল—’আচ্ছা বিনোদ—দা, আপনি ভূত বিশ্বাস করেন?’
বিনোদ বলিল—’যখন প্রত্যক্ষ দেখব তখন বিশ্বাস করব। তার আগে হাঁ—না কিছুই বলতে পারি না।’
চাটুজ্যে বলিলেন—’এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি ওকালতি কর! বলি, তোমার প্রপিতামহকে প্রত্যক্ষ করেছ? ম্যাকডোনাল্ড, চার্চিল আর বালডুইনকে দেখেছ? তবে তাদের কথা নিয়ে অত মাতামাতি কর কেন?’
‘আচ্ছা, আচ্ছা, হার মানছি চাটুজ্যেমশায়।’
‘আপ্তবাক্য মানতে হয়। আরে, প্রত্যক্ষ করা কি যার তার কম্ম? শ্রীভগবান কখনও কখনও তাঁর ভক্তদের বলেন—’দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ। সেই দিব্যদৃষ্টি পেলে তবে সব দেখতে পাওয়া যায়।’
নগেন জিজ্ঞাসা করিল—’আপনি দেখতে পেয়েছেন চাটুজ্যেমশায়?’
‘জ্যাঠামি করিস নি। এই কলকাতা শহরে রাস্তায় যারা চলাফেরা করে—কেউ কেরানী, কেউ দোকানী, কেউ মজুর, কেউ আর কিছু—তোমরা ভাব সবাই বুঝি মানুষ। তা মোটেই নয়। তাদের ভেতর সর্বদাই দু—দশটা ভূত পাওয়া যায়। তবে চিনতে পারা দুষ্কর। এই রকম ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন মহেশ মিত্তির।’
‘কে তিনি?’
‘জান না? আমাদের মজিলপুরের চরণ ঘোষের মামার শালা। এককালে তিনি কিছুই মানতেন না, কিন্তু শেষ দশায় তাঁকেও স্বীকার করতে হয়েছিল।’
সকলে একবাক্যে বলিলেন—’কি হয়েছিল বলুন না চাটুজ্যেমশায়!’
চাটুজ্যে মহাশয় হুঁকাটি হাতে তুলিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন।
ত্রিশ—চল্লিশ বৎসর আগেকার কথা। মহেশ মিত্তির তখন শ্যামবাজারের শিবচন্দ্র কলেজে প্রফেসারি করতেন। অঙ্কের প্রফেসর, অসাধারণ বিদ্যে, কিন্তু প্রচণ্ড নাস্তিক। ভগবান আত্মা পরলোক কিছুই মানতেন না। এমন কি, স্ত্রী মারা গেলে আর বিবাহ পর্যন্ত করেন নি। খাদ্যাখাদ্যের বিচার ছিল না, বলতেন—শুয়োর না খেলে হিঁদুর উন্নতির আশা নেই, ওটা বাদ দিয়ে কোনও জাত বড় হ’তে পারে নি। মহেশের চাল—চলনের জন্য আত্মীয়স্বজন তাঁকে একঘরে করেছিল। কিন্তু যতই অনাচার করুন তাঁর স্বভাবটা ছিল অকপট, পারতপক্ষে মিথ্যা কথা কইতেন না। তাঁর পরমবন্ধু ছিলেন হরিনাথ কুণ্ডু, তিনিও ঐ কলেজের প্রফেসর, ফিলসফি পড়াতেন। কিন্তু বন্ধু হ’লে কি হয়, দুজনে হরদম ঝগড়া হ’ত, কারণ হরিনাথ আর কিছু মানুন না মানুন ভূত মানতেন। তা ছাড়া মহেশবাবু অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ, কেউ তাঁকে হাসতে দেখেনি, আর হরিনাথ ছিলেন আমুদে লোক, কথায় কথায় ঠাট্টা ক’রে বন্ধুকে উদব্যস্ত করতেন। তবু মোটের ওপর তাঁদের পরস্পরের প্রতি খুব একটা টান ছিল।
তখন রাজনীতি চর্চার এত রেওয়াজ ছিল না, আর ভদ্রলোকের ছেলের অন্ন—চিন্তাও এমন চমৎকারা হয় নি, দু—একটা পাস করতে পারলে যেমন—তেমন চাকরি জুটে যেত। লোকের তাই উঁচুদরের বিষয় আলোচনা করবার সময় ছিল। ছোকরারা চিন্তা করত—বউ ভালবাসে কি বাসে না। যাদের সন্দেহ মিটে গেছে, তারা মাথা ঘামাত—ভগবান আছেন কি নেই। একদিন কলেজে কাজ ছিল না, অধ্যাপকেরা সকলে মিলে গল্প করছিলেন। গল্পের আরম্ভ যা নিয়েই হ’ক, মহেশ আর হরিনাথ কথাটা টেনে নিয়ে ভূতে আর ভগবানে হাজির করতেন, কারণ এই নিয়ে তর্ক করাই তাঁদের অভ্যাস। এদিনও তাই হয়েছিল।
আলোচনা শুরু হয় ঝি—চাকরের মাইনে নিয়ে। কলেজের পণ্ডিত দীনবন্ধু বাচস্পতিমশায় দুঃখ করছিলেন—’ছোটলোকের লোভ এত বেড়ে গেছে যে আর পেরে ওঠা যায় না।’ মহেশবাবু বললেন,—’লোভ সকলেরই বেড়েছে, আর বাড়াই উচিত, নইলে মনুষ্যত্বের বিকাশ হবে কিসে।’ পণ্ডিতমশায় উত্তর দিলেন—’লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’ মহেশবাবু পালটা জবাব দিলেন—’লোভ ত্যাগ করলেও মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না।’
তর্কটা তেমন জুতসই হচ্ছে না দেখে হরিনাথবাবু একটু উসকে দেবার জন্য বললেন—’আমাদের মতন লোকের লোভ হওয়া উচিত মৃত্যুর পর। মাইনে তো পাই মোটে পৌনে দু—শ, তাতে ইহকালের কটা শখই বা মিটবে, তাইতো পরকালের আশায় বসে আছি আত্মাটা যদি স্বর্গে গিয়ে একটু ফুর্তি করতে পারে।’
দীনবন্ধু পণ্ডিত বললেন—’কে বললে তুমি স্বর্গে যাবে? আর স্বর্গের তুমি জানই বা কি?’
‘সমস্তই জানি পণ্ডিতমশায়। খাসা জায়গা, না গরম না ঠাণ্ডা। মান্দাকিনী কুলুকুলু বইছে, তার ধারে ধারে পারিজাতের ঝোপ। সবুজ মাঠের মধ্যিখানে কল্পতরু গাছে আঙ্গুর বেদানা আম রসগোল্লা কাটলেট সব রকম ফ’লে আছে, ছেঁড় আর খাও। জন—কতক ছোকরা—দেবদূত গোলাপী উড়ুনি গায়ে দিয়ে সুধার বোতল সাজিয়ে ব’সে রয়েছে, চাইলেই ফটাফট খুলে দেবে। ওই হোথা কুঞ্জবনে ঝাঁকে ঝাঁকে অপ্সরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, দু—দণ্ড রসালাপ কর, কেউ কিছু বলবে না। যত খুশি নাচ দেখ, গান শোন। আর কালোয়াতি চাও তো নারদ মুনির আস্তানায় যাও।’
