মহেশবাবু বললেন—’সমস্ত গাঁজা। পরলোক আত্মা ভূত ভগবান কিছুই নেই। ক্ষমতা থাকে প্রমাণ কর।’
তর্ক জ’মে উঠল। প্রফেসররা কেউ এক পক্ষে কেউ অপর পক্ষে দাঁড়ালেন। পণ্ডিতমশায় দারুণ অবজ্ঞায় ঠোঁট উলটে ব’সে রইলেন। বৃদ্ধ প্রিনসিপাল যদু সান্ডেল রফা ক’রে বললেন—’ভূতের তেমন দরকার দেখি না, কিন্তু আত্মা আর ভগবান বাদ দিলে চলে না।’ মহেশ মিত্তির বললেন—’কেউ—উ নেই, আমি দশ মিনিটের মধ্যে প্রমাণ ক’রে দিচ্ছি।’ হরিনাথ কুণ্ডু মহা উৎসাহে বন্ধুর পিঠ চাপড়ে বললেন—’লেগে যাও।’
তারপর মহেশবাবু ফুলস্কাপ কাগজ আর পেনসিল নিয়ে একটি বিরাট অঙ্ক কষতে লেগে গেলেন। ঈশ্বর আত্মা আর ভূত—এই তিন রাশি নিয়ে অতি জটিল অঙ্ক, তার গতি বোঝে কার সাধ্য। বিস্তর বিয়োগ গুণ ভাগ ক’রে হাতির শুঁড়ের মতন বড় বড় চিহ্ন টেনে অবশেষে সমাধান করলেন—ঈশ্বর=0, আত্মা=ভূত=√০।
বাচস্পতি বললে—’বদ্ধ উন্মাদ।’
মহেশবাবু বললেন—’উন্মাদ বললেই হয় না। এ হল গিয়ে দস্তুরমত ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলস। সাধ্য থাকে তো আমার অঙ্কের ভুল বার করুন।’
হরিনাথ বললেন—’অঙ্ক—টঙ্ক আমার আসে না। বাচস্পতিমশায় যদি ভগবান দেখাবার ভার নেন তো আমি মহেশকে ভূত দেখাতে পারি।’
বাচস্পতি বললেন—’আমার বয়ে গেছে।’
মহেশবাবু বললেন—’বেশ তো হরিনাথ, তুমি ভূতই দেখাও না। একটার প্রমাণ পেলে আর সমস্তই মেনে নিতে রাজী আছি?’
হরিনাথবাবু বললেন—’এই কথা? আচ্ছা, আসছে হপ্তায় শিব—চতুর্দশী পড়ছে। সেদিন তুমি আমার সঙ্গে রাত বারোটায় মানিকতলায় নতুন খালের ধারে চল, পষ্টাপষ্টি ভূত দেখিয়ে দেব। কিন্তু যদি কোনও বিপদ ঘটে তো আমাকে দুষতে পারবে না।’
‘যদি দেখাতে না পার?’
‘আমার নাক কান কেটে দিও। আর যদি দেখাতে পারি তো তোমার নাক কাটব।’
প্রিনসিপাল যদু সাণ্ডেল বললেন—’কাটাকাটির দরকার কি, সত্যের নির্ণয় হ’লেই হ’ল।’
শিব—চতুর্দশীর রাত্রে মহেশ মিত্তির আর হরিনাথ কুণ্ডু মানিকতলায় গেলেন। জায়গাটা তখন বড়ই ভীষণ ছিল, রাস্তায় আলো নেই, দু—ধারে বাবলা গাছে আরও অন্ধকার করেছে। সমস্ত নিস্তব্ধ, কেবল মাঝে মাঝে প্যাঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে। হোঁচট খেতে খেতে দুজনে নতুন খালের ধারে পৌঁছলেন। বছর—দুই আগে ওখানে প্লেগের হাসপাতাল ছিল, এখনও তার গোটাকতক খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে।
মহেশ মিত্তির অবিশ্বাসী সাহসী লোক, কিন্তু তাঁরও গা ছমছম করতে লাগল। হরিনাথ সারা রাস্তা কেবল ভূতের কথাই কয়েছেন—তারা দেখতে কেমন, মেজাজ কেমন, কি খায়, কি পরে। দেবতারা হচ্ছেন উদার প্রকৃতি দিলদরিয়া, কেউ তাঁদের না মানলেও বড় একটা কেয়ার করেন না। কিন্তু অপদেবতারা পদবীতে খাটো ব’লে তাঁদের আত্মসম্মানবোধ বড়ই উগ্র, না মানলে ঘাড় ধরে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা আদায় করেন। এই সব কথা।
হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ শোনা গেল, যেন কোনও অশরীরী বেড়াল তার পলাতকা প্রণয়িনীকে আকুল আহ্বান করছে। একটু পরেই মহেশবাবু রোমাঞ্চিত হয়ে দেখলেন, একটা লম্বা রোগা কুচকুচে মূর্তি দু—হাত তুলে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিছনে একটু দূরে ঐ রকম আর দুটো।
হরিনাথবাবু থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন—’রাম রাম সীতারাম! এ মহেশ, দেখছ কি, তুমিও বল না।’
আর একটু হলেই মহেশবাবু রামনাম উচ্চারণ ক’রে ফেলতেন, কিন্তু তাঁর কনশেন্স বাধা দিয়ে বললে—’উঁহু, একটু সবুর কর, যদি ঘাড় মটকাবার লক্ষণ দেখ তখন না—হয় রামনাম করা যাবে।’
এঁরা একটা পাকুড় গাছের নীচে ছিলেন। হঠাৎ ওপর থেকে খানিকটা কাদা গোলা জল মহেশের মাথায় এসে পড়ল।
তখন সামনের সেই কাল মূর্তিটা নাকী সুরে বললে—’মহেশবাবু আপনি নাকি ভূত মানেন না?’
এ অবস্থায় বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রেই বলে থাকেন—আজ্ঞে হ্যাঁ, মানি বই কি। কিন্তু মহেশ মিত্তির বেয়াড়া লোক, হঠাৎ তাঁর কেমন একটা খেয়াল হল, ধাঁ করে এগিয়ে গিয়ে ভূতের কাঁধ খামচে ধ’রে জিজ্ঞাসা করলেন—’কোন ক্লাস?’
ভূত থতমত খেয়ে জবাব দিলে—’সেকেণ্ড ইয়ার সার!’
‘রোল নম্বর কত?’
ভূত করুণ নয়নে হরিনাথের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলে—’বলি সার?’
হরিনাথের মুখে রাম রাম ভিন্ন কথা নেই। পিছনের দুটো ভূত অদৃশ্য হয়ে গেল। পাকুড় গাছে যে ছিল সে টুপ করে নেমে এসে পালিয়ে গেল। তখন বেগতিক দেখে সামনের ভূতটি ঝাঁকুনি দিয়ে মহেশের হাত ছাড়িয়ে চোঁচা দৌড় মারলে।
মহেশ মিত্তির হরিনাথের পিঠে একটা প্রচণ্ড কিল মেরে বললেন—’জোচ্চোর!’
হরিনাথও পালটা কিল মেরে বললেন—’আহম্মক!’
নিজের নিজের পিঠে হাত বুলতে বুলতে দুই বন্ধু বাড়ি—মুখো হলেন। আসল ভূত যারা আশেপাশে লুকিয়ে ছিল তারা মনে মনে বললে—আজি রজনীতে হয়নি সময়।
পরদিন কলেজে হুলস্থূল বেধে গেল। সমস্ত ব্যাপার শুনে প্রিনসিপাল ভয়ংকর রাগ করে বললেন—’অত্যন্ত শেমফুল কাণ্ড। দুজন নামজাদা অধ্যাপক একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হাতাহাতি! হরিনাথ তোমার লজ্জা নেই?’
হরিনাথবাবু ঘাড় চুলকে বললেন—’আজ্ঞে আমার উদ্দেশ্যটা ভালই ছিল। মহেশকে রিফর্ম করবার জন্য যদি একটু ইয়ে ক’রেই থাকি তাতে দোষটা কি—হাজার হোক আমার বন্ধু তো?’
মহেশবাবু গর্জন করে বললেন—’কে তোমার বন্ধু?’
প্রিনসিপাল বললেন—’মহেশ তুমি চুপ কর। উদ্দেশ্য যাই হোক, কলেজের ছেলেদের এর ভেতর জড়ানো একেবারে অমার্জনীয় অপরাধ। হরিনাথ তুমি বাড়ি যাও, তোমায় সাসপেণ্ড করলুম। আর মহেশ তোমাকেও সাবধান করে দিচ্ছি—আমার কলেজে ভূতুড়ে তর্ক তুলতে পারবে না।’
