হোমরাও। অর্ডার, অর্ডার।
গুহা। আচ্ছা গুরুদেব, মহাবিদ্যা শিখলে কি আমাদের দেশের সকলেরই উন্নতি হবে?
জগদগুরু। দেখ বাপু, পৃথিবীর ধনসম্পদ যা দেখছ, তার একটা সীমা আছে, বেশী বাড়ানো যায় না। সকলেই যদি সমান ভাগে পায়, তবে কারও পেট ভরে না। যে জিনিস সকলেই অবাধে ভোগ করতে পারে, সেটা আর সম্পত্তি ব’লে গণ্য হয় না। কাজেই জগতের ব্যবস্থা এই হয়েছে যে জনকতক ভোগদখল করবে, বাকি সবাই যুগিয়ে দেবে। চাই গুটিকতক মহাবিদ্বান আর একগাদা মহামূর্খ।
খুদীন্দ্র। শুনছেন মহারাজা? এই কথাই তো আমরা বরাবর ব’লে আসছি। আরিস্টোক্রাসি না হ’লে সমাজ টিকবে কিসে? লোকে আবার আমাদের বলে মূর্খ—অযোগ্য। হুঁঃ!
জগদগুরু। ভুল বুঝলে বৎস। তোমার পূর্বপুরুষরাই মহাবিদ্বান ছিলেন, তুমি নও। তুমি কেবল অতীতে অর্জিত বিদ্যার রোমন্থন করছ। তোমার আশে—পাশে মহাবিদ্বানরা ওত পেতে বসে আছেন। যদি তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না শেখ তবে শীঘ্রই গাদায় গিয়ে পড়বে।
প্রফেসর গুঁই। পরিষ্কার করেই বলুন না মহাবিদ্যাটা কি।
তৃতীয় শ্রেণী হতে। ব’লে ফেলুন স্যার, ব’লে ফেলুন। ঘণ্টা বাজতে বেশী দেরি নেই।
জগদগুরু। তবে বলছি শোন। মহাবিদ্যায় মানুষের জন্মগত অধিকার; কিন্তু একে ঘ’ষে মেজে পালিশ ক’রে সভ্যসমাজের উপযুক্ত ক’রে নিতে হয়। ক্রমোন্নতির নিয়মে মহাবিদ্যা এক স্তর হ’তে উচ্চতর স্তরে পৌঁছেছে। জানিয়ে শুনিয়ে সোজাসুজি কেড়ে নেওয়ার নাম ডাকাতি—
ছাত্রগণ। সেটা মহাপাপ—চাই না, চাই না।
জগদগুরু। দেশের জন্য যে ডাকাতি, তার নাম বীরত্ব—
ছাত্রগণ। তা আমাদের দিয়ে হবে না, হবে না!
হাউলার। Bally rot।
জগদগুরু। নিজে লুকিয়ে থেকে কেড়ে নেওয়ার নাম চুরি—
ছাত্রগণ। ছ্যা—ছ্যা, আমরা তাতে নেই, তাতে নেই।
লুটবেহারী। কিহে গাঁট্টালাল, চুপ ক’রে কেন? সায় দাও না।
জগদগুরু। ভালমানুষ সেজে কেড়ে নিয়ে শেষে ধরা পড়ার নাম জুয়াচুরি—
ছাত্রগণ। রাম কহ, তোবা, থুঃ।
গুহা। কি লুটবেহারী, চোখ বুঁজে কেন?
জগদগুরু। আর যাতে ঢাক পিটিয়ে কেড়ে নেওয়া যায়, অথচ শেষ পর্যন্ত নিজের মানসম্ভ্রম বজায় থাকে লোকে জয়—জয়কার করে— সেটা মহাবিদ্যা।
ছাত্রগণ। জগদগুরু কি জয়! আমরা তাই চাই, তাই চাই।
গুঁই। কিন্তু ঐ কেড়ে নেওয়া কথাটা একটু আপত্তিজনক।
লুটবেহারী। আপনার মনে পাপ আছে। তাই খটকা বাধছে। কেড়ে নেওয়া পছন্দ না হয়, বলুন ভোগা দেওয়া।
গুঁই। কে হে বেহায়া তুমি? তোমার কমনশেন্স নেই?
জগদগুরু। বৎস, কেড়ে নেওয়াটা রূপক মাত্র। সাদা কথায় এর মানে হচ্ছে —সংসারের মঙ্গলের জন্য লোককে বুঝিয়ে—সুঝিয়ে কিছু আদায় করা।
লুটবেহারী। আমার তো সবে একটি সংসার। কিছু আদায় করতে পারলেই ছছল—বছল নবাবসাহেবের বরঞ্চ—
হোমরাও। অর্ডার, অর্ডার।
গুঁই। দেখুন জগদগুরু, আমার দ্বারা বিবেক—বিরুদ্ধ কাজ হবে না। কিন্তু ঐ যে আপনি বললেন—সংসারের মঙ্গলের জন্যে, সেটা খুব মনে লেগেছে। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি—
লুটবেহারী। মশায়, ভগবান বেচারাকে নিয়ে যখন—তখন টানাটানি করবেন না, চটে উঠবেন।
নিতাই। আচ্ছা, সকলেই যদি মহাবিদ্যা শিখে ফেলে তা হলে কি হবে?
জগদগুরু। সে ভয় নেই তোমরা প্রত্যেকে যদি প্রাণপণে চেষ্টা কর, তা হলেও কেবল দু—চারজন ওতরাতে পার।
সরেশ। সার, একবার টেস্ট ক’রে নিন না।
জগদগুরু। এখন পরীক্ষা করলে বিশেষ ভাল ফল পাওয়া যাবে না। অনেক সাধনা দরকার।
নিরেশ। কিছু—মার্কও কি পাব না?
জগদগুরু। কিছু—কিছু পাবে বই কি। কিন্তু তাতে এখন ক’রে—খেতে পারবে না।
নিরেশ। তবে না হয় আমাদের কিছু হোম—একসারসাইজ দিন।
জগদগুরু। বাড়িতে তো সুবিধা হবে না বাছা। এখন তোমরা নিতান্ত অপোগণ্ড। দিনকতক দল বেঁধে মহাবিদ্যার চর্চা কর।
খুদীন্দ্র। ঠিক বলেছেন। আসুন মহারাজ, আপনি আমি আর নবাবসাহেব মিলে একটা অ্যাসোসিয়েশন করা যাক।
প্রফেসর গুঁই। আমাকেও নেবেন। আমি স্পীচ লিখে দেব।
মিস্টার গুহ। নিতাইবাবু, আমি ভাই তোমার সঙ্গে আছি।
লুটবেহারী। আমি একাই এক শ। তবে রুপচাঁদবাবু যদি দয়া ক’রে সঙ্গে নেন।
রূপচাঁদ। খবরদার, তুমি তফাত থাক।
লুটবেহারী। বটে? তোমার মত ঢের—ঢের বড়লোক দেখেছি।
গাঁট্টালাল। আমরা কারও তোয়াক্কা রাখি না—কি বল তেওয়ারীজী?
মিস্টার গুপ্টা। ভাবনা কি সরেশবাবু, নিরেশবাবু। আমি টেকনিক্যাল ক্লাস খুলছি, ভর্তি হ’ন। তরল আলতা, গোলাবী বিড়ি, ঘড়ি—মেরামত, ঘুড়ি—মেরামত, দাঁত—বাঁধানো, ধামা—বাঁধানো সব শিখিয়ে দেব।
দীনেশ। গুরুদেব, চুপি—চুপি একটা নিবেদন করতে পারি কি?
জগদগুরু। বল বৎস।
দীনেশ। দেখুন, আমি নিতান্তই মুরুব্বীহীন। মহাবিদ্যার একটা সোজা তুকতাক—বেশী নয়, যাতে লাখ—খানেক টাকা আসে—যদি দয়া ক’রে গরিবকে শিখিয়ে দেন।
জগদগুরু। বাপু, তোমার গতিক ভাল বোধ হচ্ছে না। মহাবিদ্বান অপরকেই তুকতাক শেখায়—নিজে ও সবে বিশ্বাস করে না।
দীনেশ। টিকিটের টাকাটাই নষ্ট। তার চেয়ে ডার্বির টিকিট কিনলে বরং কিছুদিন আশায় আশায় কাটাতে পারতুম।
গবেশ্বর। আমার কি হবে প্রভু? কেউ যে দলে নিচ্ছে না।
জগদগুরু। তুমি ছেলে তৈরি কর। তাদের শেখাও—মহাবিদ্যা শেখে যে, গাড়ি—ঘোড়া চড়ে সে।
পাঁচু মিয়া। আমার কি করলেন ধর্মাবতার?
