হাউলার—আপনাদের বাংলা ভাষার দোষ। জগদগুরু বিদেশী লোক, ‘আপনি’ ‘তুমি’ গুলিয়ে ফেলেছেন। আর ‘বালক’ কথাটা কিছু নয়, ইংরেজীর ওল্ড বয়।
খুদীন্দ্র। বাংলা ভাল না জানেন তো ইংরেজীতে বলুন না।
গুঁই। যাই হ’ক আমি আপত্তি করছি।
মিস্টার গুহা। আমি আপত্তির সমর্থন করছি।
জগদগুরু (সহাস্যে)। বৎস উতলা হয়ো না। আমি বাংলা ভালই জানি। বাংলা, ইংরেজী, ফরাসী, জাপানী, সবই আমার মাতৃভাষা। আমি প্রবীণ লোক, দশ—বিশ হাজার বৎসর ধ’রে এই মহাবিদ্যা শেখাচ্ছি। তোমরা আমার স্নেহের পাত্র, ‘তুমি’ বলবার অধিকার আমার আছে।
লুটবেহারী। নিশ্চয় আছে। আপনি আমাদের ‘তুমি, তুই’—যা খুশি বলুন। আমি ও সব গ্রাহ্য করি না। মোদ্দা, শেষকালে ফাঁকি দেবেন না।
জগদগুরু। বাপু, আমি কোনও জিনিস দিই না, শুধু শেখাই মাত্র। যা হ’ক, তোমাদের দেখে আমি বড়ই প্রীত হয়েছি। এমন—সব সোনার চাঁদ ছেলে—কেবল শিক্ষার অভাবে উন্নতি করতে পারছ না!
মিস্টার গুপ্টা। ভণিতা ছেড়ে কাজের কথা বলুন।
জগদগুরু। হে ছাত্রগণ, মহাবিদ্যা না জানলে মানুষ সুসভ্য ধনী মানী হ’তে পারে না, তাকে চিরকাল কাঠ কাটতে আর জল তুলতে হয়। কিন্তু এটা মনে রেখো যে, সাধারণ বিদ্যা আর মহাবিদ্যা এক জিনিস নয়। তোমরা পদ্যপাঠে পড়েছ—
এই ধন কেহ নাহি নিতে পারে কেড়ে,
যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে।
এই কথা সাধারণ বিদ্যা সম্বন্ধে খাটে, কিন্তু মহাবিদ্যার বেলায় নয়। মহাবিদ্যা কেবল নিতান্ত অন্তরঙ্গ জনকে অতি সন্তর্পণে শেখাতে হয়। বেশী প্রচার হ’লে সমূহ ক্ষতি। বিদ্বানে বিদ্বানে সংঘর্ষ হ’লে একটু বাক্যব্যয় হয় মাত্র, কিন্তু মহাবিদ্বানদের ভিতর ঠোঁকাঠুঁকি বাধলে সব চুরমার। তার সাক্ষী এই ইওরোপের যুদ্ধ। অতএব মহাবিদ্বানদের একজোট হয়েই কাজ করতে হবে।
হাউলার। আমি এই লেকচারে আপত্তি করছি। এদেশের লোকে এখনও মহাবিদ্যালাভের উপযুক্ত হয় নি। আর আমাদের মহাবিদ্বানরা দেশী মহাবিদ্বানদের সঙ্গে বনিয়ে চলতে পারবে না। মিথ্যা একটা অশান্তির সৃষ্টি হবে।
গ্র্যাব। চুপ কর হাউলার। মহাবিদ্যা শেখা কি এ দেশের লোকের কর্ম? লেকচার শুনে হুজুকে প’ড়ে যদি মহাবিদ্যা নিয়ে লোকে একটু ছেলেখেলা আরম্ভ করে, মন্দ কি? একটু অন্যদিকে ডিসট্র্যাকশন হওয়া দেশের পক্ষে এখন দরকার হয়েছে।
হাউলার। সাধারণ বিদ্যা যখন এদেশে প্রথম চালানো হয় তখনও আমরা ব্যাপারটাকে ছেলেখেলা মনে করেছিলুম। এখন দেখছ তো ঠেলা? জোর করে টেক্সট বুক থেকে এটা—সেটা বাদ দিয়ে কি আর সামলানো যাচ্ছে?
খুদীন্দ্র। মিস্টার হাউলার ঠিক বলেছেন। আমারও ভাল ঠেকছে না।
চোমরাও আলি। ভাল—মন্দ গভর্নমেণ্ট বিচার করবেন। তবে মহাবিদ্যা যদি শেখাতেই হয়, মুসলমানদের জন্য একটা আলাদা ব্যবস্থা করা দরকার।
হোমরাও। অর্ডার, অর্ডার।
জগদগুরু। সাধারণ বিদ্যা মোটামুটি জানা না থাকলে মহাবিদ্যার ভাল রকম ব্যুৎপত্তি লাভ হয় না। পাশ্চাত্য দেশে দুই বিদ্যার মণিকাঞ্চন যোগ হয়েছে। এ—দেশেও যে মহাবিদ্বান নেই, তা নয়—
গাঁট্টালাল। হুঁ হুঁ গুরুজী আমাকে মালুম করছেন।
রূপচাঁদ। দূর, তোকে কে চেনে? আমার দিকে চাইছেন।
জগদগুরু। তবে মূর্খ লোকে মহাবিদ্যার প্রয়োগটা আত্মসম্ভ্রম বাঁচিয়ে করতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশ এ বিষয়ে অত্যন্ত উন্নত। জরির খাপের ভিতর যেমন তলোয়ার ঢাকা থাকে, মহাবিদ্যাকেও তেমনি সাধারণ বিদ্যা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। মহাবিদ্যার মূলসূত্রই হচ্ছে—যদি না পড়ে ধরা।
প্রফেসার গুঁই। আপনি কী সব খারাপ কথা বলছেন!
অনেক। শেম, শেম।
জগদগুরু। বৎস, লজ্জিত হয়ো না। তোমাদেরই এক পণ্ডিত বলেন—একাং লজ্জাং পরিত্যজ্য ত্রিভুবনবিজয়ী ভব। যদি মহাবিদ্যা শিখতে চাও তবে সত্যের উলঙ্গ মূর্তি দেখে ডরালে চলবে না। যা বলছিলুম শোন।—এই মহাবিদ্যা যখন মানুষ প্রথমে শেখে তখন সে আনাড়ী শিকারীর মত বিদ্যার অপপ্রয়োগ করে। যেখানে ফাঁদ পেতে কার্যসিদ্ধি হ’তে পারে সেখানে সে কুস্তি ল’ড়ে বাঘ মারতে যায়। দু—চারটে বাঘ হয়তো মরে কিন্তু শিকারীও শেষে ঘায়েল হয়। বিদ্যাগুপ্তির অভাবেই এই বিপদ হয়। মানুষ যখন আর একটু চালাক হয়, তখন সে ফাঁদ পাততে আরম্ভ করে, নিজে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু গোটাকতক বাঘ ফাঁদে পড়লেই আর সব বাঘ ফাঁদ চিনে ফেলে, আর সেদিকে আসে না, আড়াল থেকে টিটকারি দেয়, শিকারীরও ব্যবসা বন্ধ হয়। ফাঁদটা এমন হওয়া চাই যেন কেউ ধ’রে না ফেলে। মহাবিদ্যাও সেই রকম গোপন রাখা দরকার। তোমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো নিজের অজ্ঞাতসারে কেবল সংস্কারবশে মহাবিদ্যার প্রয়োগ কর। এতে কখনও উন্নতি হবে না। পরের কাছে প্রকাশ করা নিষেধ; কিন্তু নিজের কাছে লুকোলে মহাবিদ্যায় মরচে পড়বে। সজ্ঞানে ফলাফল বুঝে মহাবিদ্যা চালাতে হয়।
গুঁই। বড়ই গোলমেলে কথা।
লুটবেহারী। কিছু না, কিছু না। জগদগুরু নূতন কথা আর কি বলছেন। প্র্যাকটিস আমার সবই জানা আছে, তবে থিওরিটা শেখবার তেমন সময় পাইনি।
গুহা। এতদিন ছিলে কোথা হে?
লুটবেহারী। শ্বশুরবাড়ি। সেদিন খালাস পেয়েছি।
গুহা। নাঃ, তোমার দ্বারা কিছু হবে না। এই তো ধরা দিয়ে ফেললে।
লুটবেহারী। আপনাকে বলতে আর দোষ কি! দু—জনেই মহাবিদ্বান, মাসতুতো ভাই।
