-স্বর্গেও নয় নরকেও নয়, তবে ঠাঁই হবে কোথায়?
–তুই আবার জন্মাবি।
-সে তো খুব ভালই হবে। সাগর কাকা, কাকীকে বলে আমার জন্যে যেন খান কতক কাঁথা সেলাই করে রাখে।
-কাঁথা কি হবে রে?
–শুনেছি মরবার সময় মানুষের যে মনোবাঞ্ছা থাকে পরের জন্মে তাই ফলে। ফাঁসির সময় আমি কেবল তোমার আর কাকীর কথা ভাবব। দেখো, ঠিক তোমাদের ছেলে হয়ে জন্মাব। এমন বাপ মা পাব কোথায়? দাগী ছেলেকে ঘেন্না করে ফেলে দেবে না তো সাগর কাকা?
জেলের ওআডার এসে জানাল, সময় হয়ে গেছে, ভিজিটারকে এখন চলে যেতে হবে।
সাগর সামন্ত ভূষণকে একবার জড়িয়ে ধরল, তার পর ফোঁপাতে ফোঁপাতে চলে গেল।
মহাবিদ্যা
বক্তৃতা—গৃহ। উচ্চ বেদীর উপর আচার্যের আসন। বেদীর নীচে ছাত্রদের জন্য চেয়ার ও বেঞ্চ।
প্রথম শ্রেণীতে আছেন—
প্রথম শ্রেণীর কথা
মিস্টার গ্র্যাব। হ্যাল্লো মহারাজা, আপিনও দেখছি ক্লাসে জয়েন করেছেন।
হোমরাও সিং। হাঁ, ব্যাপারটা জানবার জন্য বড়ই কৌতূহল হয়েছে। আচ্ছা এই জগদগুরু লোকটি কে?
গ্র্যাব। কিছুই জানি না। কেউ বলে, এ’র নাম ভ্যাণ্ডারলুট, আমেরিকা থেকে এসেছেন; আবার কেউ বলে, ইনিই প্রফেসার ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন। ফাদার ওব্রায়েন সেদিন বলছিলেন, লোকটি devil himself— শয়তান স্বয়ং। অথচ রেভারেণ্ড ফিগস বলেন, ইনি পৃথিবীর বিজ্ঞতম ব্যক্তি, একজন সুপারম্যান। একটা কমপ্লিমেণ্টারি টিকিট পেয়েছি, তাই মজা দেখতে এলুম।
মিস্টার হাউলার। আমিও একখানা পেয়েছি।
হোমরাও। বটে? আমরা তো টাকা দিয়ে কিনেছি, তাও অতি কষ্টে। হয়তো জগদগুরু জানেন যে আপনাদের শেখবার কিছু নেই, তাই কমপ্লিমেণ্টারি টিকিট দিয়েছেন।
খুদীন্দ্রনারায়ণ। শুনেছি লোকটি নাকি বাঙালি, বিলাত থেকে ভোল ফিরিয়ে এসেছে। আচ্ছা, বলশেভিক নয় তো?
চোমরাও আলি। না না, তা হলে গভর্নমেন্ট এ লেকচার বন্ধ ক’রে দিতেন। আমার মনে হয়, জগদগুরু তুর্কি থেকে এসেছেন।
হাউলার। দেখাই যাবে লোকটি কে!
দ্বিতীয় শ্রেণীর কথা
নিতাইবাবু । জগদগুরু কোথায় উঠেছেন জানেন কি? একবার ইন্টারভিউ করতে যাব।
মিস্টার গুহা। শুনেছি বেঙ্গল ক্লাবে আছেন।
রুপচাঁদ। না—না, আমি জানি, পগেয়াপটিতে বাসা নিয়েছেন।
লুটবেহারী। আচ্ছা উনি যে মহাবিদ্যার ক্লাস খুলেছেন, সেটা কি? ছেলেবেলায় তো পড়েছিলুম—কালী, তারা, মহাবিদ্যা—
প্রফেসার গুঁই। আরে, সে বিদ্যা নয়। মহাবিদ্যা— কিনা সকল বিদ্যার সেরা বিদ্যা, যা আয়ত্ত হলে মানুষের অসীম ক্ষমতা হয়। সকলের উপর প্রভুত্ব লাভ হয়।
রূপচাঁদ। এখানে তো দেখছি হাজারো লোক লেকচার শুনতে এসেছে। সকলেরই যদি প্রভুত্ব লাভ হয় তবে ফরমাশ খাটবে কে?
গাঁট্টালাল। এই জন্যে ভাবছেন? আপনি হুকুম দিন, আমি আর তেওয়ারী দুই দোস্ত মিলে সবাইকে হাঁকিয়ে দিচ্ছি। কিছু পান খেতে দেবেন—
তেওয়ারী। না—না, এখন গন্ডগোল বাধিও না, —সাহেবরা রয়েছেন।
তৃতীয় শ্রেণীর কথা
সরেশ। আপনিও বুঝি এই বৎসর পাস করেছেন? কোন লাইনে যাবেন, ঠিক করলেন?
নিরেশ। তা কিছুই ঠিক করিনি। সেইজন্যই তো মহাবিদ্যার ক্লাসে ভর্তি হয়েছি,— যদি একটা রাস্তা পাওয়া যায়। আচ্ছা এই কোর্স অভ লেকচার্স আয়োজন করলে কে?
সরেশ। কি জানি মশায়। কেউ বলে, বিলাতের কোনও দয়ালু ক্রোরপতি জগদগুরুকে পাঠিয়েছেন। আবার শুনতে পাই, ইউনিভার্সিটিই নাকি লুকিয়ে এই লেকচারের খরচ যোগাচ্ছে।
মিস্টার গুপ্টা। ইউনিভার্সিটির টাকা কোথা? যেই টাকা দিক, মিথ্যে অপব্যয় হচ্ছে। এ রকম লেকচারে দেশের উন্নতি হবে না। ক্যাপিট্যাল চাই, ব্যবসা চাই।
দীনেশ। তবে আপনি এখানে এলেন কেন? এইসব রাজা—মহারাজাই বা কি জন্য ক্লাস অ্যাটেণ্ড করছেন? নিশ্চয়ই একটা লাভের প্রত্যাশা আছে। এই দেখুন না, আমি সামান্য মাইনে পাই, তবু ধার করে লেকচারের ফী জমা দিয়েছি—যদি কিছু অবস্থার উন্নতি করতে পারি।
সরেশ । জগদগুরু আসবেন কখন? ঘণ্টা যে কাবার হয়ে এল।
চতুর্থ শ্রেণীর কথা
গবেশ্বর। কিহে পাঁচুমিয়া এখানে কি মনে করে?
পাঁচুমিয়া। বাবুজী, এক টাকা রোজে আর দিন চলে না। তাই থালিয়া—লোটা বেচে একটা টিকিট কিনেছি, যদি কিছু হদিস পাই। তা আপনারা এত পিছে বসেছেন কেন হুজুর? সামনে গিয়ে বাবুদের সাথ বসুন না!
কাঙালীচরণ। ভয় করে।
গবেশ্বর। আমরা বেশ নিরিবিলিতে আছি। দেখ, পাঁচু, তুমি যদি বক্তৃতার কোনও জায়গা বুঝতে না পার তো আমাকে জিজ্ঞাসা ক’রো।
ঘণ্টাধ্বনি। জগদগুরুর প্রবেশ। মাথায় সেনার মুকুট, মুখে মুখোশ, গায়ে গেরুয়া আলখাল্লা। তিনি আসিয়া বহির্বাস খুলিয়া ফেলিলেন। মাথা কামানো, গায়ে তেল, পরনে লেংটি, ডান—হাতে বরাভয়, বাঁ—হাতে সিঁধকাটি। পট পট হাততালি।
হোমরাও। লোকটির চেহারা কি বীভৎস! চেনেন নাকি মিস্টার গ্র্যাব?
গ্র্যাব। চেনা চেনা বোধ হচ্ছে।
জগদগুরু। হে ছাত্রগণ, তোমাদের আশীর্বাদ করছি জগজ্জয়ী হও। আমি যে—বিদ্যা শেখাতে এসেছি তার জন্য অনেক সাধনা দরকার—তোমরা একদিনে বুঝতে পারবে না। আজ আমি কেবল ভূমিকামাত্র বলব। হে বালকগণ, তোমরা মন দিয়ে শোন—যেখানে খটকা ঠেকবে, আমাকে নির্ভয়ে জিজ্ঞাসা করবে।
প্রফেসার গুঁই। আমি স্ট্রংলি আপত্তি করছি—জগদগুরু কেন আমাদের ‘বালকগণ— তোমরা’ বলবেন? আমরা কি স্কুলের ছোকরা? এটা একটা রেস্পেকটেবল গ্যাদারিং। এই মহারাজা হোমরাও সিং, নবাব চোমরাও আলি রয়েছেন। পদমর্যাদা যদি না ধরেন, বয়সের একটা সম্মান তো আছে। আমাদের মধ্যে অনেকের বয়স ষাট পেরিয়েছে।
