ভীম বললেন, আমার বিশ্রামের দরকার হয় না। চার ঘটি মাধ্বীক পান করেছি, তাতেই ক্লান্তি দূর হয়েছে, এখন আবার যুদ্ধে লেগে যেতে পারি। কৃষ্ণ, তোমার বিশ্রামের ব্যাঘাত করছি না তো?
কৃষ্ণ। না না, আপনি এই খট্বায় বসুন। সেবকের প্রতি কি আদেশ বলুন।
ভীম। তোমার কাছে কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।
কৃষ্ণ। চোক্কমল্ল তোক্কমল্ল, তোমরা এখন যেতে পার, আর আমার সেবার প্রয়োজন নেই। আর্য ভীমসেন, বলুন কি জানতে চান।
ভীম। হাঁ হে কেশব, আজ যুদ্ধের পূর্বে অর্জুনের কি হয়েছিল? তুমি তাকে কিসব বলছিলে? আমি দূরে ছিলুম, শুনতে পাই নি, শুধু দেখেছি—অর্জুন তার ধনুর্বাণ ফেলে দিয়ে কাঁদছিল; হাত জোড় করছিল, পাগলের মতন ফ্যালফ্যাল করে তোমার দিকে তাকাচ্ছিল আবার বার বার নমস্কার করছিল। ব্যাপার কি? যদি গোপনীয় না হয় তবে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত কর।
কৃষ্ণ। বিশেষ কিছুই নয়। কুরুপাণ্ডব দু পক্ষেই গুরুজন বয়স্য ও স্নেহভাজন আত্মীয়গণ আছেন দেখে অর্জুন কৃপাবিষ্ট হয়েছিলেন। বলছিলেন, যুদ্ধ করবেন না।
ভীম। অর্জুনটা চিরকাল ওইরকম, মাঝে মাঝে তার ভাব উথলে ওঠে। কৃপাবিষ্ট হবার আর সময় পেলেন না! তা তুমি তাকে কি বললে?
কৃষ্ণ। বললুম, তুমি ক্ষত্রিয়, ধর্মযুদ্ধ করা তোমার অবশ্য কর্তব্য। তাতে লাভও আছে, যদি জয়ী হও তো পৃথিবীর রাজ্য ভোগ করবে, যদি মর তো সোজা স্বর্গে যাবে।
ভীম। একেবারে খাঁটি কথা। তাতে অর্জুনের আক্কেল হল?
কৃষ্ণ। সহজে হয় নি। তাকে অনেক রকমে বুঝিয়ে বললুম, তুমি নিষ্কাম হয়ে কর্তব্য কর্ম কর, ফলাফল ভেবো না। তারপর তাকে কর্মযোগ জ্ঞানযোগ ভক্তিযোগ প্রভৃতিও বোঝালুম। অর্জুনের মোহ দূর করতে আমাকে প্রায় দুটি ঘণ্টা বকতে হয়েছিল।
ভীম। দুর্যোধনের দল আমাদের উপর কিরকম অত্যাচার করেছিল অর্জুন তা ভুলে গেছে নাকি? তুমি সব মনে করিয়ে দিয়েছিলে তো?
কৃষ্ণ। মনে করিয়ে দেবার কথা আমার মনেই পড়ে নি।
ভীম। বল কি হে মধুসূদন! ছেলেবেলায় আমাকে বিষ খাইয়ে গঙ্গায় ফেলে দিয়েছিল, জতুগৃহে আমাদের সকলকে পুড়িয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল, এসব কথা অর্জুনকে বল নি?
কৃষ্ণ। কই, না।
ভীম। আশ্চর্য, এর মধ্যেই তোমার ভীমরতি হল নাকি? পাশা খেলায় শকুনির জুয়াচুরি, দুঃশাসনের হাতে পাঞ্চালীর নিগ্রহ, এসবও মন করিয়ে দাও নি! উঃ দুঃশাসনের নাম করলেই আমার রক্ত টগবগ করে ফুটে ওঠে। আচ্ছা, আমাদের কথা না হয় ছেড়ে দিলে, কিন্তু তুমি যখন ধর্মরাজের দূত হয়ে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে কৌরবসভায় গিয়েছিলে, তখন দুর্যোধন তোমাকে বন্দী করতে চেয়েছিল। তার পর সেদিন শকুনির ব্যাটা উলূক এসে দুর্যোধনের হয়ে তোমাকে যাচ্ছেতাই গালাগাল দিয়ে গেল, এও তুমি ভুলে গেছ নাকি?
কৃষ্ণ। কিছুই ভুলি নি। কিন্তু যুদ্ধের আগে এসব কথা অর্জুনকে বলবার প্রয়োজন দেখি না। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির যখন পাঁচটি মাত্র গ্রাম চেয়েছিলেন তখন তো কৌরবদের সমস্ত অপরাধ মন থেকে মুছে ফেলেছিলেন। দুর্যোধন আমার প্রস্তাবে সম্মত হন নি, তাই আপনাদের মন্ত্রণাসভায় যুদ্ধ করা স্থির হয় এবং সেজন্যই আপনারা যুদ্ধ করছেন। কৌরবদের অপরাধ স্মরণ করা এখন নিরর্থক।
হাতে হাত ঘষে ভীম বললেন, কৃষ্ণ, তোমার শরীরে কি ক্রোধ বলে কিছুই নেই?
কৃষ্ণ। আছে বই কি। মানুষ হয়ে যখন জন্মেছি তখন মানুষের সব দোষই আছে।
ভীম। ক্রোধকে দোষ বলতে চাও! তুমি তো একজন মস্ত পণ্ডিত—আমাদের ছটি রিপু আছে জান? তাতে আমাদের কত উপকার হয় ভেবে দেখেছ?
কৃষ্ণ। রিপু তো দমন করাই উচিত।
ভীম। দমনের মানে কি লোপ? রিপুর লোপ হলে মানুষ পাথর হয়ে যায়, যেমন আমাদের ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেব হয়েছেন। মেয়েরা তাঁকে গ্রাহ্য করে না, সামনেই স্নান করে।
কৃষ্ণ। প্রথম তিন রিপুর দমন এবং শেষ তিনটির লোপ করতে পারলেই মঙ্গল হয়।
ভীম। এইবারে তুমি কতকটা পথে এসেছ। মোহ মদ মাৎসর্য–এই তিনটে প্রবল হলে মানুষের বুদ্ধিনাশ হয়, একেবারে লোপ পেলেও বোধ হয় বিশেষ কিছু ক্ষতি হয় না। কিন্তু প্রথম তিনটি না থাকলে বংশরক্ষা হয় না, আত্মরক্ষা হয় না, ধনাগম হয় না।
কৃষ্ণ। সাধু সাধু! ভীমসেন, আপনি অনেক চিন্তা করেছেন দেখছি।
ভীম খুশী হয়ে বললেন, ওহে জনার্দন, তুমি হয়তো মনে কর যে মধ্যম পাণ্ডব শুধুই একজন গোঁয়ারগোবিন্দ দুর্ধর্ষ বীর, যুদ্ধ আর ভোজন ছাড়া কিছুই জানে না। তা নয়, আমি দর্শনশাস্ত্রেরও একটু আধটু চর্চা করেছি। যদি চাও তো কিঞ্চিৎ তত্ত্বকথা শোনাতে পারি।
আগ্রহ দেখিয়ে কৃষ্ণ বললেন, অবশ্যই শুনব, আপনি অনুগ্রহ করে বলুন।
ভীম। ছয় রিপুর মধ্যে প্রথম তিনটিই আবশ্যক, আবার সেই তিনটির মধ্যে প্রথম দুটি কাম আর ক্রোধ, না হলেই নয়। কামতত্ত্ব তোমাকে বোঝান বাহুল্য মাত্র, লোকে বলে তোমার নাকি ষোল হাজার কারা সব আছেন–
কৃষ্ণ সহাস্যে বললেন, লোকে বলে আপনি প্রত্যহ ষোল হাজার লাড্ডু ভোজন করেন। উড়ো কথায় কান দেবেন না। কামতত্ত্ব থাক, আপনি ক্রোধতত্ত্ব ব্যাখ্যা করুন।
ভীম। কোনও বিষয়ের বাড়াবাড়ি ভাল নয়। বেশী খেলে মেদবৃদ্ধি হয়, উদর স্ফীত হয়, যুদ্ধের শক্তি কমে যায়। কিন্তু উপযুক্ত আহার না হলে জীবনরক্ষাও হবে না। অত্যধিক ক্রোধও ভাল নয়, তাতে হাত পা কাঁপে, লক্ষ্যভ্রংশ হয়, যুদ্ধে নিপুণতার হানি হয়। কিন্তু ক্রোধ বর্জন করলে আত্মরক্ষা ও স্বজনরক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
