আমি বললুম, মহামুনি, শান্ত হ’ন, আপনি শুধু শুধু কষ্ট পাচ্ছেন। ভরত রাজা তো কবে স্বর্গলাভ করেছেন, তাঁর আর ঝুমঝুমির দরকার কি? আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে তপস্যা করুন, যোগ—সাধনা করুন, হরিনাম করুন। অথবা লোকশিক্ষার নিমিত্ত জীবন—স্মৃতি লিখুন, জটাশ্মশ্রুধারী উগ্রতপা মুনি—ঋষিদের সঙ্গে প্ল্যামার গার্ল অপ্সরাদের মোলাকাত বিবৃত করুন, পত্রিকাওয়ালারা তা নেবার জন্য কাড়াকাড়ি করবে। ঝুমঝুমির কথা একেবারে ভুলে যান।
—হায় হায়, ভোলবার জো কি! ওই ঝুমঝুমিই হচ্ছে মেনকার অভিশাপ, শকুন্তলার প্রতিশোধ। আমার মাথা খারাপ হ’য়ে গেছে, যখন তখন ঝুমঝুম শব্দ শুনি।
দুর্বাসা হঠাৎ চিৎকার করে হাত পা ছুড়ে নাচতে লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুলিনের ছেলে পল্টু তাঁর পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠল—মেরে ফেললে রে, সব কটাকে মেরে ফেললে!
ব্যাপার গুরুতর। পল্টু নিবিষ্ট হয়ে ঝুমঝুমির ইতিহাস শুনছিল। সেই অবকাশে ইঁদুরগুলো তার পকেট থেকে বেরিয়ে দুর্বাসাকে আক্রমণ করেছে। দুটো তাঁর কাঁধে উঠেছে, একটা অধোবাসে ঢুকে গেছে, আর একটা কোথায় আছে দেখা যাচ্ছে না। তাঁর নাচের ঝাকুনিতে তিনটে ইঁদুর নীচে পড়ে গেল। পল্টু কোনও রকমে সেগুলোকে দুর্বাসার পদাঘাত থেকে রক্ষা করলে।
দুর্বাসা বললেন, তুই অতি দুর্বিনীত বালক।
পুলিন বললে, টেক কেয়ার তপোধন, আমার ছেলেকে যদি শাপ দেন তো ভাল হবে না বলছি।
দুর্বাসা বললেন, ইঁদুর পোষা মহাপাপ, চণ্ডালেও পোষে না।
পল্টু রেগে গিয়ে বললে, বা রে আপনি যে নিজের গায়ে ছারপোকা পোষেন তা বুঝি খুব ভাল? দেখ না বাবা, ঋষি মশায়ের গা থেকে কত ছারপোকা আমাদের বিছানায় এসেছে। আর একটা ইঁদুর কোথা গেল? খুঁজে পাচ্ছি না যে—
দুর্বাসা আবার চিৎকার করে নাচতে লাগলেন। পল্টু বললে, ওই ওই, দাড়ির ভেতর একটা সেঁধিয়েছে।
অনুমতি না নিয়েই পল্টু দুর্বাসার দাড়িতে হস্তক্ষেপ করে তার ভেতর থেকে ইঁদুরটাকে টেনে বার করলে। তার পর বললে, ঝুমঝুম শব্দ হচ্ছে কেন?
আমি লাফিয়ে উঠে বললুম, ঝুমঝুম শব্দ? বলিস কি—রে! প্রভু, আপনার দাড়িটি একবার নাড়ুন তো।
দুর্বাসা দাড়ি নাড়লেন। সেই নিবিড় শ্মশ্রুজাল ভেদ করে ক্ষীণ শব্দ নির্গত হল—ঝুম ঝুম ঝুম। যেন নৃত্যপরা মেনকার নূপুরনিক্কণ দূরদূরান্তর থেকে ভেসে আসছে।
পুলিন দাড়ির নীচের ঝুঁটিটা একবার টিপে দেখলে, তার পর গেরো খুলতে লাগল। দুর্বাসা বললেন, আরে লাগে লাগে! কে তার কথা শোনে, আমি তাঁর মাথাটি জোর করে ধরে রইলুম, পুলিন পড়পড় করে দাড়ি ছিঁড়ে ভেতর থেকে ঝুমঝুমি বার করলে। সোনার কি রূপোর কি টিনের বোঝা গেল না, ময়লায় কালো হয়ে গেছে, কিন্তু বাজছে ঠিক।
পল্টু চুপি চুপি বললে, এক্স—রে করলে কোন কালে বেরিয়ে পড়ত, নয় বাবা? পল্টুর অভিজ্ঞতা আছে, বছর দুই আগে সে একটা পয়সা গিলেছিল।
দুর্বাসা একটি সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, একেই বলে গেরোর ফের। ঝুমঝুমিটি যে যত্ন করে দাড়ির গেরোর মধ্যে গুঁজে রেখেছিলুম তা মনেই ছিল না। তার পর পল্টুর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, বৎস! আমি আশীর্বাদ করছি তুমি রাজা হবে।
আমি বললুম, ও আশীর্বাদ আর ফলবার উপায় নেই প্রভু, রাজাটাজা লোপ পেয়েছে। বরং এই আশীর্বাদ করুন যেন ও মন্ত্রী হতে পারে, অন্তত পাঁচ বছরের জন্য।
—বেশ সেই আশীর্বাদ করছি। কিন্তু রাজা না থাকলে রাজকার্য চলবে কি করে?
—আজকাল তা চলে। আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে কর্তা না থাকলেও ক্রিয়া নিষ্পন্ন হয়।
দুর্বাসা বললেন, আমি এখন উঠি। যাঁর জিনিস তাঁকে অর্পণ করে সত্বর দায়মুক্ত হয়ে ব্রহ্মলোকে যেতে চাই।
—অর্পণ করবেন কাকে?
—কেন; মহারাজ ভরতের বংশধর নেই?
—কেউ নেই, ভরতবংশ অর্থাৎ যুধিষ্ঠির—পরিক্ষীতের বংশ লোপ পেয়েছে। তাঁদের যাঁরা উত্তরাধিকারী—নন্দ মৌর্য শুঙ্গ অন্ধ্র গুপ্ত প্রভৃতি, তার পর পাঠান মোগল ইংরেজ, এঁরাও ফৌত হয়েছেন। ভরতের রাজ্য এখন দুভাগ হয়েছে, বড়টি ভারতীয় গণরাজ্য, ছোটটি ইসলামীয় পাকিস্থান।
—একজন চক্রবর্তী রাজা আছেন তো?
—এখন আর নেই, দুই রাজ্যে দুই রাষ্ট্রপতি বাহাল হয়েছেন, একজন দিল্লীতে আর একজন করাচিতে থাকেন। আইন অনুসারে এঁরাই ভারতের স্থলাভিষিক্ত, সুতরাং ঝুমঝুমিটি এঁদেরই হক পাওনা। কিন্তু দেবেন কাকে? একজনকে দিলে আর একজন ইউ—এন—ও—তে নালিশ করবেন, না হয় ঘুষি বাগিয়ে বলবেন, লড়কে লেংগে ঝুমঝমা।
দুর্বাসা ক্ষণকাল ধ্যানমগ্ন হয়ে রইলেন। তর পর মট করে ঝুমঝুমিটি ভেঙে বললেন, একজনকে দেব এই খোলটা যাতে পাথরকুচি আছে, নাড়লে কড়রমড়র করে। আর একজনকে দেব এই ডাঁটিটা, ফুঁ দিলে পিঁ পিঁ করে। দাও তো গোটা দশ টাকা রাহাখরচ।
টাকা নিয়ে দুর্বাসা তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।
১৩৫৮ (১৯৫১)
ভীমগীতা
প্রথম দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। সন্ধ্যাবেলায় কুরুপাণ্ডব বীরগণ নিজ নিজ শিবিরে ফিরে এসে স্নান ও জলযোগের পর বিশ্রাম করছেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর খাটিয়ায় শুয়ে আছেন, দু’জন বামন সংবাহক তাঁর হাত—পা টিপে দিচ্ছে। এমন সময় ভীমসেন এসে বললেন, বাসুদেব, ঘুমুলে নাকি?
কৃষ্ণ কুন্তীপুত্রদের মামাতো ভাই। তিনি অর্জুনের প্রায় সমবয়সী, সেজন্য যুধিষ্ঠির আর ভীমকে সম্মান করেন। ভীমকে দেখে বিছানা থেকে উঠে বললেন, আসতে আজ্ঞা হোক মধ্যম পাণ্ডব। আপনি বিশ্রাম করলেন না?
