কৃষ্ণ। ক্রোধ ত্যাগ করেও তো আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা যায়।
ভীম। যেমন কাম ত্যাগ করে বংশরক্ষা করা যায়! কৃষ্ণ, বাজে কথা বলো না।
কৃষ্ণ। অনেক যোগী তপস্বী আছেন যাঁদের ক্রোধ মোটেই নেই।
ভীম। তাঁদের কথা ছেড়ে দাও। তাঁদের স্বজন নেই, আত্মরক্ষারও দরকার হয় না। সকলেই জানে তাঁরা শাপ দিয়ে ভস্ম করে ফেলতে পারেন, সেজন্য কেউ তাঁদের ঘাঁটায় না, তাঁরাও নির্বিবাদে অক্রোধী অহিংস হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু আমরা তপস্বী নই, তাই দুর্যোধন শত্রুতা করতে সাহস করে। অন্যায়ের প্রতিকার এবং দুষ্টের দমনের জন্যই বিধাতা ক্রোধ সৃষ্টি করেছেন। একাদশ রুদ্র আমাদের দেহে অধিষ্ঠিত আছেন, দেহীর অপমান হলে তাঁরা রক্তে রৌদ্ররস—সঞ্চার করেন, তার ফলে মানুষ উত্তেজিত হয়ে শত্রুকে আক্রমণ করে, কোনও রকম বিচারের দরকার হয় না। বুঝতে পারলে?
কৃষ্ণ। আজ্ঞে হাঁ, বুঝেছি।
ভীম। যদি তৎক্ষণাৎ অপমানের শাস্তি দেওয়া কোনও কারণে অসম্ভব হয় তবে ক্রোধ মন্দীভূত হয়, প্রতিহিংসার প্রবৃত্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। এই কারণেই বীরগণ যুদ্ধের পূর্বে নিজের বিক্রম ঘোষণা করে এবং শত্রুকে কটুবাক্য বলে ক্রোধ ঝালিয়ে নেন। শত্রুও অশ্রাব্য ভাষায় পালটা গালাগালি দেয়, তা শুনে রৌদ্ররসের পুনঃসঞ্চার হয়, উত্তেজনা আসে, প্রহারশক্তি বৃদ্ধি পায়।
কৃষ্ণ। কিন্তু জ্ঞানীদের উপদেশ—অক্রোধ দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে।
ভীম। গোবিন্দ, তুমি নিতান্তই হাসালে। কংসকে মেরেছিলে কেন? জরাসন্ধকে মারবার জন্য আমাকে আর অর্জুনকে নিয়ে গিয়েছিলে কেন? রাজসূয় যজ্ঞের সভায় শিশুপালের মুণ্ডচ্ছেদ করেছিলে কেন? তোমার অক্রোধ কোথায় ছিল? আজ রণক্ষেত্রে অর্জুনের অক্রোধ দেখেও তাকে যুদ্ধে উৎসাহ দিলে কেন? কৃষ্ণ, তুমি নিজের মতিগতি বুঝতে পার না, পাত্রাপাত্রের ভেদও জান না। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি শোন। বিপক্ষ যদি সজ্জন হয়, তার শত্রুতা যদি ভ্রান্ত ধারণার জন্য হয়, তবেই অক্রোধ আর অহিংসা চলতে পারে। ভদ্র বিপক্ষ যদি দেখে যে অপর পক্ষ প্রতিহিংসার চেষ্টা করছে না, শুধু ধীরভাবে প্রতিবাদ করছে, তবে তার ক্রোধ শান্ত হয়ে আসে, সে ন্যায়—অন্যায় বিচারের সময় পায়, নিজের কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়। হয়তো মার্জনা চাইতে সে লজ্জাবোধ করে, কিন্তু অপরপক্ষ যদি উদারতা দেখায় তবে সহজেই শত্রুতার অবসান হয়। বিরাট রাজা—আহা বেচারার দুই ছেলে আজ মারা গেল—কঙ্কবেশী যুধিষ্ঠিরকে পাশা ছুড়ে মেরেছিলেন, রক্তপাত করেছিলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠির রাগ দেখান নি। বিরাট ভদ্রলোক, সেজন্য যুধিষ্ঠিরের অক্রোধে ফল হল, ব্যাপারটা সহজেই মিটে গেল। আর দুর্যোধনকে দেখ। তার সহস্র অপরাধ আমাদের ধর্মরাজ ক্ষমা করেছেন, দুরাত্মাকে সুযোধন বলে আদর করেছেন, কিন্তু তার ফল কিছুই হয়নি। কারণ, দুর্যোধন ভদ্র নয়, স্বভাবত দুর্বৃত্ত। তার ভাইরা, শকুনি মামা, আর উচ্ছিষ্টভোজী সূতপুত্র কর্ণও সমান নরাধম। ধর্মরাজের সহিষ্ণুতার ফলে এদের আস্পর্ধা বেড়ে গেছে। এই সব দেখেও কি তুমি বলবে যে অক্রোধ দ্বারা ক্রোধ জয় করতে হবে?
কৃষ্ণ। ভীমসেন, আপনার যুক্তি যথার্থ। অক্রোধ দ্বারা সজ্জনকেই জয় করা যায়, কিন্তু দুর্জনকে জয় করবার জন্য ধর্মযুদ্ধ আবশ্যক। আপনারা সেই ধর্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়েছেন। ধর্মযুদ্ধে ক্রোধ ও প্রতিশোধের প্রবৃত্তি বর্জনীয়। যদি যুদ্ধই কর্তব্য হয় তবে রাগদ্বেষ ত্যাগ করতে হবে। এই কারণেই দুর্যোধনের অপরাধের কথা অর্জুনকে মনে করিয়ে দেওয়া আবশ্যক মনে করি নি।
ভীম। প্রকাণ্ড ভুল করেছ। সোজা উপায় ছেড়ে দিয়ে বাঁকা পথে গেছ, ধান ভানতে শিবের গীত গেয়েছ, দু ঘণ্টা ধরে তত্ত্বকথা শুনিয়ে অতি কষ্টে অর্জুনকে যুদ্ধে নামাতে পেরেছ। যদি তাকে রাগিয়ে দিতে তবে তখনই কাজ হত, কর্মযোগ জ্ঞানযোগ ভক্তিযোগ কিছুই দরকার হত না। এই আমাকে দেখ, –বিধাতা শাস্ত্রজ্ঞান বেশী দেন নি, কিন্তু আমার জঠরে যেমন অগ্নিদেব আছেন তেমনি গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে রুদ্রগণ নিরন্তর বিরাজ করছেন। কেউ যদি আমাকে অপমান করে তবে একাদশ রুদ্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার দেহে শত হস্তীর বল আসে, বাহু লৌহময় হয়, গদা তৎক্ষণাৎ শত্রুর প্রতি ধাবিত হয়, তত্ত্বকথা শোনাবার দরকারই হয় না।
কৃষ্ণ। আপনার কথা সত্য। কিন্তু সকল মানুষের প্রকৃতি সমান নয়। আপনারা পাঁচ ভ্রাতা সকলেই ক্রোধপ্রবণ নন। আপনাকে যুদ্ধে উৎসাহ দেওয়া অনাবশ্যক, কিন্তু ধর্মরাজ আর অর্জুনের উপর রুদ্রগণের প্রভাব অল্প, সেজন্য মাঝে মাঝে তাঁদের তত্ত্বকথা শোনাতে হয়। আর একটি কথা আপনাকে নিবেদন করি। ক্রোধে ক্ষিপ্ত হওয়া কি ভাল? পরিণাম না ভেবে প্রবল শত্রুকে আক্রমণ করলে অনেক সময় নিজের ও আত্মীয়বর্গের সর্বনাশ হয়।
ভীম। জন—কয়েকের সর্বনাশ হলই বা। সাপের মাথায় পা দিলে সাপ অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই ছোবল মারে। তারপর হয়তো সে লাঠির আঘাতে মরে, কিন্তু তার জাতির খ্যাতি বেড়ে যায়। লোকে বলে, সর্পজাতি অতি ভয়ানক, সাবধান, ঘাঁটিও না। বাঘ যখন বাছুরকে ধরে তখন গরু প্রাণের মায়া করে না, ক্রোধের বশে শত্রুকে শৃঙ্গাঘাত করে। এজন্য সকলেই শৃঙ্গীকে সম্মান করে। যে লোক পরিণাম না ভেবে ক্রোধের বশে শত্রুকে আঘাত করে, সে হঠকারিতার ফলে নিজে মরতে পারে, তার আত্মীয়রাও মরতে পারে, কিন্তু তার স্বজাতির খ্যাতি ও প্রতাপ বেড়ে যায়। হৃষীকেশ, ক্রোধ বিধিদত্ত মনোবৃত্তি, নামে রিপু হলেও মিত্র, তার নিন্দা করো না। ক্রোধের প্রভাবে আমি কি দারুণ কর্ম করব তা দেখতে পাবে। ধৃতরাষ্ট্রকে নির্বংশ করব, দুঃশাসনের রক্তপান করব, দুর্যোধনের ঊরু চূর্ণ করব। আমার কীর্তি হবে কি অকীর্তি হবে তা গ্রাহ্য করি না; কিন্তু লোকে চিরকাল বলবে, হাঁ, ভীম একটা পুরুষ ছিল বটে, অত্যাচার সইত না, দুরাত্মাদের শাস্তি দিতে জানত।
