গুরুপদবাবু নির্বাক নিশ্চল। গোবর্ধন মল্লিক তাঁর কারবার এবং তৃতীয়পক্ষ সংক্রান্ত অভাব—অভিযোগ করুণ স্বরে দেবাদিদেবকে নিবেদন করিতে লাগিলেন। গণেশ—মামা শিবস্তোত্র আবৃত্তি করিতে লাগিলেন—যেটি তাঁর ছোট মেয়ে মহাকালী পাঠশালায় শিখিয়াছে।
নিবারণ সত্যব্রতকে চুপিচুপি বলিল—’এইবার।’ সত্যব্রত উচ্চৈচঃস্বরে বলিয়া উঠিল—’বম বাবা মহাদেব!’
একটু পরে হঠাৎ বাহিরে একটা কলরব উঠিল। তারপর চিৎকার করিয়া কে বলিল—’আগ লাগা হ্যায়।’
বিরিঞ্চিবাবার গালবাদ্য থামিল। তিনি চঞ্চল হইয়া ইতস্তত চাহিতে লাগিলেন। মামাবাবু ব্যস্ত হইয়া বাহিরে গেলেন।
‘আগুন—আগুন—বেরিয়ে আসুন শিগগির।’ ঘন ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকাইয়া ঘরে ঢুকিতে লাগিল। বিরিঞ্চিবাবা এক লাফে গৃহত্যাগ করিলেন। গোবর্ধনবাবু চিৎকার করিতে করিতে বাবার পদানুসরণ করিলেন, বুঁচকী পিতার হাত ধরিয়া বলিল—’বাবা, বাবা, ওঠ!’ নিবারণ কহিল—’এখন যাবেন না, একটু বসুন, কোনও ভয় নেই।’
মহাদেবের টনক নড়িল। তিনি উসখুস করিতে লাগিলেন। নিবারণ একটা বাতি জ্বালিল। মহাদেব পিছনের দরজা দিয়া পলায়নের উপক্রম করিলেন—অমনি সত্যব্রত জাপটাইয়া ধরিল।
মহাদেব বলিলেন—’আঃ—ছাড়—ছাড়—লাগে, মাইরি এখন ইয়ারকি ভাল লাগে না—চাদ্দিকে আগুন—ছেড়ে দাও বলছি।’
সত্যব্রত বলিল—’আরে অত ব্যস্ত কেন। একটু আলাপ পরিচয় হ’ক। তারপর ক্যাবলরাম, কদ্দিন থেকে দেবতাগিরি করা হচ্ছে?’
বাহির হইতে দু—চারজন লোক হোমঘরে প্রবেশ করিল। ফেকু পাঁড়ের জিম্মায় কেবলানন্দকে দিয়া নিবারণ ও সত্যব্রত বিস্ময়—বিমূঢ় গুরুপদবাবু ও তাঁর কন্যাকে বাহিরে আনিল।
বাড়িতে আগুন লাগে নাই। পাশের ঘরে খানিকটা ভিজা খড় কে জ্বালাইয়া দিয়াছিল। দরোয়ান, মৌলবী সাহেব, কোচমান এবং অমূল্য হাবলা প্রভৃতি সত্যব্রতের অনুচরবৃন্দ মিথ্যা হল্লা করিয়াছে।
বিরিঞ্চিবাবা ভাঙেন কিন্তু মচকান না। বলিলেন—’কেমন গুরুপদ, এখন আশা মিটল তো? যে নাস্তিক, তার দিব্য দৃষ্টি হবে কেন? তাই তোমার কপালে দেবতা দেখা দিয়েও দিলেন না। শেষটায় মানুষের মূর্তি ধ’রে বিদ্রূপ করলেন।’
সত্যব্রত বলিল—’বিদ্রূপ ব’লে বিদ্রূপ! মহাদেব প’চে গিয়ে বেরুল ক্যাবলা। বিরিঞ্চিবাবা হয়ে গেলেন জোচ্চোর।’
গোবর্ধনবাবু বলিলেন—’ব্যাটা আমাদের সঙ্গে চালাকি? গোবর্ধন মল্লিক পাঁচটা হৌসের মুচ্ছুদ্দী, বড় বড় ইংরেজ চরিয়ে খায়,—তাকে তুমি ঠকাবে? মারো শালেকে দুই থাবড়া।’
গুরুপদবাবু এতক্ষণে প্রকৃতিস্থ হইয়াছেন। বলিলেন—’না না, যেতে দাও, যেতে দাও। সত্য, গাড়িটা জুতিয়ে এঁদের স্টেশনে পাঠাবার ব্যবস্থা কর। কেউ যেন কিছু না বলে।’
তল্পিতল্পা গুছানো হইলে সত্য সশিষ্য বিরিঞ্চিবাবাকে গাড়িতে তুলিয়া দিল। বিদায়কালে বলিল—’প্রভু, তা হ’লে নিতান্তই চললেন? চন্দ্র—সূর্য আপনার জিম্মায় রইল, দেখবেন যেন ঠিক চলে। দম দিতে ভুলবেন না, আর মধ্যে মধ্যে অয়েল করবেন।’
ভিড় কমিলে গুরুপদবাবু বলিলেন—’বাবা নিবারণ, বাবা সত্য, তোমরা আমায় রক্ষা করেছ, এ উপকার আমি ভুলব না। আজ তোমরা এখানেই খাওয়া—দাওয়া ক’রে থাক, অনেক রাত হয়েছে। একি সত্য, তোমার হাতে রক্ত কেন?’
সত্য। ও কিছু নয়, ধস্তাধস্তির সময় মহাদেব একটু কামড়ে দিয়েছিলেন। আপনি ব্যস্ত হইবেন না, বিশ্রাম করুন গিয়ে।
গুরুপদ। তবে তুমি আমার সঙ্গে এস, বুঁচকী টিংচার আয়োডিন দিয়ে বেঁধে দেবে এখন।
আহারান্তে সত্য বলিল— ‘ওঃ, কি মুশকিলেই পড়া গেছে।’
নিবারণ বলিল— ‘আবার কি হ’ল রে?’
সত্য। নিবারণ—দা!
নিবারণ। বল না কি।
সত্য। নিবারণ—দা!
নিবারণ। ব’লেই ফ্যাল না কি।
সত্য। আমি বুঁচকীকে বে করব।
নিবারণ। তা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু তোর সঙ্গে বিয়ে যদি না দেয়?
সত্য। আলবৎ দেবে, বুঁচকীর বাপ দেবে।
নিবারণ। বাপ না হয় রাজী হ’ল, কিন্তু মেয়ে কি বলে?
সত্য। বড় গোলমেলে জবাব দিচ্ছে।
নিবারণ। কি বলে বুঁচকী?
সত্য। বললে—যাঃ।
নিবারণ। দূর গাধা, যাঃ মানেই হ্যাঁঃ।
ভবতোষ ঠাকুর
ভবতোষ সরকারের বয়স তিপ্পান্ন। উলুবেড়ের সবডেপুটি ছিলেন, তিন বছর হল চাকরি ছেড়েছেন। এখন কেবল পড়েন আর ভাবেন। নিঃসন্তান, স্ত্রী আছেন। কলকাতার ভাড়া বাড়িতে বাস করেন, পেনশন যা পান তাতে কোনও রকমে সংসার চলে।
সকাল আটটা। দোতলায় সিঁড়ির পাশে একটি ছোট ঘরে তক্তপোশে ছেঁড়া শতরঞ্জির উপর বসে ভবতোষ চোখ বুজে কি একটা ভাবছেন। তাঁর দুই ভক্ত জিতেন আর বিধু মেঝেতে মাদুরের উপর বসে আছে।
জিতেন বললেন, প্রভু, শুনেছেন?
ভবতোষের সাড়া নেই।
জিতেন। প্রভু, ও প্রভু, দয়া করে একবারটি শুনুন।
এবারে ভবতোষের হুঁশ হল। বললেন, আঃ! কেন খামকা প্রভু প্রভু করছ? আমি সামান্য মানুষ, কারও প্রভু নই। ফের যদি প্রভু বল তো সাড়া দেব না।
জিতেন। বুঝেছি। আচ্ছা ঠাকুর—
ভবতোষ। দেবতা আর নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকেই ঠাকুর বলে। আবার রসুয়ে বামুন আর পশ্চিম অঞ্চলে নাপিতকেও ঠাকুর বলে। আমি কায়স্থসন্তান, ঠাকুর হতে পারি না।
হাত জোড় করে জিতেন বললে, প্রভু, কায়স্থরা তো ক্ষত্রিয়, জনক আর শ্রীকৃষ্ণের স্বজাতি। তাঁদের মতন আপনিও তত্ত্বকথা বলে থাকেন, আপনার ব্রাহ্মণ ভক্তও অনেক আছে। দয়া করে যদি পইতেটি নিয়ে ফেলেন আর মাথায় একটি শিখা রাখেন তবে আর সংকোচের কারণ থাকবে না।
