মিস্টার সেন। মাই ঘড!
সত্যের কানের ভিতর গঙ্গাফড়িং, নাকের ভিতরে গুবরে পোকা কুরিয়া কুরিয়া খাইতেছে।
মিস্টার সেন নিবারণকে জিজ্ঞাসা করিলেন—’ইনি তা হ’লে গৌটামা বুডঢাকেও জানতেন?’
নিবারণ। নিশ্চয়। গৌতম বুদ্ধ কোন ছার, প্রভু মনু—পরাশরের সঙ্গে এক ছিলিমে গাঁজা খেতেন। সবার সঙ্গে ওঁর আলাপ ছিল। ভগীরথ, টুটেন খামেন, নেবু—চাড—নাজার, হাম্মুরাব্বি, নিওলিথিক ম্যান, পিথেকানথ্রোপস ইরেক্টস, মায় মিসিং লিঙ্ক।
মিস্টার সেন চক্ষু কপালে তুলিয়া বলিলেন—’মাঃই!’
সাতটা বাঘ সত্যর পিছনে তাড়া করিয়াছে। সামনে তিনটা ভালুক থাবা তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে।
বিরিঞ্চিবাবা কহিলেন—’একবার মহপ্রলয়ের পর বৈবস্বত আমায় বললে—নীল—লোহিত কল্পে কি? না, শ্বেতবরাহ কল্প তখন সবে শুরু হয়েছে। বৈবস্বত বললে—মানুষ তো সৃষ্টি করলুম, কিন্তু ব্যাটারা দাঁড়াবে কোথা, খাবে কি? —চারিদিকে জল থই থই করছে। আমি বললুম—ভয় কি বিবু, আমি আছি, সূর্যবিজ্ঞান আমার মুঠোর মধ্যে। সূর্যের তেজ বাড়িয়ে দিলুম, চোঁ ক’রে জল শুকিয়ে গেল, বসুন্ধরা ধনধান্যে ভরে উঠল। চন্দ্র—সূর্য চালাবার ভার আমারই ওপর কিনা।’
মিস্টার সেন কেবল মুখব্যাদান করিলেন।
সত্য মরিয়া গিয়াছে। পঞ্জাব মেলের সঙ্গে দার্জিলিং সেলের কলিশন—রক্তারক্তি—পিসীমা—
কিছুতেই কিছু হইল না। পুঞ্জীভূত হাসি সত্যব্রতের চোখ নাক মুখ ফাটিয়া বাহির হইবার উপক্রম করিল। সে তখন নিরুপায় হইয়া বিপুল চেষ্টায় হাসিকে কান্নায় পরিবর্তিত করিল এবং দু—হাতে মুখ ঢাকিয়া ভেউ ভেউ করিয়া উঠিল।
বিরিঞ্চিবাবা বলিলেন—’কি হয়েছে, কি হয়েছে—আহা, ওকে আসতে দাও আমার কাছে।’
সত্য নিকটে গিয়া বলিল—’উদ্ধার কর বাবা, মানবজন্মে ঘেন্না ধ’রে গেছে। আমায় হরিণ ক’রে সেই ত্রেতা যুগে কণ্ব মুনির আশ্রমে ছেড়ে দাও বাবা! অর্থ চাই না, মান চাই না, স্বর্গও চাই না। শুধু চাটটি কচি ঘাস, শকুন্তলার নিজের হাতে ছেঁড়া। আর এক জোড়া শিং দিও প্রভু, দুষ্মন্তটাকে যাতে গুঁতিয়ে দিতে পারি।’
নিবারণ বেগতিক দেখিয়া বলিল— ‘ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে বাবা। বিস্তর শোক পেয়েছে কিনা।’
ঘড়িতে সাতটা বাজিল। দৈনিক পদ্ধতি অনুসারে এই সময় বিরিঞ্চিবাবা হঠাৎ তুরীয় অবস্থাপ্রাপ্ত হইলেন। তিনি চক্ষু বুঁজিয়া কাঠ হইয়া বসিয়া রহিলেন, কেবল তাঁর ঠোঁট দুটি ঈষৎ নড়িতে লাগিল। মামাবাবু, চেলামহারাজ এবং দুইজন ভক্ত বাবার শ্রীবপু চ্যাংদোলা করিয়া সাধনকক্ষে লইয়া গেলেন। সভা আজকের মত ভঙ্গ হইল। ভক্তগণ ক্রমশ বিদায় হইতে লাগিলেন।
নিতাইবাবু বলিলেন—’বিষের সঙ্গে খোঁজ নেই কুলোপানা চক্কর! এ রকম বাবাজী আমার পোষাবে না। ক্ষ্যামতা যদি থাকে তবে দু—চারটে নমুনা দেখা না বাপু। তা নয় সত্যযুগে কি করেছিলেন তারই ব্যাখ্যান। চল পরমার্থ, সাতটা কুড়ির ট্রেন এখনও পাওয়া যাবে। নিবারণ আর সতেটার খোঁজে দরকার নেই। তারা নিজের নিজের পথ দেখবে। দেখ পরমার্থ, কাল না হয় মিরচাই—বাবার কাছেই নিয়ে চল।’
সত্যব্রত বুঁচকীকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া বলিল—’দেখুন, একটু চা খাওয়াতে পারেন? নিবারণ— দাও আসবে এখনই। ওঃ, গলাটা বড্ড চিরে গেছে।’
বুঁচকী বলিল—’চিরবে না?—যা চেঁচাচ্ছিলেন! জল চড়িয়ে দিচ্ছি, বসুন একটু। আচ্ছা, আমার বাবার সামনে কি কাণ্ডটা ধরলেন বলুন তো? কি ভাববেন তিনি?’
সত্য মনে মনে বলিল, তোমার বাবা তো বেহুঁশ ছিলেন। প্রকাশ্যে বলিল— ‘একটু বাড়াবাড়ি ক’রে ফেলেছি নয়? ভারি অন্যায় হয়ে গেছে, আর কখখনো অমন হবে না। আপনার বাবার কাছে মাপ চেয়ে তাঁকে খুশি করে তবে বাড়ি ফিরব।’
বুঁচকী। বাবার আবার খুশি—অখুশি। বেঁচে আছেন এই পর্যন্ত, কে কি করছে বলছে তা জানতেও পারছেন না।
সত্য। থাকবে না, এমন দিন থাকবে না। আপনি দেখে নেবেন।—ওই যে, নিবারণদা আসছেন।
রাত ন—টা। হোম আরম্ভ হইয়াছে। ভক্তের দল পূর্বেই বিদায় হইয়াছে। হোমঘরে আছেন কেবল বিরিঞ্চিবাবা, গুরুপদবাবু, বুঁচকী, মামাবাবু, নিবারণ, সত্যব্রত এবং গোবর্ধনবাবু। ইনি একজন বিশিষ্ট ভক্ত, বাবার জন্য তেতলা আশ্রম নির্মাণ করিয়া দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। হোমঘরটি ছোট, দরজা জানালা প্রায় সমস্তই বন্ধ, প্রবেশের পথ মামাবাবু আগলাইয়া দাঁড়াইয়া আছেন। ছোট—মহারাজ অর্থাৎ কেবলানন্দ, বাবার নৈশ আহার চরু প্রস্তুত করিবার জন্য অন্যত্র ব্যস্ত আছেন। ঘরে একটি মাত্র ঘৃতপ্রদীপ মিটমিট করিতেছে। বিরিঞ্চিবাবা যোগাসনে ধ্যানমগ্ন, সম্মুখে হোমকুণ্ড। পিছনে গুরুপদবাবু ও তাঁর কন্যা উপবিষ্ট। তাঁহাদের এক পাশে নিবারণ ও সত্যব্রত, অপর পাশে গোবর্ধনবাবু বসিয়া আছেন।
অনেকক্ষণ ধ্যানস্থ থাকিয়া বিরিঞ্চিবাবা কোষা হইতে জল লইয়া চতুর্দিকে ছড়াইয়া দিলেন। ঘৃতপ্রদীপ নিবিয়া গেল। হোমাগ্নির শিখা নাই, কেবল কয়েক খণ্ড অঙ্গার আরক্ত হইয়া আছে। বিরিঞ্চিবাবা তখন মুখের ওপর হাত কাঁপাইয়া ভীষণ গালবাদ্য আরম্ভ করিলেন। সেই গম্ভীর বু—বু—বু—বু নিনাদে ক্ষুদ্র গৃহ কম্পিত হইতে লাগিল।
সত্যব্রত বুঁচকীর কানে কানে বলিল—’বুঁচু, ভয় করছে।’ বুঁচকী বলিল—’না।’
সহসা হোমকুণ্ড হইতে নীলাভ অগ্নিশিখা নির্গত হইল। সেই ক্ষীণ অস্পষ্ট আলোকে সকলে দেখিলেন— মহাদেবই তো বটে!—হোমকুণ্ডের পশ্চাতে ব্যাঘ্রচর্মধারী হাড়মালাবিভূষিত পিনাকডমরুপাণি ধবলকান্তি দস্তুরমত মহাদেব।
