ভবতোষ। দেখ জিতেন, হাজার বছর আগে হয়তো আমার পূর্বপুরুষরা পইতে ধারণ করতেন, কিন্তু পরে ব্রাহ্মণদের আজ্ঞায় তাঁরা ত্যাগ করেছিলেন। আমার ঠাকুরদার কাছে তাঁর ঠাকুরদার বর্ণনা শুনেছি—পরনে খাটো ধুতি, গায়ে মেরজাই, কাঁধে কোঁচানো চাদর, পায়ে নাগরা, মাথায় টিকি, কপালে ফোঁটা, আর মুখে ফারসী বুলি। আমার ঠাকুরদা অতি বুদ্ধিমান ছিলেন, মুরগি খেতে শিখে টিকি ফোঁটা আর ফারসী তিনটেই ত্যাগ করেন।
জিতেন। পাদরীদের পাল্লায় পড়েছিলেন বুঝি?
ভবতোষ। কারও পাল্লায় পড়বার লোক তিনি ছিলেন না।
বিধু বললে, ওহে জিতেন, ইনি পইতে আর টিকি নাইবা ধারণ করলেন, পুরুত ঠাকুর সাজলে এঁর মহত্ত্ব কিছুমাত্র বাড়বে না। আমি বলি কি, ইনি দাড়ি রাখুন, চুল বাড়তে দিন, গেরুয়া কাপড় পরুন, আর গোটা কতক মোটা মোটা রুদ্রাক্ষের মালা গলায় দিন। সাধু মহাত্মার এই হল লক্ষণ।
ভবতোষ মাথা নাড়লেন।
বিধু। আচ্ছা, দাড়ি, জটা, রুদ্রাক্ষ না হয় বাদ দিলেন। গোঁফটা কামিয়ে ফেলুন, গেরুয়া সিল্কের ধুতি পাঞ্জাবি পরুন, মাথায় গেরুয়া পাগড়ি বাঁধুন, কিংবা কানঢাকা টুপি পরুন। তত্ত্বদর্শী স্বামী মহারাজদের বেশ ধারণ করুন।
ভবতোষ। আমি সাধু মহাত্মা নই, তত্ত্বদর্শীও নই। আমার সাজ যা আছে তাই থাকবে।
জিতেন। এইবারে বুঝেছি। মুক্তপুরুষদের পইতে টিকি জটা গেরুয়া রুদ্রাক্ষ কিছুই দরকার হয় না। কিন্তু আপনাকে তো নাম ধরে ডাকা চলবে না। সবাই আপনাকে ঠাকুর বলে, আমরাও তাই বলব। দোহাই, এতে আপত্তি করবেন না। বলছিলুম কি—আপনি তো জীবন্মুক্ত পুরুষ, গৃহে বাস করলেও সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী, আপনার মুখের একটু কথা শোনবার জন্যে জজ ব্যরিস্টার ডাক্তার প্রফেসর মেয়ে পুরুষ সবাই লালায়িত। সবাই জানতে চায়—ইনি কি ব্রহ্মজ্ঞানী পণ্ডিত, না যোগসিদ্ধ মহাপুরুষ ? পরমহংস না শুধুই পরম ভক্ত? ভগবানের অংশাবতার, না ষোল আনা ভগবান? কি বলব ঠাকুর?
ভবতোষ। বলবে, ইনি একজন রিটায়ার্ড সবডেপুটি।
এই সময় ভবতোষের বাল্যবন্ধু নিখিল বাঁড়ুজ্যে এলেন। বললেন, কি হে ভবতোষ, কি রকম চলছে? বিস্তর ভক্ত জুটিয়েছ শুনছি, সুবিধে কিছু করতে পারলে?
ভবতোষ। নাঃ। যদি কোথাও একটা নিরিবিলি গুহা পাই তো পালিয়ে গিয়ে সেখানে ঢুকব।
নিখিল। পালাবে কেন? রামকৃষ্ণদেব তো ভক্তপরিবৃত হয়ে সুখে বাস করতেন।
ভবতোষ। তিনি পরমহংস ছিলেন, তাঁর মতন ধৈর্য কোথায় পাব। তবে তিনিও মাঝে মাঝে উত্যক্ত হয়ে শালা বলে ফেলতেন।
জিতেন। নির্জন আশ্রমের অভাব কি ঠাকুর? আপনি একবারটি হাঁ বলুন, আপনার ভক্তরা বরানগরে বা কাশীতে বা রাঁচিতে চমৎকার আশ্রম বানিয়ে দেবে।
নিখিল। রাজী হয়ে যাও হে, তিন জায়গাতেই আশ্রম করাও। দু—চারটে গেস্ট রুম রেখো। আমরাও মাঝে মাঝে গিয়ে থাকব। এমন সুবিধে ছেড়ো না ভবতোষ।
জিতেন। দেখুন নিখিলবাবু, আপনি ঠাকুরকে নাম ধরে ডাকবেন না, তুমিও বলবেন না, তাতে আমরা বড় ব্যথা পাই।
নিখিল। বেশ বেশ, আমিও এখন থেকে ঠাকুর আর আপনি বলব। কিন্তু যখন আর কেউ থাকবে না, তখন নাম ধরেই ডাকব। কি বলেন ঠাকুর?
ভবতোষ। হ্যাঁ হ্যাঁ।
প্রাতঃকালীন ভক্তসমাগম কি রকম হয়েছে দেখবার জন্য জিতেন আর বিধু নীচে নেমে গেল।
নিখিল বললেন, আচ্ছা ভবতোষ, তুমি তো বলতে যে কর্মযোগই শ্রেষ্ঠ যোগ, লোকসংগ্রহ অর্থাৎ লোকচরিত্রের উন্নতি সাধনই শ্রেষ্ঠ কর্ম। তবে এখন নির্জনে থাকতে চাচ্ছ কেন? শুধু নিজের মুক্তির জন্যে লুকিয়ে তপস্যা, আর নিজের পেট ভরাবার জন্য লুকিয়ে খাওয়া দুটোই তো স্বার্থপরতা।
ভবতোষ। আমি অক্ষম দুর্বল, বক্তৃতা দিতে পারি না, ধর্মপ্রচার করতে পারি না, কীর্তন গাওয়া আসে না, লোকশিক্ষার পদ্ধতিও জানি না। বুদ্ধ যিশু শংকর চৈতন্য রামমোহন রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ গান্ধী—এঁদের শক্তির কণামাত্র আমার নেই, তাই শুধু আত্মচিন্তা করি। কেউ যদি আমার কাছে কিছু জানতে চায় তো যথাবুদ্ধি বলি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সত্য কথা শুনতে কেউ চায় না, সবাই স্বার্থসিদ্ধির সোজা উপায় বা অলৌকিক শক্তি খোঁজে।
জিতেন ফিরে এসে বললে, ঠাকুর, আজ বেশী লোক আসে নি, সবাই ভোট দিতে গেছে কিনা। চার—পাঁচ জন লোক নীচে দর্শনের জন্যে অপেক্ষা করছে।
নিখিল। কি রকম লোক জিতেনবাবু?
জিতেন। সেই গীতায় যেমন চতুর্বিধা ভজন্তে মাং আছে—আর্ত, জিজ্ঞাসু, অর্থার্থী আর জ্ঞানী।
ভবতোষ। জ্ঞানীদের চলে যেতে বল, তাদের যখন জ্ঞান আছেই তবে আবার এখানে কেন। অর্থার্থীদেরও বলে দাও আমার অর্থ দেবার সামর্থ্য নেই। আর যারা এসেছে একে একে পাঠিয়ে দাও।
জিতেন বেরিয়ে গেলে নিখিল প্রশ্ন করলেন, একে একে পাঠাতে বললে কেন? ও তো বিলিতী কায়দায় ইন্টারভিউ। ভক্তের দল মহাপুরুষকে সর্বদা ঘিরে থাকবে এই তো চিরকেলে দস্তুর।
ভবতোষ। যারা দেখা করতে আসে তাদের সকলের মতিগতি তো সমান নয়, যে যেমন তাকে সেই রকম উত্তর দিতে হয়। বুদ্ধি—ভেদ করতে গীতায় নিষেধ আছে।
প্রথমে এলেন মাধব ধর। ইনি একজন জিজ্ঞাসু। ধর মশায় ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে করজোড়ে বললেন, ঠাকুর, আপনার কৃপায় আমার অভাব কিছু নেই, ব্যবসা ভালই চলছে, বাড়ির সবাই ভালই আছে। শুধু একটা সমস্যা সমাধানের জন্যে আপনার কাছে এসেছি।
