সত্য ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া ভক্তমণ্ডলীর ভিতরে বসিয়া পড়িল। নিবারণ ছোট—মহারাজের বাধা অগ্রাহ্য করিয়া একেবারে বিরিঞ্চিবাবার পা জড়াইয়া ধরিল। বাবা প্রসন্ন হাস্যে বলিলেন—’চেনা চেনা বোধ হচ্ছে?’
নিবারণ। অধমের নাম নিবারণচন্দ্র।
বিরিঞ্চি। নিবারণ? ও, এখন বুঝি তোমার এই নাম? কোথা যেন দেখেছি তোমায়,—নেপালে? উঁহু, মুরশিদাবাদে। তোমার মনে থাকবার কথা নয়। জগৎ—শেঠের কুঠিতে, তার মায়ের শ্রাদ্ধের দিন। অনেক লোক ছিল—রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রায় রায়ান জানকীপ্রসাদ, নবাবের সিপাহ—সলার খান—খানান মহব্বৎ জং, সুতোনুটির আমিরচন্দ—হিস্ট্রিতে যাকে বলে উমিচাঁদ। তুমি শেঠজীর খাজাঞ্চী ছিলে, তোমার নাম ছিল—রোস—মোতিরাম। উঃ, শেঠজী খুব খাইয়েছিল, কেবল সুতোনুটির বাবুদের পাতে মণ্ডা কম পড়ে, তারা গালাগাল দিয়ে চলে যায়।—তা মোতিরাম, উঁহু—নিবারণচন্দ্র, তুমি ধূর্জটি মন্ত্র জপ করতে শেখ, তাতে তোমার সুবিধে হবে। রোজ ভোরে উঠেই একশ— আটবার বলবে— ধূর্জটি— ধূর্জটি—ধূর্জটি, খুব তাড়াতাড়ি। আচ্ছা, এখন ব’স গিয়ে।
নিবারণ পুনরায় পায়ের ধুলা লইল এবং তাহা চাটিবার ভান করিয়া ভক্তদের মধ্যে গিয়া বসিল।
নিতাইবাবু চুপি চুপি পরমার্থকে বলিলেন—’ব্যাপার দেখলে? নিবারণটা আসবামাত্র বাবার নজরে প’ড়ে গেল, আর আমি ব্যাটা দেড় ঘণ্টা হাঁ করে ব’সে আছি। একেই বলে বরাত। এইবার একবার উঠে গিয়ে পা জড়িয়ে ধরব, যা থাকে কপালে।’
যাঁরা ভূমিসাৎ হইয়া পড়িয়া ছিলেন তাঁদের মধ্যে একটি স্থূলকায় বৃদ্ধ ছিলেন। তাঁর পরিধানে মিহি জরিপাড় ধুতি, গিলে—করা আদ্দির পাঞ্জাবি, তাঁর ভিতর দিয়া সরু সোনার হার দেখা যাইতেছে। ইনি বিখ্যাত মুৎসদ্দী গোবর্ধন মল্লিক, সম্প্রতি তৃতীয়পক্ষ ঘরে আনিয়াছেন। গোবর্ধনবাবু আস্তে আস্তে উঠিয়া করজোড়ে নিবেদন করিলেন—’বাবা, প্রবৃত্তিমার্গ আর নিবৃত্তিমার্গ এর কোনটা ভাল?’
বাবা ঈষৎ হাস্যসহকারে বলিলেন—’ঠিক ঐ কথা তুলসীদাস আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমরা আহার গ্রহণ করি। কেন করি? ক্ষুধা পায় বলে। কি আহার করি? অন্নব্যঞ্জন ফলমূল মৎস্য মাংসাদি। আহার করলে কি হয়? ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়। ক্ষুধা একটা প্রবৃত্তি, আহারে তার নিবৃত্তি। অতএব ভোগের মূল হচ্ছে প্রবৃত্তি, ভোগের ফল হচ্ছে নিবৃত্তি। তুলসী ছিল সন্ন্যাসী। আমি বললুম—’বাপু, ভোগ না হ’লে তোমার নিবৃত্তি হবে না। তার রামায়ণ লেখা শেষ হ’লে তাকে রাজা মানসিংহ ক’রে দিলুম। অনেক বিষয়—সম্পত্তি করেছিল, কিন্তু কিছুই রইল না। তার ব্যাটা জগৎসিংহ বাঙালীর মেয়ে বে ক’রে সমস্ত উড়িয়ে দিলে। বঙ্কিম তার বইয়ে সে—কথা আর লেখে নি।’
ব্যারিস্টার ও.কে. সেন বলিলেন—’ওআণ্ডারফুল!’
নিতাইবাবু আর থাকিতে পারিলেন না। ছুটিয়া গিয়া বাবার সম্মুখে গলবস্ত্র হইয়া বলিলেন,—’দয়া কর প্রভু!’
বাবা ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন—’কি চাই তোমার?’
নিতাইবাবু থতমত খাইয়া বলিলেন—’নাইণ্টিন ফোর্টিন।’
সত্যব্রতের একটা মহৎ রোগ— সে হাসি সামলাইতে পারে না। সে নিজে বেশ গম্ভীর হইয়া পরিহাস করিতে পারে, কিন্তু অপরের মুখে অদ্ভুত কথা শুনিলে গাম্ভীর্যরক্ষা কঠিন হয়। হাস্য দমনের জন্য সত্য একটি মুষ্টিযোগ ব্যবহার করিয়া থাকে। গুরুজনদের সমক্ষে হাসির কারণ উপস্থিত হইলে সে কোনও ভয়াবহ অবস্থার কল্পনা করে। তবে সব সময় তাতে উপকার হয় না।
বিরিঞ্চিবাবা বলিলেন—’নাইণ্টিন ফোর্টিন? সে কি?’
নিবারণ চুপি চুপি বলিল—’ওআন—নাইন—ওআন—ফোর, ক্যালকাটা। নো রিপ্লাই? ট্রাই এগেন মিস।’
সত্যব্রত ধ্যান করিতে লাগিল—ছুতার মিস্ত্রী তার পিঠের উপর রাঁদা চালাইতেছে। চোকলা চোকলা চামড়া উঠিয়া যাইতেছে। ওঃ সে কি অসহ্য যন্ত্রণা!
নিতাইবাবু বলিলেন—’সাতটি দিনের জন্য আমায় লড়ায়ের আগে নিয়ে যান বাবা, সস্তায় লোহা কিনব—দোহাই বাবা!’
বিরিঞ্চি। তোমার কি করা হয়?
নিতাই। আজ্ঞে ভলচার ব্রাদার্সের আপিসে লেজার—কিপার, কুল্লে দেড়—শ টাকা মাইনে, সংসার চলে না।
বিরিঞ্চি। ষড়ৈশ্বর্য সস্তায় হয় না বাপু, কঠোর সাধনা চাই। মূলাধারচক্রে ঠেলা দিয়ে কুলকুণ্ডলিনীকে আজ্ঞাচক্রে আনতে হবে, তারপর তাকে সহস্রার পদ্মে তুলতে হবে। সহস্রারই হচ্ছেন সূর্য। এই সূর্যকে পিছু হটাতে হবে। সূর্যবিজ্ঞান আরম্ভ না হ’লে কালস্তম্ভ করা যায় না। তাতে বিস্তর খরচ—তোমার কম্ম নয়। তুমি আপাতত কিছুদিন মার্তণ্ডমন্ত্র জপ কর। ঠিক দুপপুর বেলা সূর্যের দিকে চেয়ে একশ—আটবার বলবে—মার্তণ্ড—মার্তণ্ড—মার্তণ্ড, —খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু খবরদার, চোখের পাতা না নড়ে, জিব জড়িয়ে না যায়,— তা হ’লেই মরবে।
নিতাইবাবু বিরস বদনে ফিরিয়া আসিলেন।
বিরিঞ্চিবাবা বলিলেন—’ধন—দৌলত সকলেই চায়, কিন্তু উপযুক্ত পাত্রে পড়া চাই। এই নিয়েই তো যিশুর সঙ্গে আমার ঝগড়া। যিশু বলত, ধনীর কখনও স্বর্গরাজ্য লাভ হবে না। আমি বলতুম—তা কেন? অর্থের সদব্যবহার করলেই হবে। আহা বেচারা বেঘোরে প্রাণটা খোয়ালে।’
মিস্টার সেন সবিস্ময়ে বলিলেন—’এক্সকিউজ মি প্রভু, অপনি কি জিসসস ক্রাইস্টকে জানতেন?’
বিরিঞ্চি। হাঃ হাঃ যিশু তো সেদিনকার ছেলে।
