মৌলবী জানাইলেন যে তাঁকেও কম অপমান সহ্য করিতে হয় নাই। মামাবাবু (গণেশ) যে তাঁর উপর লম্বাই চওড়াই করিবে তা তিনি বরদাস্ত করিবেন না। তিনি খানদানী মনিষ্যি, তাঁর ধমনীতে মোগলাই রক্ত প্রবাহিত হইতেছে। যদিও লোকে তাঁকে বছিরুদ্দি বলে, কিন্তু তাঁর আদত নাম ম্রেদম খাঁ, তাঁর পিতার নাম জাঁহাবাজ খাঁ, পিতামহের নাম আবদুল জব্বর, তাঁদের আদি নিবাস ফরিদপুর নয়— আরব দেশে, যাকে বলে তুর্খ। সেখানে সকলেই লুঙ্গি পরে এবং উর্দু বলে, কেবল পেটের দায়ে তাঁকে বাংলা শিখিতে হইয়াছে। সেই আরব দেশের মধ্যিখেনে ইস্তাম্বুল, তার বাঁয়ে শহর বোগদাদ। এই কলকাতা শহরডা তার কাছে একেবারেই তুশ্চু। বোগদাদের দখিন—বাগে মক্কা—শরিফ, সেখানকার পবিত্র কুয়ার জল আব—এ—জমজম তাঁর কাছে এক শিশি আছে। মনিব যদি হুকুম দেন তবে সেই জল ছিটাইয়া হালার—পো—হালা ইবলিসের বাচ্চা দুই বাবাজী মায় মামাবাবুকে তিনি হা—ই সাত দরিয়ার পারে জাহান্নামের চৌমাথায় পৌঁছাইয়া দিতে পারেন।
নিবারণ বলিল—’দেখুন মৌলবী সাহেব, আমরা বাবাজী দুটোকে তাড়াবই তাড়াব। যদি সুবিধে হয় তো আজই। কিন্তু একলা পেরে উঠব না। আপনি আর দরোয়ানজী সঙ্গে থাকা চাই।’
ফেকু। মার—পিট হোবে?
নিবারণ। আরে না না। তোমাদের কোনোও ভয় নেই। কেবল একটু চিল্লাচিল্লি করতে হবে। পারবে তো?
জরুর। আলবৎ। জান কবুল। কিন্তু মনিব যদি গোসা হন?
নিবারণ বুঝাইল, মনিবের চটিবার কোনও কারণ থাকিবে না। একটু পরে সে আসিয়া যথাকর্তব্য বাতলাইয়া দিবে।
নিবারণ ও সত্যব্রত বিরিঞ্চিবাবার দরবার অভিমুখে চলিল। পথে গণেশমামার সঙ্গে দেখা, তিনি ব্যস্ত হইয়া হোমের আয়োজন করিতে যাইতেছেন। নিবারণ ও সত্যব্রতকে দেখিয়া বলিলেন—’এই যে তোমরাও এসেছ দেখছি, বেশ বেশ। হেঁ—হেঁ, তারপর—বাড়ির সব হেঁ—হে? নিবারণ, তোমার বাবা বেশ হেঁ—হেঁ? তোমার মা এখন একটু হেঁ—হেঁ? তোমার ছোট বোনটি হেঁ—হেঁ? সত্য, তোমার পিসেমশায় পিসীমা সককলে—’
নিবারণের স্বজনবর্গ সকলেই হেঁ—হেঁ। সত্যব্রতেরও তদ্রূপ। সমস্তই গণেশমামার আশীর্বাদের ফল। মামাবাবুর ভাবনায় ঘুম হইতেছিল না, এখন কথঞ্চিৎ নিশ্চিন্ত হইলেন।
সত্য বলিল—’মামা, আপনার ছোট জামাইটির চাকরি হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তবে ছুটির পরেই আমাদের আপিসে একবার পাঠাবেন, একটা ভেকান্সি আছে।’
গণেশ। বেঁচে থাক বাবা, বেঁচে থাক। তোমরা হলে আপনার লোক, তোমরা চেষ্টা না করলে কি কিছু হয়? আপিস খুললেই সে তোমার সঙ্গে দেখা করবে।
নিবারণ। মামাবাবু, একটি নিবেদন আছে। দেবদর্শন করিয়ে দিতে হবে।
গণেশ। তা যাও না বাবার কাছে। সকলেই তো গেছে।
নিবারণ। ও দেবতা তো দেখবই। আসল দেবতা দেখতে চাই,— হোমঘরে।
গণেশমামা সভয়ে জিব কাটিয়া বলিলেন—’বাপ রে, সে কি হয়! কত সাধ্য—সাধনা ক’রে তবে অধিকার জন্মায়। আর আমাদের সত্য তো—এই—এই—যাকে বলে—’
নিবারণ। বেম্মজ্ঞানী। কিন্তু ওর ব্রহ্মজ্ঞান এখনও হয় নি। সত্য হচ্ছে দৈত্য কুলে প্রহ্লাদ, হিদুঁয়ানিটা ঠিক বজায় রেখেছে। ও গীতা আওড়ায়, থিয়েটার দেখে সত্যনারায়ণের শিন্নি, মদনমোহনের খিচুড়ি—ভোগ, কালীঘাটের কালিয়া সমস্ত খায়। আর বলতে নেই, আপনি হলেন নেহাত গুরুজন, নইলে ওর দু—চারটে বোলচাল শুনলে বুঝতেন যে ও বড় বড় হিদুঁর কান কাটতে পারে।
গণেশ। যাই করুক, জাত গেলে আর ফিরে আসে না। তুমিও তো শুনতে পাই অখাদ্য খাও।
নিবারণ। সে তো সব্বাই খায়। গুরুপদবাবুও ঢের খেয়েছেন। তা হ’লে দেবদর্শন হবে না? নিতান্তই নিরাশ করবেন? আচ্ছা, তবে চললুম।
সত্য। প্রণাম মামাবাবু। হ্যাঁ একটা কথা—আমি বলি কি, আপনার জামাইটি এখন মাস চার—পাঁচ টাইপরাইটিং শিখুক। একবারে আনাড়ী, তাকে ঢুকিয়ে দিয়ে আমিই সায়েবের কাছে অপদস্থ হব। নেক্সট ভেকান্সিতে বরং চেষ্টা করা যাবে।
গণেশ। আরে না না না। চাকরি একবার ফসকে গেলে কি আর সহজে মেলে? না সত্য, লক্ষ্মী বাবা আমার, চাকরিটি ক’রে দিতেই হবে।—হ্যাঁ— কি বলছিলে? তুমি এখন গীতা—টিতা প’ড়ে থাক? খুব ভাল। তা—হোমঘরে গেলে তেমন দোষ হবে না। একটু গঙ্গাজল মাথায় দিয়ে যেয়ো—দুজনেই। আচ্ছা—তা হলে জামাইটির কথা ভুলো না।
গণেশ—মামা তফাতে গেলে নিবারণ বলিল—’এখন পর্যন্ত তো বেশ আশাজনক বোধ হচ্ছে, শেষ রক্ষা হলেই হয়। অমূল্য, হাবলা এরা সব এসেছে?’
সত্য। হ্যাঁ, তারা দরবারে রয়েছে। ঠিক সময় হাজির হবে। আচ্ছা নিবারণদা, মামাবাবুর কিছু বখরা আছে নাকি?
নিবারণ। ভগবান জানেন। গুরুপদবাবু যত দিন সংসারে নির্লিপ্ত থাকেন, মামাবাবুর তত দিনই সুবিধে।
বিরিঞ্চিবাবা সভা অলংকৃত করিয়া বসিয়াছেন। তাঁর চেহারাটি বেশ লম্বা—চওড়া, গৌরবর্ণ, মুণ্ডিত মুখ। সুপুষ্ট গালের আড়াল হইতে দুইটি উজ্জ্বল চোখ উঁকি মারিতেছে। দু—পয়সা দামের শিঙাড়ার মত সুবৃহৎ নাক, মৃদু হাস্যমণ্ডিত প্রশস্ত ঠোঁট, তার নীচে খাঁজে খাঁজে চিবুকের স্তর নামিয়াছে। স্বামীগিরির উপযুক্ত মূর্তি। অঙ্গে গৈরিকরঞ্জিত আলখাল্লা, মস্তকে ঐরূপ কানঢাকা টুপি। বয়স ঠিক পাঁচ হাজার বলিয়া বোধ হয় না, যেন পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন। বাবার বেদীর নীচে ডান—দিকে ছোট—মহারাজ কেবলানন্দ বিরাজ করিতেছেন। ইঁহার বয়স কয় শতাব্দী তাহা ভক্তগণ এখনও নির্ণয় করেন নাই, তবে দেখিতে বেশ জোয়ান বলিয়াই মনে হয়। ইনিও গুরুর অনুরূপ বেশধারী, তবে কাপড়টা সস্তাদরের। বেদীর নীচে বাঁ—দিকে শীর্ণকায় গুরুপদবাবু বেদীতে মাথা ঠেকাইয়া অর্ধশায়িত অবস্থায় আছেন, জাগ্রত কি নিদ্রিত বুঝিতে পারা যায় না। পাশের ঘরে মহিলাগণের প্রথম শ্রেণীতে একটি সতর—আঠার বছরের মেয়ে লাল শাড়ির উপর এলোচুল মেলিয়ে বসিয়া আছে এবং মাঝে মাঝে গুরুপদবাবুর দিকে করুণ নয়নে চাহিতেছে। সে বুঁচকী, গুরুপদবাবুর কনিষ্ঠা কন্যা। ভক্তবৃন্দের অনেকে সটান লম্বা অবস্থায় উপুড় হইয়া যুক্তকর সম্মুখে প্রসারিত করিয়া পড়িয়া আছেন। অবশিষ্ট সকলে হাতজোড় করিয়া পা ঢাকিয়া বাবার বচনামৃত পানের জন্য উদগ্রীব হইয়া বসিয়া আছেন।
