সত্য । কি রকম দেখলেন?
নিরুপমা। আমি কি ছাই ভাল ক’রে দেখেছি? অন্ধকার ঘরে হোমকুণ্ডুর পিছনে আবছায়ার মত প্রকাণ্ড মূর্তি, চারটে মুণ্ডু, লম্বা লম্বা দাড়ি। আমার তো দেখেই দাঁতে দাঁত লেগে ফিট হ’ল। গণেশমামা ঘর থেকে টেনে বার ক’রে দিলেন। বুঁচকীর বরং সাহস আছে, প্রায়ই দেখছে কিনা। কাল নাকি মহাদেব বার হবেন।
নিবারণ । কাল একবার আমরা বিরিঞ্চিবাবার চরণ দর্শন ক’রে আসি, যদি তাঁর দয়া হয় তবে কপালে হয়তো মহাদেব দর্শনও হবে।
নিরুপমা। গণেশমামাকে বশ করুন, তিনি হুকুম না দিলে হোমঘরে ঢুকতে পাবেন না।
নিবারণ। সে আমি ক’রে নেব। কিন্তু সতে, তোকে নিয়ে যেতে সাহস হয় না, তোর মুখ বড় আলগা, তুই হেসে ফেলবি।
সত্য তার সমস্ত দেহ নাড়িয়া বলিল—’কখখনো নয়, তুমি দেখে নিও, হাসে কোন শা—ইল!’
নিবারণ। ও কি, জিব বার করলি যে?
সত্য। বেগ ইওর পার্ডন বউদি, খুব সামলে নিয়েছি। পিসীমার কাছে ব’লে ফেললে রক্ষে থাকত না।
নিবারণ। তবে আজ আমরা চলি। হ্যাঁ, ভাল কথা। ননি, এমন কিছু বলতে পার যাতে খুব ধোঁয়া হয়?
ননি। কি রকম ধোঁয়া? যদি লাল ধোঁয়া চাও তবে নাইট্রিক অ্যাসিড অ্যাণ্ড তামা, যদি বেগনী চাও তবে আয়োডিন ভেপার, যদি সবুজ চাও—
নিবারণ। আরে না না। প্লেন ধোঁয়া চাই।
ননি। তা হ’লে ট্রাই—নাইট্রো—ডাই—মিথাইল—
নিবারণ কান চাপিয়া বলিল—’আবার আরম্ভ করলে রে! বউদি, এটাকে নিয়ে আপনার চলে কি ক’রে?’
নিরুপমা হাসিয়া বলিল—’মামার বাড়িতে দেখেছি গোয়ালঘরে ভিজে খড় জ্বালে, খুব ধোঁয়া হয়।’
নিবারণ, ইউরেকা! বউদি, আপনিই নোবেল প্রাইজ পাবেন, ননেটার কিছু হবে না।
নিরুপমা। ধোঁয়া দিয়ে করবেন কি?
নিবারণ। ছুঁচোর উপদ্রব হয়েছে, দেখি তাড়াতে পারি কি না।
গুরুপদবাবুর দমদমার বাগানবাড়ি পূর্বে বেশ সুসজ্জিত ছিল, কিন্তু তাঁর পত্নী গত হওয়া অবধি হতশ্রী হইয়াছে। সম্প্রতি বিরিঞ্চিবাবার অধিষ্ঠানহেতু বাড়িটি মেরামত করানো হইয়াছে এবং জঙ্গলও কিছু কিছু সাফ হইয়াছে, কিন্তু পূর্বের গৌরব ফিরিয়া আসে নাই। গুরুপদবাবু সংসারের কোনও খবর রাখেন না, তাঁর শ্যালক গণেশই এখন সপরিবারে আধিপত্য করিতেছেন।
বৈকাল পাঁচটার সময় নিবারণ, সত্যব্রত, পরমার্থ এবং নিতাইবাবু আসিয়া পৌঁছিলেন। বাড়ির নীচে একটি বড় ঘরে শতরঞ্জ বিছাইয়া ভক্তবৃন্দের বসিবার ব্যবস্থা করা হইয়াছে। তার একপাশে একটি তক্তাপোশে গদি এবং বাঘের ছাপ—মারা রাগের উপর বিরিঞ্চিবাবার আসন। পাশের ঘরে ভক্ত মহিলাগণের স্থান। বাবাজী এখনও তার সাধনকক্ষ হইতে নামেন নাই। ভক্তের দল উদগ্রীব হইয়া বসিয়া আছে এবং মৃদুস্বরে বাবার মহিমা গুঞ্জন করিতেছে। একটি সাহেবী পোশাক পরা প্রৌঢ় ব্যক্তি অশেষ কষ্ট স্বীকার করিয়া পা মুড়িয়া বসিয়া আছেন এবং অধীর হইয়া মাঝে মাঝে তাঁর কামানো গোঁফে পাক দিতেছেন। ইনি মিস্টার ও.কে. সেন, বার অ্যাট—ল। সম্প্রতি কয়লার খনিতে অনেক টাকা লোকসান দিয়া ধর্মকর্মে মন দিয়াছেন।
পরমার্থ ও নিতাইবাবুকে ঘরে বসাইয়া নিবারণ ও সত্যব্রত বাহিরে আসিল এবং বাগানের চারিদিক প্রদক্ষিণ করিয়া ফটকের কাছে উপস্থিত হইল। ফটকের পাশেই এক সারি টালি—ছাওয়া ঘর, তাতে আস্তাবল এবং কোচমান, দরোয়ান, মালী ইত্যাদির থাকিবার স্থান।
আস্তাবলের সম্মুখে মৌলবী বছিরুদ্দি একটি ভাঙা বেঞ্চে বসিয়া কোচম্যান ঝোঁটি মিয়া এবং দরোয়ান ফেকু পাঁড়ের সঙ্গে গল্প করিতেছেন। মৌলবী সাহেবের নিবাস ফরিদপুর, ইনি গুরুপদবাবুর অন্যতম মুহুরী। গুরুপদবাবু ওকালতি ত্যাগ করায় বছিরুদ্দির উপার্জন কমিয়া গিয়াছে, কিন্তু এখনও তিনি নিয়মিত মাসহারা পাইয়া থাকেন, সেজন্য মনিবকে সেলাম করিতে আসেন।
মৌলবী সাহেব ফরিদপুরী উর্দুতে দুনিয়ার বর্তমান দুরবস্থা বিবৃত করিতেছিলেন, কোচমান ও দরোয়ান মাথা নাড়িয়া সায় দিতেছিল। অদূরে সহিস ঘোড়ার অঙ্গ ডলিতেছে এবং মাঝে মাঝে চঞ্চল ঘোড়ার পেটে সশব্দে থাবড়া মারিয়া বলিতেছে —’আরে ঠহর যা উল্লু।’ সামনের মাঠে একটি স্থূলকায় বিড়াল মুখভঙ্গী করিয়া ঘাস খাইতেছে—প্রত্যহ বিরিঞ্চিবাবার ভুক্তাবশিষ্ট মাছের মুড়া খাইয়া তার গরহজম হইয়াছে।
সত্যব্রত বলিল—’আদাব মৌলবী সাহেব। মেজাজ তো দিব্যি শরিফ? পরনাম পাঁড়েজী। কোচমানজী আচ্ছা হ্যায় তো? এঁকে চেন না বুঝি? ইনি নিবারণ বাবু, জামাইবাবুর দোস্ত। পুজোর জন্যে কিছু ভেট এনেছেন—কিছু মনে করবেন না মৌলবী সাহেব—আপনার দশটাকা, পাঁড়েজী আর কোচমানজীর পাঁচ—পাঁচ, সহিস মালী এদের আরও পাঁচ।
সৌজন্যে অভিভূত হইয়া বছিরুদ্দি, ফেকু এবং ঝোটি দন্তবিকাশ করিয়া বার বার সেলাম করিল এবং খোদা ও কালীমায়ীর নিকট বাবুজীদের তরক্কি প্রার্থনা করিল।
মৌলবী বলিলেন—’আর বাবুমশায়, সে সব দিন খ্যান কমনে চলে গেছে। মা—ঠাকরোন বেহস্ত পাওয়া ইস্তক মোদের বাবুসায়েবের জানডা কলেজায় নেই। অত ক’রে বললাম, হুজুর, অমন পসারডা নষ্ট করবেন না। তা কে শোনে? —খোদার মর্জি।’
নিবারণ বলিল—’ও বাবাজীটাই যত নষ্টের গোড়া।’
ফেকু পাঁড়ে ভরসা পাইয়া মত প্রকাশ করিল—বিরিঞ্চিবাবা বাবাজী থোড়াই আছেন। তাঁর জনৌ ভি নাই, জটা ভি নাই। তিনি মছরি ভি খান, বকড়ির গোস্ত ভি খান। দোনো সাঁঝ চা—বিস্কুট না হইলে তাঁর চলে না। এ সব বংগালী বাবাজী বিলকুল জুয়াচোর। আর ছোট—মহারাজ যিনি আছেন তিনি তো একটি বিচ্ছু, ফেকু পাঁড়েকে পর্যন্ত দংশন করিতে তাঁহার সাহস হয়। তিনি জানেন না যে উক্ত ফেকু পাঁড়ে মিউটিনিমে তলোয়ার খেলায়া থা (যদিও ফেকু তখনও জন্মেন নাই)। একবার যদি মনিব হুকুম দেন, তবে লাঠির চোটে বাবাজীদের হড্ডি চুর করিয়া দেওয়া যাইতে পারে।
