নিতাইবাবু পরমার্থের দুই হাত ধরিয়া গদগদস্বরে বলিলেন—’পরমার্থ ভাই রে, আমায় এক্ষুনি নিয়ে চল বিরিঞ্চিবাবার কাছে। বাবার পায়ে ধ’রে হত্যা দেব। খরচ যা লাগে সব দেব, ঘটি—বাটি বিক্রি ক’রব, গিন্নীর হাতে পায়ে ধ’রে সেই দশ ভরির গোট—ছড়াটা বন্ধক দেব। বাবার দয়ায় যদি হপ্তখানেক নাইন্টিন ফোর্টিনে ঘুরে আসতে পারি, তবে তোমায় ভুলব না পরমার্থ। টেন পারসেন্ট—বুঝলে? হা ভগবান, হায় রে লোহা!’
নিবারণ। গুরুপদবাবু কিছু গুছিয়ে নিতে পারলেন?
পরমার্থ। তাঁর ইহকালের কোনও চিন্তাই নেই। শুনেছি বিষয়—সম্পত্তি সমস্তই গুরুকে দেবেন।
নিবারণ। এতদূর গড়িয়েছে? হ্যাঁরে সত্য, তোর ননিদা, তোর বউদি, এঁরা কিছু বলছেন না?
সত্য। ননিদাকে তো জানই, ন্যালা—খ্যাপা লোক, নিজের এক্সপেরিমেণ্ট নিয়েই আছেন। আর বউদি নিতান্ত ভালমানুষ। ওঁদের দ্বারা কিছু হবে না। কিছু করতে হয় তো তুমি আর আমি। কিন্তু দেরি নয়।
নিবারণ। তবে এক্ষুনি ননির কাছে চল। ব্যাপারটা ভাল ক’রে জেনে নিয়ে তারপর দমদমায় যাওয়া যাবে।
নিতাইবাবু কাগজ পেনসিল লইয়া লোহার হিসাব কষিতেছিলেন। দমদমা যাওয়ার কথা শুনিয়া বলিলেন—’তোমরাও বাবার কাছে যাবে নাকি? সেটা কি ভাল হবে? এত লোক গিয়ে আবদার করলে বাবা ভড়কে যেতে পারেন। সত্যটা একে বেম্ম তায় বিশ্ববকাট, ওর গিয়ে লাভ নেই। কেন বাপু, তোদের অমন খাসা ব্রাহ্মসমাজ রয়েছে, সেখানে গিয়ে হত্যে দে না, আমাদের ঠাকুর—দেবতার ওপর নজর দিস কেন? আমি বলি কি, আগে আমি আর পরমার্থ যাই। তারপর আর একদিন না হয় নিবারণ যেয়ো।’
নিবারণ। না না, আপনার কোনও ভয় নেই, আমরা মোটেই আবদার করব না শুধু একটু শাস্ত্রালাপ করব। সুবিধে হয় তো কাল বিকেলেই সব একসঙ্গে যাওয়া যাবে।
প্রফেসার ননি কোনও কালে প্রফেসারি করে নাই, কিন্তু অনেকগুলি পাস করিয়াছে। সে বাড়িতে নানা প্রকার বৈজ্ঞানিক গবেষণা করিয়া থাকে, সেজন্য বন্ধুবর্গ তাকে প্রফেসার আখ্যা দিয়াছে। রোজগারের চিন্তা নাই, কারণ পৈতৃক সম্পত্তি কিছু আছে। ননি গুরুপদ বাবুর জামাতা, সত্যব্রতের দূরসম্পর্কীয় ভ্রাতা এবং নিবারণের ক্লাসফ্রেণ্ড।
নিবারণ ও সত্যব্রত যখন ননির বাড়িতে পৌঁছিল তখন রাত্রি আটটা। বাহিরের ঘরে কেহ নাই, চাকর বলিল বাবু এবং বহুমা ভিতরের উঠানে আছেন। নিবারণ ও সত্য অন্দরে গিয়া দেখিল উঠানের এক পাশে একটি উনানের উপর প্রকাণ্ড ডেকচিতে সবুজ রঙের কোনও পদার্থ সিদ্ধ হইতেছে, ননির স্ত্রী নিরুপমা তাহা কাঠি দিয়া ঘাঁটিতেছে। পাশের বারান্দায় একটা হারমোনিয়ম আছে, তাহা হইতে একটা রবারের নল আসিয়া ডেকচির ভিতরে প্রবেশ করিয়াছে। প্রফেসার ননি মালকোঁচা মারিয়া কোমরে হাত দিয়া দাঁড়াইয়া আছে।
নিবারণ বলিল—’একি বউদি, এত শাগের ঘণ্ট কার জন্যে রাঁধছেন?’
নিরুপমা বলিল—’শাগ নয়, ঘাস সেদ্ধ হচ্ছে। ওঁর কত রকম খেয়াল হয় জানেন তো।’
নিবারণ। সেদ্ধ হচ্ছে? কেন, ননির বুঝি কাঁচা ঘাস আর হজম হয় না?
ননি বলিল—’নিবারণ, ইয়ারকি নয়। পৃথিবীতে আর অন্নাভাব থাকবে না।’
নিবারণ। সকলেই তো প্রফেসার ননি বা রোমন্থক জীব নয় যে ঘাস খেয়ে বাঁচবে।
ননি। আরে ও কি আর ঘাস থাকবে? প্রোটিন সিন্থেসিস হচ্ছে ঘাস হাইড্রোলাইজ হয়ে কার্বোহাইড্রেট হবে। তাতে দুটো অ্যামিনো—গ্রুপ জুড়ে দিলেই ব্যস। হেক্সা—হাইড্রক্সি—ডাই—অ্যামিনো—
নিবারণ। থাক, থাক। হারমোনিয়মটা কি জন্যে?
ননি। বুঝলে না? অক্সিডাইজ করবার জন্যে। নিরু, হারমোনিয়মটা বাজাও তো।
নিরুপমা হারমোনিয়মের পেডাল চালাইল। সুর বাহির হইল না, রবারের নল দিয়া হাওয়া আসিয়া ডেকচির ভিতর বগবগ করিতে লাগিল।
নিবারণ। শুধুই ভুড়ভুড়ি! আমি ভাবলুম বুঝি সংগীতরস রবারের নল ব’য়ে ঘাসের সঙ্গে মিশে সবুজ—অমৃতের চ্যাঙড় সৃষ্টি করবে। যাক—বউদি বাবার খবর কি বলুন তো।
নিরুপমা ম্লানমুখে বলিল—’শোনেন নি কিছু? মা যাওয়ার পর থেকেই কেমন এক রকম হয়ে গেছেন। গণেশমামা কোথা থেকে এক গুরু জুটিয়ে দিলেন, তাঁকে নিয়েই একবারে তন্ময়। বাহ্যজ্ঞান নেই বললেই হয়, কেবল গুরু গুরু গুরু। অনেক কান্নাকাটি করেছি কোনও ফল হয়নি। শুনছি টাকাকড়ি সবই গুরুকে দেবেন। বুঁচকীটার জন্যেই ভাবনা। তার কাছেই গিয়ে থাকতুম, কিন্তু শাশুড়ীর অসুখ, এ বাড়ি ছেড়ে যেতে পারছি না।’
সত্য বলিল—’আচ্ছা ননিদা, তুমি তো বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলতে পার?’
ননি। তা কখনও পারি? শ্বশুরমশায় ভাববেন ব্যাটা সম্পত্তির লোভে আমার ধর্মকর্মের ব্যাঘাত করতে এসেছে।
সত্য। তবে হুকুম দাও, প্রহারেণ ধনঞ্জয় ক’রে দিই।
নিরুপমা। না না জুলুম যদি কর তবে সেটা বাবার ওপরেই পড়বে। বাবাকে কষ্ট না দিয়ে যদি কিছু করতে পার তো দেখ।
সত্য। বড় শক্ত কথা। আচ্ছা বউদি, বিরিঞ্চিবাবার ব্যাপার কি রকম বলুন তো!
নিরুপমা। ব্যাপার প্রায় মাসখানেক থেকে চলছে। দমদমার বাগানে আছেন, সঙ্গে আছে তাঁর চেলা ছোট—মহারাজ কেবলানন্দ। গণেশমামা খিদমত করছেন। বাবা দিনরাত সেখানেই পড়ে আছেন। রোজ দু—তিনশ ভক্ত গিয়ে ধর্ণা দিচ্ছে, বিরিঞ্চিবাবার অদ্ভুত কথাবার্তা শোনবার জন্যে হাঁ করে আছে। প্রতি রবিবার রাত্রে হোম হচ্ছে তা থেকে এক—এক দিন এক—একটি দেবতার আবির্ভাব হচ্ছে। কোনও দিন রামচন্দ্র, কোনও দিন ব্রহ্মা, কোনও দিন যিশু, কোনও দিন শ্রীচৈতন্য। যাকে—তাকে হোমঘরে ঢুকতে দেওয়া হয় না, যারা খুব বেশী ভক্ত তারাই যেতে পারে। ব্রহ্মা বেরনোর দিন আমি ছিলুম।
