এই সময় একটি হ্যাটকোটধারী বাইশ—তেইশ বছরের ছেলে ঘরে আসিয়া পাখার রেগুলেটার শেষ পর্যন্ত ঠেলিয়া দিয়া হ্যাটটি আছড়াইয়া ফেলিয়া ফরাশের উপর থপ করিয়া বসিয়া পড়িল। এর নাম সত্যব্রত, সম্প্রতি লেখাপড়ায় ইস্তফা দিয়া কাজকর্মের চেষ্টা দেখিতেছে। সত্যব্রত হাঁফাইতে হাঁফাইতে বলিল—’ওঃ, কি মুশকিলেই পড়া গেছে!’
সত্য প্রায়ই মুশকিলে পড়িয়া থাকে, সেজন্য তার কথায় কেহ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করিল না। অগত্যা সে আপন মনে বলিতে লাগিল—’সমস্ত দিন আপিসের হাড়ভাঙা খাটুনি, বিকেলে যে একটু ফুর্তি করব তারও জো নেই। ভাবলুম আজ ম্যাটিনিতে সীতা দেখে আসি। অমনি পিসীমা ব’লে বসলেন—সতে, তুই ব’কে যাচ্ছিস, আমার সঙ্গে চল, সাণ্ডেলমশায়ের বক্তৃতা শুনবি। কি করি, যেতে হ’ল। কিন্তু সব মিথ্যে। সাণ্ডেলমশায় বলচেন ধর্ম জীবের মধুরতা, আর আমি ভাবছি আরসোলা।’
নিতাই। আরসোলা?
সত্য। তিন টন আরসোলা। ফরওয়ার্ড কনট্রাক্ট আছে, নভেম্বর—ডিসেম্বর শিপমেন্ট, চল্লিশ পাউন্ড পনর শিলিং টন, সি—আই—এফ হংকং। চায়নায় লড়াই বাধবে কিনা, তাই আগে থাকতে রসদ সংগ্রহ কচ্ছে। বড়সাহেবের হুকুম—এক মাসের মধ্যে সমস্ত মাল পিপে—বন্দী হওয়া চাই। কোত্থেকে পাই বলুন তো? ওঃ, কি বিপদ!
নিতাই। হ্যাঁরে সতে, তুই না বেম্মজ্ঞানী, তোদের না মিথ্যে কথা বলতে নেই?
সত্য। কেন বলতে নেই। পিসীমার কাছে না বললেই হ’ল।
নিবারণ। সতে, তোর সন্ধানে ভাল বাবাজী, কি স্বামিজী আছে?
সত্য। ক—টা চাই?
নিতাই। যা যাঃ ইয়ারকি করিস নি। তোরা মন্ত্রতন্ত্রই মানিস না তা আবার বাবাজী।
সত্য। কেন মানব না। পিসীমার দাঁত কনকন করছিল, খেতে পারেন না, ঘুমুতে পারেন না, কথা কইতে পারেন না, কেবল পিসেমশায়কে ধমক দেন। বাড়িসুদ্ধ লোক ভয়ে অস্থির। পিপারমিন্ট, আস্পিরিন, মাদুলি, জলপড়া, দাঁতের পোকা বার কো—ও—রি, কিছুতে কিছু হয় না। তখন পিসেমশায় এইসা জোর প্রার্থনা আরম্ভ করলেন যে, তিন দিনের দিন দাঁত পড়ে গেল।
পরমার্থ চটিয়া উঠিয়া বলিল—’দেখ সত্য, তুমি যা বোঝ না তা নিয়ে ফাজলামি ক’রো না। প্রার্থনাও যা মন্ত্রসাধনাও তা। মন্ত্রসাধনায় প্রচণ্ড এনার্জি উৎপন্ন হয় তা মান?’
সত্য। আলবৎ মানি। তার সাক্ষী রাজশাহির তড়িতানন্দ ঠাকুর, কলেজের ছেলেরা যাঁকে বলে রেডিও বাবা। বাবার দুই টিকি, একটি পজিটিভ, একটি নেগেটিভ। আকাশ থেকে ইলেকট্রিসিটি শুষে নেন। স্পার্ক ঝাড়েন এক—একটি আঠারো ইঞ্চি লম্বা। কাছে এগোয় কার সাধ্য—সিল্কের চাদর মুড়ি দিয়ে দেখা করতে হয়।
নিবারণ। নাঃ মিরচাই বেদান্ত ইলেকট্রিসিটি এর একটাও নিতাইদার ধাতে সইবে না। যদি কোনও নিরীহ বাবাজী সন্ধানে থাকে তো বল। কিন্তু কেরামতি চাই, শুধু ভক্তিতত্ত্বে চলবে না। কি বলেন নিতাইদা?
পরমার্থ। তবে দমদমায় গুরুপদবাবুর বাগানে চলুন, বিরিঞ্চিবাবার কাছে।
নিবারণ। আলিপুরের উকিল গুরুপদবাবু? আমাদের প্রফেসর ননির শ্বশুর? তিনি আবার বাবাজী জোটালেন কোথা থেকে? সত্য, তুই জানিস কিছু?
সত্য। ননিদার কাছে শুনেছিলুম বটে গুরুপদবাবু সম্প্রতি একটি গুরুর পাল্লায় পড়েছেন। স্ত্রী মারা গিয়ে অবধি ভদ্রলোক একেবারে বদলে গেছেন। আগে তো কিছুই মানতেন না।
নিবারণ। গুরুপদবাবুর আর একটি আইবড় মেয়ে আছে না?
সত্য। বুঁচকী, ননিদার শালী।
নিবারণ। তারপর পরমার্থ, বাবাজীটি কেমন?
পরামর্থ। আশ্চর্য! কেউ বলে তাঁর বয়স পাঁচ—শ বৎসর কেউ বলে পাঁচ হাজার অথচ দেখতে এই নিতাইদার বয়সী বোধ হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে একটু হেসে বলেন—বয়স ব’লে কোনও বস্তুই নেই। সমস্ত কাল—একই কাল; সমস্ত স্থান—একই স্থান। যিনি সিদ্ধ তিনি ত্রিকাল ত্রিলোক একসঙ্গেই ভোগ করেন। এই ধর —এখন সেপ্টেম্বর ১৯২৫ , তুমি হাবশীবাগানে আছ। বিরিঞ্চিবাবা ইচ্ছে করলে এখনই তোমাকে আকবরের টাইমে আগ্রাতে অথবা ফোর্থ সেঞ্চুরি বি. সি. তে পাটলিপুত্র নগরে এনে ফেলতে পারেন। সমস্তই আপেক্ষিক কি না।
নিবারণ। আইনস্টাইনের পসার একেবারে মাটি?
পরমার্থ। আরে আইনস্টাইন শিখলে কোত্থেকে? শুনেছি বিরিঞ্চিবাবা যখন চেকোস্লোভাকিয়ায় তপস্যা করতেন তখন আইনস্টাইন তাঁর কাছে যাতায়াত করত। তবে তার বিদ্যে রিলেটিভিটির বেশী এগোয় নি।
নিতাইবাবু উদগ্রীব হইয়া সমস্ত শুনিতেছিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন—’আচ্ছা আইনস্টাইনের থিওরিটা কি বল তো?’
পরমার্থ। কি জানেন, স্থান কাল আর পাত্র এরা পরস্পরের ওপর নির্ভর করে। যদি স্থান কিংবা কাল বদলায় তবে পাত্রও বদলাবে।
সত্য। ও হ’ল না, আমি সহজ ক’রে বলছি শুনুন। ধরুন আপনি একজন ভারিক্কে লোক, ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে গেছেন, তখন আপনার ওজন ২ মণ ৩০ সের। সেখান থেকে গেলেন গেঁড়াতলা কংগ্রেস কমিটিতে—সেখানে ওজন হ’ল মাত্র ৫ ছটাক, ফুঁয়ে উড়ে গেলেন।
নিবারণ। ঠিক । জনার্দন ঠাকুর পটলডাঙ্গায় কেনে আড়াই সের আলু, আর মেসে এলেই হয় যায় ন—পো।
নিতাই। আচ্ছা পরমার্থ, বিরিঞ্চিবাবা নিজে তো ত্রিকালসিদ্ধ পুরুষ। ভক্তদের কোনও সুবিধে করে দেন কি?
পরমার্থ। তেমন তেমন ভক্ত হ’লে করেন বই কি। এই সেদিন মেকিরাম আগরওয়ালার বরাত ফিরিয়ে দিলেন। তিন দিনের জন্যে তাকে নাইণ্টিন ফোর্টিনে নিয়ে গেলেন, ঠিক লড়ায়ের আগে। মেকিরাম পাঁচ হাজার টন লোহার কড়ি কিনে ফেললে ছ টাকা হন্দর। তার পরেই তাকে এক মাস নাইণ্টিন নাইণ্টিনে রাখলেন। মেকিরাম বেচে দিলে একুশ টাকা দরে। তখন আবার তাকে হাল আমলে ফিরিয়ে আনলেন। মেকিরাম এখন পনর লাখ টাকার মালিক। না বিশ্বাস হয়, অঙ্ক ক’ষে দেখ।
