বিশ্বামিত্র বলেন, কল্যাণমস্তু। বৎসগণ, তোমরা আমার অতি স্নেহের পাত্র। তোমাদের ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছে, কিছু খাবে?
—খাব, খাব।
—মৃগমাংস? পুরোডাশ? পিষ্টক? সুপক্ব হরীতকী? ইক্ষুদণ্ড?
—ওসব চিবুতে পারব না, দাঁত নেই যে। আপনার সন্ধানে দুধ আছে?
—আছে। কিন্তু মাতৃদুগ্ধ বা গবাদির দুগ্ধ তো তোমরা জীর্ণ করতে পারবে না। এস আমার সঙ্গে, আমি লঘু পথ্যের ব্যবস্থা করব।
বালখিল্যদের নিয়ে বিশ্বামিত্র অলম্ব তীর্থে উপস্থিত হলেন। সেখানে একটি বিশাল বটবৃক্ষের শাখাপ্রশাখায় লক্ষ লক্ষ বাদুড় ত্রিশঙ্কুর মতন ঊর্ধ্বপাদ অধঃশিরা হয়ে ঝুলছে। স্ত্রী বাদুড়দের সম্বোধন করে বিশ্বামিত্র বললেন, অয়ি চর্মপর্ণা দন্তবতী পয়স্বিনী বিহঙ্গীর দল, এই সদ্যঃপ্রসূত বুভুক্ষু, মুনিশাবকগণকে তোমরা স্তন্যদান কর।
বাদুড়—বনিতারা করুণাবিষ্ট হয়ে বললে, আহা, এস এস বাছারা।
বিশ্বামিত্র বালখিল্যদের একে একে তুলে বটবৃক্ষের শাখায় লম্বিত করে দিলেন। তারা বাদুড়ীদের বক্ষোলগ্ন হয়ে পরমানন্দে স্তন্যপানে রত হল।
ক্রতু প্রশ্ন করলেন, এরা কত কাল এইপ্রকার শান্ত হয়ে থাকবে?
বিশ্বামিত্র বললেন, এখন তো থাকুক, এর পর আবার যদি উপদ্রব করে তখন দেখা যাবে।
১৩৬০ (১৯৫৩)
বিরিঞ্চিবাবা
চৌদ্দ নম্বর হাবশীবাগান লেনের মেসটি ছোট কিন্তু বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, কারণ ম্যানেজার নিবারণ মাস্টার খুব আমুদে লোক হইলেও সব দিকে তার কড়া নজর আছে। মেসের অধিবাসী পাঁচ—ছয়জন মাত্র এবং সকলেরই অবস্থা ভাল। বসিবার জন্য একটি আলাদা ঘর, তাতে ঢালা ফরাশ এবং অনেক রকম বাদ্যযন্ত্র, দাবা, তাস, পাশা ও অন্যান্য খেলার সরঞ্জাম, কতকগুলি মাসিক পত্রিকা প্রভৃতি চিত্তবিনোদনের উপকরণ সজ্জিত আছে। কাল হইতে পূজার বন্ধ, সেজন্য মেসের অনেকে দেশে চলিয়া গিয়াছে। বাকী আছে কেবল নিবারণ ও পরমার্থ। ইহারা কোথাও যাইবে না, কারণ দুজনেরই শ্বশুরবাড়ির সকলে কলিকাতায় আসিতেছেন।
নিবারণ কলেজে পড়ায়। পরমার্থ ইনিশিওরান্সের দালালি, হঠযোগ এবং থিওসফির চর্চা করে। আজ সন্ধ্যায় মেসের বৈঠকখানায় ইহারা দুইজন এবং পাশের বাড়ির নিতাইবাবু আড্ডা দিতেছেন। নিতাইবাবু নিত্যই এখানে আসেন। তাঁর একটু বয়স হইয়াছে, সেজন্য মেসের ছোকরার দল তাঁকে একটু সমীহ করে, অর্থাৎ পিছন ফিরিয়া সিগারেট খায়।
নিতাইবাবু বলিতেছিলেন—’চিত্তে সুখ নেই দাদা। ঝি—বেটী পালিয়েছে, খুকী—টার জ্বর, গিন্নী খিটখিট করছেন, আপিসে গিয়েও যে দু—দণ্ড ঘুমুব তার জো নেই, নতুন ছোট—সায়েব ব্যাটা যেন চরকি ঘুরছে।’
পরমার্থ বলিল—’কেন আপনাদের আপিসে তো বেশ ভাল ব্যবস্থা আছে।’
নিতাই। সেদিন আর নেই রে ভাই। ছিল বটে মেকেঞ্জি সায়েবের আমলে। বরদা—খুড়োকে জান তো? শ্যমনগরের বরদা মুখুজ্যে। খুড়ো দুটোর সময় আফিম খেতেন, আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটে পর্যন্ত ঘুমুতেন। আমরা সবাই পালা ক’রে টিফিনঘরে গড়িয়ে নিতুম, কিন্তু খুড়ো চেয়ার ছাড়তেন না। একদিন হয়েছে কি—লেজার ঠিক দিতে দিতে যেমনি পাতার নীচে পৌঁছেছেন অমনি ঘুম এল। নড়ন—চড়ন নেই, নাক—ডাকা নেই, ঘাড় একটু ঝুঁকল না, লেজার টোটালের জায়গায় হাতের কলমটি ঠিক ধরা আছে। আসাধারণ ক্ষমতা—দূর থেকে দেখলে কে বলবে খুড়ো ঘুমুচ্ছে। এমন সময় মেকেঞ্জি সায়েব ঘরে এল, সকলে শশব্যস্ত। সায়েব খুড়োর কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ নিরীক্ষণ ক’রে খুড়োর কাঁধে একটি চিমটি কাটলে। খুড়ো একটু মিটমিটিয়ে চেয়েই বিড় বিড় ক’রে আরম্ভ করলে—সাঁইত্রিশের সাত নাবে তিনে—কত্তি তিন। সায়েব হেসে বললে—হ্যাভ এ কপ অভ টী বাবু। এখন সে রামও নেই সে অযোধ্যাও নেই। সংসারে ঘেন্না ধ’রে গেছে। একটি ভাল সাধু—সন্ন্যাসী পাই তো সব ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
পরমার্থ। জগন্নাথ—ঘাটে আজ একটি সাধুকে দেখে এলুম—আশ্চর্য ব্যাপার। লোকে তাঁকে বলে মিরচাইবাবা। তিনি কেবল লঙ্কা খেয়ে থাকেন, —ভাত নয়, রুটি নয়, ছাতু নয়—শুধু লঙ্কা। লক্ষ লক্ষ লোক ওষুধ নিতে আসছে, একটি ক’রে লঙ্কা মন্ত্রপূত ক’রে দিচ্ছেন, তাই খেয়ে সব ভাল হয়ে যাচ্ছে। শুনেছি তাঁর আবার যিনি গুরু আছেন তাঁর সাধনা আরও উঁচু দরের। তিনি খান স্রেফ করাতের গুঁড়ো।
নিতাই। ওহে মাস্টার, তুমি তো ফিলজফিতে এম.এ.পাশ করেছ—লঙ্কা, করাতের গুঁড়ো, এ সবের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য কি বল তো? তোমার পাখোয়াজ বন্ধ কর বাপু কান ঝালাপালা হ’ল।
নিবারণ প্রথমে একটা মাসিক পত্রিকা লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছিল। তাতে যে পাঁচটি গল্প আছে তার প্রত্যেকের নায়িকা এক—একটি সতী—সাধ্বী বারাঙ্গনা। অবশেষে নিবারণ পত্রিকাটি ফেলিয়া দিয়া একটা পাখোয়াজ কোলে লইয়া মাঝে মাঝে বেতালা চাঁটি মারিতেছিল। নিতাইবাবুর কথায় বাজনা থামাইয়া বলিল—’ও সব হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সাধনার মার্গ। যেমন জ্ঞানমার্গ, কর্মমার্গ, ভক্তিমার্গ,—তেমনি মিরচাইমার্গ, করাতমার্গ, লবণমার্গ, একাদশীমার্গ, গোবরমার্গ, টিকিমার্গ, দাড়িমার্গ, স্ফটিকমার্গ, কাগমার্গ—’
নিতাই। কাগমার্গ কি রকম?
নিবারণ। জানেন না? গেল বছর হরিহর ছত্রের মেলায় গিয়েছিলুম। এক জায়গায় দেখি একটা প্রকান্ড বাঁশের খাঁচায় শ—দুই কাগ ঝমেলা করছে। পাশে একটা লোক হাঁকছে—দো—দো আনে কৌয়ে, দো—দো আনে। ভাবলুম বুঝি পেশোয়ারী কি মুলতানী কাগ হবে, নিশ্চয় পড়তে জানে। একাট ধাড়িগোছ কাগের কাছে গিয়ে শিস দিয়ে বললুম—পড়ো ময়না, চিত্রকোট কি ঘাট পর—সীতারাম—রাধাকিষন বোলো —চুচ্চচুঃ। ব্যাটা ঠোকরাতে এল। কাগ—ওলা বললে—বাবু কৌয়া নহি পঢ়তা। তবে কি করে বাপু? কাগের মাংস তো শুনতে পাই তেতো, লোকে বুঝি সুক্ত বানাবার জন্যে কেনে? বললে—তাও নয়। এই কাগ খাঁচায় কয়েদ রয়েছে, দু—দু আনা খরচ ক’রে যতগুলি ইচ্ছে কিনে নিয়ে জীবকে বন্ধনদশা হ’তে মুক্তি দাও, তোমারও মুক্তি হবে। ভাবলুম মোক্ষের মার্গ কি বিচিত্র! অন্য লোকে মুক্তি পাবে তাই এই গরিব কাগ—ওলা বেচারা নিজের পরকাল নষ্ট করছে। একেই বলে conservation of virtue. একজন পাপ না করলে আর একজনের পুণ্য হবার জো নাই।
