প্রায় তিন শ জন হাত তুললেন, যেসব মেয়েরা আড্ডা দিচ্ছিল তারা দু হাত তুললে। সভাপতি বললেন, দেখা গেল পনরো আনার বেশী সদস্যের সম্মতি আছে, অতএব বরনারীবরণ হবে। এখন আপনাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বরয়িতা বা বিচারকের নাম প্রস্তাব করুন।
কপোত গুহর তালিম অনুসারে বিখ্যাত উপন্যাসলেখক অরিন্দম সান্যাল দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আমি প্রস্তাব করছি—খ্যাতনামা চলচ্চিত্র—প্রয়োজক শ্রীযুক্ত ভূপেন হালদার মশাইকে বরনারীবরণের ভার দেওয়া হক। নারীর রূপের সমঝদার এর চাইতে ভাল কেউ নেই। আমার মতে ইনিই যোগ্যতম বরয়িতা।
ভূপেন হালদার দাঁড়িয়ে উঠে করজোড়ে বললেন, আপনারা আমাকে মাপ করবেন, আমি এই কাজের মোটেই উপযুক্ত নই। আমি নারী দেখি ক্যামেরার দৃষ্টিতে, পর্দায় তাঁদের রূপ কি রকম ফুটে উঠবে তাই আমার বিচার্য। রক্তমাংসের নরনারী সোজা চোখে কেমন দেখায় তার অভিজ্ঞতা আমার বিশেষ কিছু নেই।
সোহনলালের উসকানিতে আর একজন সদস্য প্রস্তাব করলেন, প্রবীণ চিত্রকর স্বনামখ্যাত নিখিলেশ্বর সেন মহাশয়কে বরয়িতা করা হক!
নিখিলেশ্বর হাত জোড় করে বললেন, মাপ করবেন মশাইরা। কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে ঘর করি, সাহায্য করবার দ্বিতীয় লোক নেই, গৃহিণীই একমাত্র ভরসা। তিনি বাড়িতে ঘরকন্নার কাজে ডুবে আছেন এই মওকায় যদি আমি একজন বরনারীকে মাল্যদান করি তবে গৃহিণী খুশী হবেন না। কাগজে আর ক্যাম্বিসে হরেক রকম বরনারী আঁকতে পারি—শাড়ি সিঁদুর—টিপ পরা মেম, ঢুলু ঢুলু চৈনিক—নয়না ওরিয়েণ্টাল ললনা, পটের সুন্দরী যার পটোলচেরা চোখ মুণ্ডুর বাইরে বেরিয়ে আসে—সব রকমই আমি এঁকে থাকি। কিন্তু একজন জলজ্যান্ত সুন্দরীকে সামনাসামনি বরণ করব এমন বুকের পাটা আমার নেই।
ছাত্রীদের আড্ডা থেকে রব উঠল, যত সব ভীরু কাওয়ার্ড।
প্রতাপগড় কলেজের ভূতপূর্ব প্রিনসিপাল গগন বাঁড়ুজ্যে বললেন, আমাদের সদস্যদের সংকোচ হবারই কথা। এত দিন ধরে যাঁদের দেখে আসছেন তাঁদের একজনকে আজ হঠাৎ বরমাল্য দিতে চক্ষুলজ্জা হতেই পারে। বরনারীবরণের ভার কোনও নতুন লোককে দেওয়াই ভাল। ভাগ্যক্রমে রিটায়ার্ড এগজিকিউটিভ এঞ্জিনিয়ার শ্রদ্ধেয় রাখহরি লাহিড়ী মশাই এখানে উপস্থিত আছেন। ইনি বহুদর্শী বিচক্ষণ ঋষিতুল্য লোক, বয়সে আমাদের সকলের চাইতে বড়, নির্ভীক স্পষ্টবক্তা বলে এঁর খ্যাতি আছে। কর্নেল গ্রেহাম সাহেবকে ইনি মুখের ওপর ড্যাম ফুল বলেছিলেন, সেজন্যই রায়বাহাদুর খেতাব পান নি। আমার প্রস্তাব, এঁকেই বরয়িতা করা হোক।
একজন সদস্য এই প্রস্তাবের সমর্থন করলেন। অনুকূলবাবু তাঁর বেহাইকে বললেন, আপত্তি করবেন না লাহিড়ী মশাই, আপনিই আমাদের ভরসা। রাখহরি বাবু তাঁর পত্নীকে জিজ্ঞাসা করলেন, গিন্নী কি বল, রাজী হব নাকি?
থাকমণি দেবী কানে একটু কম শোনেন, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারেন নি। অনুকূলবাবুর স্ত্রী সরসীবালা তাঁকে সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন। থাকমণি বললেন, বেশ তো, যাকে পছন্দ হয় মালা দাও না গিয়ে, কে বারণ করছে। আমি তো একটা অখদ্যে থুত্থুড়ী বুড়ী।
সরসীবালা বললেন, ওকি দিদি, খুশী মনে হুকুম দিন, তা না হলে ওঁর যেতে সাহস হবে কেন। সভায় এত লোক ওঁর জন্য হা—পিত্যেশ করছে, ওদের হতাশ করবেন না।
থাকমণি বললেন, হ্যাঁ গো হাঁ, খুশী মনেই বলছি। ওই তো গণ্ডা গণ্ডা রূপসী বসে রয়েছে, যাকে মনে ধরে স্বচ্ছন্দে মালা দিয়ে এস, আমার তাতে কি।
থাকমণি দেবী একটু বেশী বুড়ো হয়ে পড়েছেন, কিন্তু তাঁর স্বামীর চেহারাটি দেখবার মতন। লম্বা মজবুত গড়ন, ফরসা রং, পাকা চুল, পাকা গোঁফ—দাড়ি, যেন থিয়েটারের ভীষ্ম। পত্নীর সম্মতি পেয়ে রাখহরিবাবু দাঁড়িয়ে উঠে স্মিতমুখে বললেন, সভাপতিভায়া, মাননীয় মহিলা ও ভদ্রবৃন্দ, মা—লক্ষ্মীগণ এবং দিদিমণিগণ আমার ওপর আপনারা বড় কঠিন কর্তব্য চাপিয়েছেন। কিন্তু আমি পিছপা নই, এর চাইতেও শক্ত কাজ ঢের করেছি। গোড়াতেই আমি বরনারীর লক্ষণ সম্বন্ধে দু—চার কথা বলতে চাই। ইংরেজীতে প্রবাদ আছে—beauty is skin deep, অর্থাৎ রূপের দৌড় চামড়া পর্যন্ত। কথাটা ডাহা মিথ্যে। শুধু চামড়ায় নয়, নারীর মাংস হাড় মজ্জা সর্বত্রই রূপের সন্ধান করতে হবে।
একটা ফাজিল মেয়ে বললে, চিরে চিরে দেখবেন নাকি সার?
—আরে না না, তোমাদের কোনও ভয় নেই, আমি এক নজরেই ভেতর বার সব টের পাই। যা বলছিলুম শোন। মানুষের যেমন তিন দশা—বাল্য—যৌবন—জরা, নারীর যৌবনেরও তেমনি তিন দশা—আদ্য—মধ্য আর অন্ত্য। এই তিন যৌবনের তোয়াজ বা পরিচর্যার পদ্ধতি আলাদা, প্রসাধন বা মেরামতও এক রকমের হয় না। কি রকম জানেন? মনে করুন একটা ইমারত তৈরী হল। প্রথম পনরো বৎসর তার হেপাজত খুব সোজা, মাঝে মাঝে চুনকাম আর রং ফেরালেই যথেষ্ট। কিন্তু আরও পরে দেখবেন, এক এক জায়গায় পলেস্তারা খসে গেছে, দরজা জানালার রং চটে গেছে। তখন রীতিমত মেরামত করতে হবে। ত্রিশ—চল্লিশ বছর পরে দেখবেন, স্থানে স্থানে ভিত বসে গেছে, দেওয়ালে ফাটল ধরেছে, ছাত চিড় খেয়েছে। তখন শুধু দাগরাজি নয়, থরো রিপেয়ার দরকার, হয়তো দু—চার জায়গায় পিলপে গেঁথে কড়িতে চাড় দিতে হবে, ফাটা দেওয়াল জুড়তে হবে। ফেস লিফটিং জানেন? বিলেতে খুব চলন আছে, আমাদের মা—লক্ষ্মীরা কেউ করিয়েছেন কিনা জানি না। বেশী বয়সে গাল ঝুলে পড়বে রগের চামড়া টেনে সেলাই করে দেয়, তাতে যৌবনশ্রী ফিরে আসে। ফাটা দেওয়াল যেমন লোহার প্লেট আর নাট—বোল্টু দিয়ে টেনে রাখা হয় সেইরকম আর কি! আসল কথা আমাদের এই দেহমন্দির একটা ইমারতের সমান, যতদিন খাড়া থাকে ততদিনই তার তোয়াজ করতে হয়। কিন্তু ইমারত পুরনো হলেই বরবাদ হয় না, হাল ফ্যাশনের অনেক বাড়ির চাইতে আমাদের বাপ—পিতামোর আমলের সেকেলে বাড়ি ঢের ভাল। বরনারীও সেইরকমে বিচার করতে হবে। শুধু কম বয়স আর ওপরচটকে ভুললে চলবে না মশাই, দেখতে হবে বনেদ কেমন, গাঁথনি কেমন, ভূমিকম্প আর ঝড়বৃষ্টির ধকল সইতে পেরেছে কিনা। আচ্ছা, কথা তো বিস্তর বলা হল, এখন ইনস্পেকশন আরম্ভ করা যাক। কই হে সেক্রেটারি, তোমাদের বরমাল্য কই?
