কপোত গুহ একটি প্রকাণ্ড মালা এনে বললেন, এই যে সার। রাখবরিবাবু মালাটি হাতে নিয়ে বললেন, বাঃ, খাসা মালাটি, বোধ হয় সের খানিক জুঁই ফুল আছে। বরমাল্য এইরকমই হওয়া উচিত। আজকাল হয়েছে গ্যালভানাইজ তারে গাঁথা ফুল—পাতার মালা, খ্রীষ্টানরা যেমন কবরে দেয়। এক জায়গায় আমাকে ওইরকম একটা মালা দিয়েছিল, গিন্নী রেগে গিয়ে টান মেরে সেটা ফেলে দিয়েছিলেন।
রাখহরি লাহিড়ী মন্থরগতিতে পরিক্রমণ আরম্ভ করলেন। প্রথমেই ছাত্রীদের দলের কাছে এসে বললেন, বগের মত গলা বাড়াচ্ছিস কি, তোদের মালা দিচ্ছি না। তোরা হলি কাঁচা কংক্রিট, পোক্ত হতে বহুকাল লাগবে।
একটি মেয়ে চুপি চুপি বললে, দাদু দয়া করে রাজলক্ষ্মী দেবীর গলায় মালা দিন, ভীষণ মজা হবে।
চোপ বলে ধমক দিয়ে রাখহরি এগিয়ে চললেন। প্রত্যেক মহিলার সামনে এসে একটু থামেন, তার পর আবার চলেন। সভায় চাপা গলায় তুমুল গুঞ্জন আরম্ভ হল। সদস্যরা বলাবলি করতে লাগলেন—বুড়ো কাকে মালা দেবে মনে হচ্ছে? নিশ্চয় হ্লাদিনী দেবীকে—উঃ, কি মারাত্মক কায়দায় শাড়ি পরেছে দেখ। কই না, ওর দিকে একবার তাকিয়েই তো এগিয়ে চলল। ওই দেখ, বঞ্জুলা নিয়োগীকে ঠাউরে দেখছে। নাঃ বুড়োর পছন্দ কিচ্ছু নেই, ঘাড় নেড়ে আবার চলল। বোধ হয় কলাবতী ভৌমিককে পছন্দ করবে। ওঃ, চুল বাঁধার স্টাইলখানা দেখ। আরে গেল যা, ওকেও তো ফেলে চলে গেল! কাকে মালা দেবে বুড়ো, সুন্দরী আর কই? এই মাটি করলে, রাজলক্ষ্মী দেবীর কাছে থেমেছে, শেষটায় ওকেই মনে ধরল নাকি? নাঃ, একটু হেসে ঘাড় নেড়ে আবার চলেছে।
রাখহরি লাহিড়ী সমস্ত মহিলা পরিদর্শন করে ফিরে আসছেন দেখে কপোত গুহ আর সোহনলাল হন্তদন্ত হয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, কি হল সার, মালা দিলেন না?
এই যে দিচ্ছি ভাই—এই বলে রাখহরি হন হন করে তাঁর বসবার জায়গায় ফিরে এসে মৃদু স্বরে বললেন, গিন্নী! মাথাটা তোল। থাকমণি থতমত খেয়ে ঘাড় উঁচু করলেন, রাখহরি ঝুপ করে মালাটি তাঁর গলায় দিলেন।
নিমেষকালমাত্র সভা চিত্র র্পিতবৎ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার পর তিন দিক থেকে তীব্র আলোর ঝলক থাকমণি দেবীর শীর্ণ মুখে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে তিনটে ক্যামেরায় লেন্স উন্মীলিত হল—ক্লিক ক্লিক ক্লিক। থাকমণি চমকে উঠে মুখ বেঁকিয়ে বললেন, আঃ, জ্বালিয়ে মারলে, এদের মতলবটা কি, খুন করবে নাকি?
তুমুল করতালির শব্দে সভা যেন ফেটে পড়ল, যেসব মহিলার রূপের খ্যাতি আছে তাঁরাই সবচেয়ে বেশী হাততালি দিলেন। ছাত্রীর দল হেসে লুটোপুটি খেতে লাগল।
হট্টগোল একটু থামলে রাজলক্ষ্মী দেবী দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আজকের অনুষ্ঠানটি অতি মনোজ্ঞ হয়েছে, আমরা অনাবিল আনন্দ উপভোগ করেছি। মহিলাদের পক্ষ থেকে আমি শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত রাখহরি লাহিড়ী মহাশয়কে অসংখ্য ধন্যবাদ দিচ্ছি, তাঁর বরনারীবরণ অনবদ্য হয়েছে। শ্রীযুক্ত থাকমণি দেবী আজ যে দুর্লভ সম্মান পেলেন তার জন্যে তাঁকেও আমরা অভিনন্দন জানাচ্ছি। তাঁকে মাল্যদান করে শ্রীলাহিড়ী সমস্ত পুরুষজাতির সমক্ষে একটি সুমহান আদর্শ স্থাপন করেছেন। এই বলে রাজলক্ষ্মী দেবী তাঁর স্বামী বামাপদ ঘোষালের দিকে কটমট করে তাকালেন।
সরসীবালা তাঁর বেহানকে বললেন, কি দিদি, এখন খুশী হয়েছেন তো?
—রাম রাম, কি ঘেন্না, কি ঘেন্না বুড়োর বুদ্ধিশুদ্ধি কি একেবারে লোপ পেয়েছে! বাড়ি চল বোন, এখানে আর একদণ্ড নয়, সবাই প্যাঁট প্যাঁট করে তাকাচ্ছে।
১৩৬০(১৯৫৩)
বালখিল্যগণের উৎপত্তি
পুরাণে আছে, বালখিল্য মুনিরা বুড়ো আঙুলের মতন লম্বা এবং সংখ্যায় ষাট হাজার। তাঁদের পিতার নাম ক্রতু, মাতার নাম ক্রিয়া। এই বৃত্তান্ত অসম্পূর্ণ, এতে কিছু ভুলও আছে। বালখিল্যগণের প্রকৃত ইতিহাস নিম্নে বিবৃত করছি।
পুরাকালে নৈমিষারণ্যে বহু ঋষির আশ্রম ছিল। ব্রহ্মার অন্যতম মানসপুত্র মহর্ষি ক্রতু তার ভার্যা ক্রিয়ার সঙ্গে সেখানেই বাস করতেন। ক্রতু হলেন সপ্তর্ষিগণের ষষ্ঠ ঋষি। একদিন বিকাল বেলা কুটীরের দাওয়ায় বসে তিনি তাঁর পত্নীকে ব্যাকরণ শেখাচ্ছিলেন। ক্রতু বলছিলেন, প্রিয়ে, এই স্ত্রীপ্রত্যয়করণ বড়ই কঠিন, তুমি উত্তমরূপে কণ্ঠস্থ কর। মৎস্য শব্দের য—ফলা আছে, কিন্তু স্ত্রীলিঙ্গে মৎসী, য—ফলা হয় না। অনুরূপ মনুষ্য মনুষী। ইন্দ্রের স্ত্রী ইন্দ্রাণী, চন্দ্রের স্ত্রী চন্দ্রা। অশ্বের স্ত্রী অশ্বা, অথচ গদর্ভের স্ত্রী গর্দভী।
সহসা একটা গম্ভীর চাপা আওয়াজ শোনা গেল। মহর্ষি ক্রতু সবিস্ময়ে কান পেতে শুনলেন যেন কেউ কলসীর ভিতর থেকে কথা বলছে—আপনি সব ভুল শেখাচ্ছেন।
ক্রুদ্ধ হয়ে ক্রতু বললেন, কে রে তুই, এতদূর আস্পর্ধা যে আমার ভুল ধরিস!
আবার আওয়াজ হল—ওসব সেকেলে ব্যাকরণ চলবে না। স্ত্রীলিঙ্গ একই পদ্ধতিতে করতে হলে—মৎসী মনুষ্যী ইন্দ্রী চন্দ্রী অশ্বী গর্দভী, কিংবা মৎস্যিণী মনুষ্যিণী ইন্দ্রিণী চন্দ্রিণী অশ্বিণী গর্দভিণী।
ক্রতু বললেন, কোথায় আছিস তুই, সম্মুখে আয়, লগুড়াঘাতে তোকে ব্যাকরণ শিক্ষা দেব।
ঋষিপত্নী ক্রিয়া বলিলেন, স্বামী, অদৃশ্য মূর্খের বাক্যে কর্ণপাত করো না। ব্যাকরণের পাঠ আজ স্থগিত থাকুক, সেদিন তুমি যে প্রত্যক্ষ দেবতাদের কথা বলছিলে তাই পুনর্বার শুনতে ইচ্ছা করি।
