সোহনলাল বললেন, খুব ভাল হবে। জজ মশাই যখন ঘুরে ঘুরে ইনস্পেকশন করবেন তখন মহিলাদের বুক তড়প তড়প করবে, আর পুরুষরা খুব মজা পাবে। হয়তো চুপি চুপি বাজি ধরবে—ফোর টু ওআন হ্লাদিনী দেবী, থ্রি টু ওআন কলাবতী ভৌমিক। এর চেয়ে আমোদ হতেই পারে না।
আরও কিছুক্ষণ পরামর্শের পর স্থির হল যে আষাঢ় মাসের অধিবেশনে বরনারীবরণের ব্যবস্থা হবে। বিচারক কে হবেন তা নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর দরকার নেই, সভাতে স্থির করলেই চলবে। বরনারীর নির্বাচনে কিছু গলদ হলেও ক্ষতি হবে না, সদস্যরা যদি হুজুগে মেতে একটু উত্তেজনা আর আনন্দ উপভোগ করেন তা হলেই আয়োজন সার্থক হবে।
কপোত গুহ আর সোহনলাল সাহু যাবার জন্য উঠলেন। অনুকূল চৌধুরী বললেন, হাঁ, ভাল কথা—আমার বেহাই রাখহরি লাহিড়ী সস্ত্রীক কাশী থেকে আসছেন, পুরী ঘুরে এসে কিছুদিন আমার কাছে থাকবেন। এককালে ইনি গোরখপুর ডিভিশনের বড় এঞ্জিনিয়ার ছিলেন, বেশ পণ্ডিত লোক। বয়স আশি পেরিয়েছে, কিন্তু খুব শক্ত আছেন, তাঁর গিন্নীরও প্রায় বাহাত্তর হবে। কাশীতে ছেলের কাছে থাকেন, কিন্তু সেখানকার গরম এখন আর বুড়ো বুড়ীর সয় না। লাহিড়ী মশাইকে অতিথি হিসেবে একটা নিমন্ত্রণপত্র দিও, তাঁর স্ত্রী থাকমণি দেবীকেও দিও। আমি সস্ত্রীক সজ্জনসংগতিতে যাব, বেহাই—বেহানকে বাড়িতে ফেলে রাখা ভাল দেখাবে না।
কপোত গুহ বললেন, নিশ্চয় নিশ্চয়। সোহনলাল আর আমি আপনার বাড়িতে গিয়ে তাঁদের নিমন্ত্রণপত্র দিয়ে আসব।
কপোত গুহর চেষ্টায় বরানগরের ভাগীরথী ভিলা নামক প্রকাণ্ড বাগানবাড়িটি যোগাড় হয়েছে, এখানেই বরনারীবরণ হবে। সজ্জনসংগতির আড়াই শ সদস্য—সদস্যা সকলেই এসেছেন, তা ছাড়া তাঁদের সুপারিশে প্রায় এক শ জন অতিথি হিসাবে আমন্ত্রিত হয়েছেন। চার দিক গাছে ঘেরা খোলা মাঠে সভা বসেছে। যদি বৃষ্টি হয় তবে বাড়ির বড় হল ঘরে উঠে গেলেই চলবে। স্ত্রীপুরুষের আলাদা বসবার ব্যবস্থা হয় নি, অন্যান্য অধিবেশনের মতন এবারেও সকলে ইচ্ছামত মিলে মিশে বসেছেন। কেবল দশ—বারো জন স্কুল—কলেজের মেয়ে এক পাশে দল বেঁধে মহা উৎসাহে আড্ডা দিচ্ছে।
মাঠের এক ধারে সভাপতি অনুকূল চৌধুরী বসেছেন। নিকটেই তাঁর স্ত্রী সরসীবালা দেবী, বেহাই রাখহরি লাহিড়ী, বেহান থাকমণি দেবী এবং কয়েকজন মান্যগণ্য সদস্য—সদস্যা আর আমন্ত্রিত অতিথি আসন পেয়েছেন। কপোত গুহ, সোহনলাল সাহু এবং অন্যান্য কর্মকর্তারাও কাছে আছেন।
প্রথমেই সভাপতি বললেন, আপনারা আমন্ত্রণপত্রে পড়েছেন যে আজ আমরা এখানে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। আশা করি সেটি সকলেরই উপভোগ্য হবে। আমাদের মামুলী কৃত্য যা আছে তা আগে চুকে যাক, তারপর বরনারীবরণ হবে।
যথারীতি বেহালা এসরাজ বাঁশির কনসার্ট, সংগীত নৃত্য, আবৃত্তি আর জলযোগ শেষ হল। অধ্যাপক কপিঞ্জল গাঙ্গুলী বৈদিক যুগের নক্তগোষ্ঠী বা নাইট ক্লাব সম্বন্ধে একটি সারগর্ভ প্রবন্ধ পড়বার উপক্রম করছিলেন, কিন্তু তাঁর পাশের সদস্যরা তাঁকে থামিয়ে দিলেন। তারপর সভাপতি ঘোষণা করলেন—আজ আমরা উপস্থিত মহিলাগণের মধ্য থেকে একজনকে বরনারী রূপে বরণ করব। বরয়িতা অর্থাৎ বিচারক কে হবেন, কাকে আপনারা এই দুরূহ কর্মের যোগ্যতম মনে করেন, তাঁর নাম আপনারাই প্রস্তাব করুন।
রাজলক্ষ্মী দেবী সাহিত্যভাস্বতী, একজন উঁচুদরের লেখিকা। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, শ্যামবর্ণ লম্বা চওড়া দশাসই চেহারা, মুখটি বেশ ভারী আর গম্ভীর। দশ বৎসর আগেও এঁর লেখা খুব জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু সম্প্রতি অর্বাচীন লেখক—লেখিকাদের উপদ্রবে এঁর বইয়ের কাটতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে। রাজলক্ষ্মী দেবী দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আপনারা যা করতে চাচ্ছেন তা আমাদের ভারতীয় সংস্কারের বিরোধী। প্রকাশ্য সভায় একজন পরপুরুষ একজন পরনারীকে বরনারী আখ্যা দিয়ে মাল্যদান করবে—সেই নারী কুমারী সধবা বিধবা যাই হ’ক না কেন—এ অতি অশোভন নীতিবিরুদ্ধ ব্যাপার। বিলাতে এসব অনাচার চলতে পারে, কিন্তু এদেশের রুচিতে তা সইবে না। আমাদের আদর্শ সীতা সাবিত্রী দময়ন্তী, সর্বসাধারণের দৃষ্টিভোগ্যা বিলাসিনী সুন্দরী নয়। একেই তো আজকালকার মেয়েরা সিনেমার নটী হবার জন্য মুখিয়ে আছে, তার ওপর যদি আপনারা বরনারীবরণ আরম্ভ করেন তবে সমাজ অধঃপাতে যাবে। আমি আপনাদের সংকল্পিত অনুষ্ঠানে ঘোর আপত্তি জানাচ্ছি।
কপোত গুহর বৃদ্ধা পিসী পাশেই বসে ছিলেন। ইনি বললেন, রাজলক্ষ্মী ঠিক কথা বলেছে। বরনারী টরনারী চলবে না, যত সব ইল্লুতে কাণ্ড।
রাজলক্ষ্মী দেবীর স্বামী কাউনসিলার বামাপদ ঘোষাল একটু পিছনে বসে ছিলেন। ইনি লাজুক লোক, বেশী কথা বলেন না। এখন কর্তব্য বোধে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, বরনারীবরণ আমারও পছন্দ নয়।
সভাপতি বললেন, দুজন সদস্যা আর একজন সদস্য আপত্তি জানিয়েছেন। যদি অন্তত চার আনা সদস্যের অমত থাকে তবে আমরা বরনারীবরণ অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেব। শ্রীযুক্তা রাজলক্ষ্মী দেবী সাহিত্যভাস্বতীর সঙ্গে যাঁরা একমত তাঁরা দয়া করে হাত তুলুন।
রাজলক্ষ্মী, তাঁর স্বামী, আর কপোত গুহর পিসী ছাড়া অন্য কেউ হাত তুললেন না। সভাপতি বললেন, বরনারীবরণে যাদের মত আছে তাঁরা এইবারে হাত তুলুন।
