ক্লাবটি চালাবার ভার যাঁদের উপর তাঁরা পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচিত হন। বর্তমান সভাপতি অনুকূল চৌধুরী একজন মনীষী লেখক ও সুবক্তা, বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা ‘প্রগামিনী’র মালিক ও সম্পাদক। এঁর বয়স এখন পঁয়ষট্টি, আবাল বৃদ্ধবনিতা সকলের সঙ্গেই মিশতে পারেন সেজন্য সকলেরই ইনি প্রিয়। কর্মাধ্যক্ষ দু জন, কপোত গুহ আর সোহনলাল সাহু। কপোত গুহ ব্যারিস্টার, বয়স চল্লিশের নীচে, পসার নেই কিন্তু পৈতৃক টাকা দেদার আছে। সোহনলাল ধনী কারবারী যুবক, বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, খুব শৌখীন, ছাপরার লোক হলেও বাঙালীর সঙ্গেই বেশী মেশেন। ইনি বলেন, বিহার প্রদেশের সমস্তই বাংলার অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার, নতুবা বিহারী কালচারের উন্নতি হবে না।
বিকাল বেলা প্রগামিনী পত্রিকার অফিসে অনুকূল চৌধুরী, কপোত গুহ আর সোহনলাল সাহু সজ্জনসংগতির আগামী অধিবেশন সম্বন্ধে পরামর্শ করছেন। কপোত গুহ একটু চঞ্চল হয়ে বলছিলেন, এ রকম করে চালানো যাবে না দাদা। প্রত্যেক বৈঠকে সেই একঘেয়ে প্রোগাম, ভূপালী বোসের গান, লুলু চ্যাটার্জীর নাচ, দরদী সেনের ন্যাকা ন্যাকা আবৃত্তি, জগাই বারিকের রাসলীলা ব্যাখ্যা, আর শসার স্যাণ্ডউইচ কেক শিঙাড়া সন্দেশ পেস্তা—বাদাম—ভাজা আইসক্রীম চা।
অনুকূল বাবু বললেন, বেশ তো, কি রকম করতে চাও তাই বল না।
সোহনলাল বললেন, গুহ সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেছে দাদা। সেদিন প্রাচী—প্রতীচী সংঘের জয়ন্তী হয়ে গেল, তারা একটি চমৎকার ট্যাবলো দেখিয়েছে। ডলি বাগচীর ক্লিওপেট্রা, পবন ঘোষের অ্যাণ্টনি, আর ইরফান আলীর ঘটোৎকচ দেখে সকলে অবাক হয়ে গেছে। ঘটোৎকচ ক্লিওপেট্রাকে কাঁধে নিয়ে পালাচ্ছে আর অ্যাণ্টনি ভেউ ভেউ করে কাঁদছে। যারা দেখেছে তারা সবাই ধন্য ধন্য করছে।
অনুকূলবাবু বললেন, তোমরাও তো ওইরকম কিছু একটা করতে পার। গজেন গুপ্তকে বললে একদিনের মধ্যে একটা একাঙ্ক নাটক লিখে দেবে।
সোহনলাল বললেন, আমার মতে সিপাহী যুদ্ধের কোনও ঘটনা দেখালে খুব ভাল হবে। এই ধরুন—নানা সাহেব জেনারেল ম্যাকআর্থারকে বন্দী করে এনে নিজের স্ত্রীকে বলছেন, এই ফিরিঙ্গী তোমার জিম্মায় রইল, ফুরসত হলেই একে পাঁচ টুকরো করবে, আমি আবার লড়াইএ চললুম। ম্যাকআর্থার পায়ে পড়ে প্রাণভিক্ষা করলেন। নানী সাহেবার দয়া হল, বললেন, জান নহি লুংগি, সির্ফ নাক কাট দুংগি।
কপোত গুহ ঘাড় নেড়ে বললেন, আমরা কারও নকল করতে চাই না, একেবারে নতুন কিছু দেখাতে চাই। শুনুন দাদা—বিলেতে যেমন মে—কুইন ইলেকশন হয়, আগামী অধিবেশনে আমরা তেমনি উপস্থিত মহিলাগণের একজনকে বসন্তরানী নির্বাচন করব।
—বল কি হে, জষ্টি মাসের গুমোট গরমে বসন্তরানী!
—আচ্ছা, আষাঢ় মাস হতে পারে, তখন গরম কমে যাবে। উপস্থিত মহিলাগণের মধ্যে যিনি সব চেয়ে সুন্দরী তাঁকে আমরা সুন্দরীশ্রেষ্ঠা উপাধি দিয়ে ফুলের মুকুট পরিয়ে দেব, একটি সোনার ঘড়িও উপহার দিতে পারি।
সোহনলাল বললেন, সে খুব ভাল হবে দাদা। খবরটি যদি আগে কাগজে ছাপিয়ে দেওয়া হয় তবে সমস্ত মেম্বার আর মেম্ব্রেসরা তো হাজির হবেনই, বাইরের লোকেও অ্যাডমিশনের জন্য ভিড় করবে। যদি দশ টাকার টিকিট করা হয় তা হলেও বিস্তর লোক তামাশা দেখতে আসবে।
অনুকূলবাবু বললেন, আইডিয়াটা ভাল, কিন্তু সুন্দরীশ্রেষ্ঠা বলা চলবে না, তাতে অনর্থক মনোমালিন্যের সৃষ্টি হবে। সাধারণ লোকে অল্পবয়সী মেয়েদের মধ্যেই সুন্দরী খোঁজে। কিন্তু আমাদের সদস্যারা সকলেই তরুণী নন, অনেকের বয়স হয়েছে অথচ রূপের খ্যাতি আছে। এইসব হোমরাচোমরা ফ্যাট ফেয়ার অ্যাণ্ড ফর্টি বা ফর্টি—উত্তীর্ণা। মহিলারা যদি দেখেন যে তাঁদের কোনও আশা নেই তবে ভীষণ চটে যাবেন, চাই কি ক্লাবের সম্পর্ক ত্যাগ করতে পারেন। তা হলে তো সজ্জনসংগতি উঠে যাবে।
কপোত গুহ চিন্তিত হয়ে বললেন, ভাবিয়ে তুললেন দাদা, আপনার কি অসাধারণ দূরদৃষ্টি! সুন্দরীশ্রেষ্ঠা নির্বাচন—এ কথা বললে সিচুয়েশন একটু ডেলিকেট হবে বটে। কি বললে ভাল হয় আপনিই স্থির করুন।
অনুকূলবাবু বললেন, বরনারীবরণ মন্দ হবে না। যুবতী প্রৌঢ়া বৃদ্ধা কারও বরনারী হতে বাধা নেই। ফুলের মুকুট আর ঘড়ি না দেওয়াই ভাল, একটা জাঁকালো বরমাল্য দিলেই চলবে।
সোহনলাল বললেন, বরনারী ইলেকশন কি রকম হবে? আমার মতে সিক্রেট ব্যালটের ব্যবস্থা করা দরকার, তা হলে সকলেই চক্ষুলজ্জা ত্যাগ করে ভোট দিতে পারবে।
অনুকূলবাবু বললেন, তাতে জনমতের নির্ধারণ হবে বটে, কিন্তু তার পরিণামটা ভেবে দেখেছ? তারক মল্লিকের মেয়ে কিরণশশী—আজকাল যে হ্লাদিনী দেবী নাম নিয়ে গৌড়ীয় লাস্যনৃত্যম দেখাচ্ছে—সেই সব চেয়ে বেশী ভোট পাবে। তার পরেই বোধ হয় সুরেন ভৌমিকের গুজরাটী স্ত্রী কলাবতী ভৌমিক কিংবা আমাদের ডকটর নিয়োগীর স্ত্রী বঞ্জুলা নিয়োগীর চান্স। ভোটে যেই জিতুক, সদস্যারা সবাই তাঁদের স্বামীদের ওপর চটবেন, বাড়িতে মুখ হাঁড়ি করে থাকবেন, একটা পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি হবে। আমাদের মেয়েরা এখনও পাশ্চাত্ত্য নারীর উদারতা পায় নি, সবাই শ্রীরাধার মতন জেলাস। তা ছাড়া ব্যালটে বিস্তর সময় লাগবে, লোকের ধৈর্য থাকবে না। ক্লাবের মেম্বাররা আমোদ চায়, ব্যালটের মতন নীরস ব্যাপারে সময় নষ্ট করা পছন্দ করবে না। ব্যালট নয়, সেকালের স্বয়ংবর সভার মতন কিছু করাই ভাল। সভায় যারা উপস্থিত থাকবেন তাঁদেরই একজনকে বরয়িতা বা বিচারক করা হবে। তিনি বরমাল্য হাতে নিয়ে সভা পরিক্রমণ করবেন, প্রত্যেক মহিলার চেহারা ঠাউরে দেখবেন, তার পর যাঁকে বরনারী সাব্যস্ত করবেন তাঁর গলায় মালা দেবেন। এতে পারিবারিক অশান্তি হবে না। বরমাল্য যাঁকেই দেওয়া হক, মেয়েরা শুধু বিচারকের ওপর চটবেন, তাঁদের স্বামীদের দোষ ধরবেন না।
