মানুষের শরীরের মধ্যে যেটুকু ফাঁক আছে তাতে একটা আত্মা কোনও গতিকে থাকতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে দুটো আত্মার জায়গা নেই। ঘনশ্যাম ঢুকে পড়ায় গোবর্ধনবাবুর নিজের আত্মাটি কোণঠাসা হয়ে গেল, তাকে দাবিয়ে রেখে ঘনশ্যামের প্রেতাত্মা তারস্বরে বক্তৃতা শুরু করলে।—
ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ আমার বেশী কিছু বলবার নেই। শেষের বেঞ্চের ওই ভদ্রলোকটি যা বলেছেন তা খুব খাঁটি কথা। বদন চৌধুরীকে আমরা বিলক্ষণ জানতুম। যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন সে নিজের ঢাক নিজে পিটেছে। এখন সে মরেছে, তবু আমরা রেহাই পাই নি। তার খোশামুদে আত্মীয়স্বজন তাকে দেবতা বানাবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু এখন আর ধাপ্পাবাজি চলবে না। বদন স্বর্গে যায় নি, নরকেই গেছে। অমন জোচ্চোর ছ্যাঁচড়া হারামজাদা লোক আর হবে না মশাই, কত মক্কেলের সর্বনাশ করেছে, করপোরেশনে আর অ্যাসেমব্লিতে থাকতে হাজার হাজার টাকা ঘুষ খেয়েছে, পারমিটে আর কালোবাজারে লক্ষ লক্ষ টাকা—
বদন চৌধুরী চুপ করে থাকতে পারলেন না। যমদূত কাকজঙ্ঘকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে তিনি অধ্যাপক আঙ্গিরস গাঙ্গুলীর শরীরে ভর করলেন। দ্বিতীয় মাইকটা টেনে নিয়ে চিৎকার করে বললেন, আপনারা বুঝতেই পারছেন যে আমাদের মাননীয় সভাপতি মশাই প্রকৃতিস্থ হয়ে নেই। যে লোকটা পুণ্যশ্লোক রাজর্ষি বদনচন্দ্রের ঘোর শত্রু ছিল, সেই নটোরিয়স কাগজী গুণ্ডা কালকেতু—সম্পাদক ঘনা ঘোষালের প্রেতই সভাপতির ঘাড়ে চেপেছে এবং এই অসহায় গোবেচারা ভদ্রলোকের মুখ দিয়ে অশ্রাব্য কথা বলছে—
সভাপতির জবানিতে ঘনশ্যাম বললেন, একেবারে ডাহা মিথ্যে কথা। সেই বজ্জাত বদনার ভূতই আমাদের শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আঙ্গিরস গাঙ্গুলী মশাইকে কাবু করে যা তা বলছে—
আঙ্গিরস গাঙ্গুলীর মারফত বদন চৌধুরী বললেন, আপনারা কি সেই ব্লাকমেলার শয়তান ঘনা ঘোষালকে ভুলে গেলেন? ব্যাটা টাকা খেয়ে তার কাগজে কালোবাজারী চোরদের প্রশংসা ছাপত, টাকা না পেলে গাল দিত। মন্ত্রীদের ভয় দেখিয়ে সে নিজের ওয়ার্থলেস ছেলে মেয়ে শালা শালীদের জন্যে ভাল ভাল চাকরি যোগাড় করেছিল। স্বর্গত মহাত্মা বদন চৌধুরী তাকে ঘুষ দেন নি সেই রাগে ঘনা ঘোষালের ভূত আজ নরককুণ্ডু থেকে উঠে এসে এখানে কুৎসা রটাচ্ছে। ওর দুর্গন্ধে সভা ভরে গেছে, টের পাচ্ছেন না? ভূতের কথায় কান দেবেন না আপনারা।
সভায় তুমুল কোলাহল উঠল। একজন ষণ্ডা গোছের লোক একটা চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে বললে, ভূত টুত গ্রাহ্য করি না মশাই, আমার নাম রামলাল সিংগি। ভূত আমার সম্বন্ধী, শাঁকচুন্নী আমার শাশুড়ী। আসল কথা কি জানেন—আমাদের গোবর্ধনবাবু আর আঙ্গিরসবাবু খুব মহাশয় লোক, কিন্তু দুজনেই বেশ টেনে এসেছেন, নেশায় চুচ্চুরে হয়ে বক্তিমে করছেন। বদন চৌধুরী মরেছে, সবাই মিলে শোকসভা করছিস, এ বহুত আচ্ছা। তোরা গান শুনবি, নাচ দেখবি, দুটো হা—হুতোশ করবি, বুক চাপড়ে কেঁদে ভাসিয়ে দিবি, আউর ভি আচ্ছা। কিন্তু একি কাণ্ড, দু’ হাজার লোকের সামনে মাতলামি করছিস! আরে ছ্যা, ছ্যা। আমরা যা করি নিজের আড্ডায় করি, সভায় দাঁড়িয়ে এমন বেলেল্লাপনা করি না। হাঁ মশাই, হক কথা বলব।
এই সময়ে দুই যমদূত গোবর্ধন মিত্র আর আঙ্গিরস গাঙ্গুলীর কানে কানে বললে, বেরিয়ে এস শীগগির, দু ঘণ্টা কাবার হয়েছে। দুই প্রেতাত্মা সুড়ুৎ করে বেরিয়ে এল, যমদূতরা তখনই তাদের নিয়ে উধাও হল।
শরীর থেকে প্রেত নিষ্ক্রান্ত হওয়া মাত্র গোবর্ধনবাবু আর আঙ্গিরসবাবু মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন। ভাগ্যক্রমে একজন ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন, তাঁর চেষ্টায় এঁরা শীঘ্রই চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। ডাক্তার বললেন, এই দুটো গেলাসের শরবৎ এঁরা খেয়েছিলেন। টেস্ট করা দরকার, নিশ্চয় কোনও বদ লোক ভাঙ কিংবা ধুতরো মিশিয়ে দিয়েছিল।
প্রেততত্ত্ববিশারদ হারাধন দত্ত ঘাড় নেড়ে বললেন, উঁহু, সিদ্ধি গাঁজা ধুতরো নয়, মদও নয়, ওসব আমার ঢের পরীক্ষা করা আছে। এ হল আসল ভৌতিক ব্যাপার মশাই, আজ আপনারা স্বকর্ণে দুই প্রেতের ঝগড়া শুনেছেন। এর ফল বড় খারাপ, বাড়ি গিয়ে কানে একটু তুলসীপাতার রস দেবেন।
সভা ভেঙে গেল।
১৩৫৯ (১৯৫২)
বরনারীবরণ
সজ্জনসংগতির নাম আপনারা নিশ্চয় শুনেছেন। খবরের কাগজে যাঁদের ওয়াকিফহাল মহল বলা হয় তাঁরা সকলেই একমত যে এর মতন উঁচুদরের অভিজাত ক্লাব কলকাতায় আর নেই। নামটি মোহমুদগর থেকে নেওয়া বটে, কিন্তু এখানে এর মানে সাধুসঙ্গ নয়। সজ্জনসংগতি—কিনা শিক্ষিত শৌখিন নরনারীর মিলনস্থান। আপনি যদি আধুনিক শ্রেষ্ঠ লেখক চিত্রকর নটনটী গাইয়ে বাজিয়ে নাচিয়ে দেখতে চান তবে এখানে আসতেই হবে। যদি অলট্রামডার্ন ফ্যাশন আর চালচলন শিখতে চান তবে এই ক্লাব ভিন্ন গত্যন্তর নেই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বাৎসরিক চাঁদা নগদ এক শ টাকা। ক জন তা দিতে পারে? চাঁদার টাকা যদি বা যোগাড় করলেন তবু দরজা খোলা পাবেন না। সজ্জনসংগতির সদস্যসংখ্যা ধরাবাঁধা আড়াই শ। যদি একটা পদ খালি হয় এবং অন্তত পঞ্চাশ জন সদস্যের সম্মতি আনতে পারেন তবেই আপনার আশা আছে। কিন্তু যদি আপনার বরাত ভাল হয় তবে সুপারিশের জোরে ক্লাবের কোনও বিশেষ অধিবেশনে আপনি অতিথি হিসাবে বিনা খরচে নিমন্ত্রণ পেয়ে যেতে পারেন।
