—দু বছর হল এখানে এসেছি, রৌরবে থ—বিভাগে আছি। আমার জন্যে কেউ শোকসভা করে নি প্রভু। বন্ধুরা বড়ই নিমক—হারাম, আমার মৃত্যুর পর আমারই ‘কালকেতু’ কাগজে মোটে আধ—কলম ছেপেছিল, একটা ভাল ছবি পর্যন্ত দেয় নি। বদন চৌধুরী আমার বন্ধু ছিলেন, তাঁরই শোকসভায় যাবার জন্য ছুটি চাচ্ছি।
চিত্রগুপ্ত তাঁর খাতা দেখে বললেন, তুমি অতি পাজী প্রেত, যমালয়ে এসেও মিছে কথা বলছ। তোমার কাগজে তো চিরকাল বদন চৌধুরীকে গালাগালি দিয়েছ।
—আজ্ঞে,সম্পাদকের কঠোর কর্তব্য হিসেবে তা করতে হয়েছে। কিন্তু আগে বদনের সঙ্গে আমার খুব হৃদ্যতা ছিল, পরে মনান্তর হয়। এখন মরণের পর শত্রুতার অবসান হয়েছে, মরণান্তানি বৈরাণি, আমরা আবার বন্ধু হয়ে গেছি।
যম চিত্রগুপ্তকে বললেন, যাক গে, দু ঘণ্টার জন্য একেও ছেড়ে দিতে পার। সঙ্গে যেন একটা প্রহরী থাকে।
চিত্রগুপ্তের আদেশে যমদূত ভৃঙ্গরোল ঘনশ্যামের সঙ্গে গেল।
পরলোকগত বদন চৌধুরীর শোকসভায় খুব লোকসমাগম হয়েছে। বেদীর উপরে আছেন সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ রায়বাহাদুর গোবর্ধন মিত্র, তাঁর ডান পাশে আছে প্রধান বক্তা প্রবীণ অধ্যাপক আঙ্গিরস গাঙ্গুলী, বাঁ পাশে আছেন বদনের বন্ধু ও সভার আয়োজক ব্যারিস্টার কোকিল সেন। আরও কয়েকজন গণ্যমান্য লোক কাছেই বসেছেন। বক্তাদের জন্য দুটো মাইক্রোফোন খাড়া হয়ে আছে এবং সভার বিভিন্ন স্থানে গোটা কতক লাউড স্পীকার বসানো হয়েছে।
বদন চৌধুরী তাঁর রক্ষী যমদূতের সঙ্গে বেদীর উপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঘনশ্যাম ঘোষালকে দেখে বললেন, তুমি কি মতলবে এখানে এসেছ? সভা পণ্ড করতে চাও নাকি?
ঘনশ্যাম বললে, আরে না না, পণ্ড করব কেন, তুমি হলে আমার পুরনো বন্ধু। তোমার গুণকীর্তন শুনে প্রাণটা ঠাণ্ডা করতে এসেছি। যমরাজ আজ খুব সদয় দেখছি, দু—দুটো নারকীকে ছুটি দিয়েছেন।
প্রধান বক্তা আঙ্গিরস গাঙ্গুলীর পিছনে বদন চৌধুরী এবং সভাপতি গোবর্ধন মিত্রের পিছনে ঘনশ্যাম ঘোষাল দাঁড়ালেন। দুই যমদূত নিজের নিজের বন্দীর কাঁধে হাত দিয়ে রইল। সভার কোনও লোক এই চার জনের অস্তিত্ব টের পেলে না।
প্রথমেই শ্রীযুক্তা ভূপালী বসুর পরিচালনায় সংগীত হল।—আজি স্মরণ করি পুণ্য চরিত বদনচন্দ্র চৌধুরীর সেই স্বর্গত রাজর্ষির; লোকমান্য অগ্রগণ্য কর্মযোগী ধর্মবীর।…ইত্যাদি। গান থামলে বাঁশি আর মাদলের করুণ সংগত সহযোগে কুমারী লুলু চ্যাটার্জি একটি সময়োচিত শোকনৃত্য নাচলেন। তার পর সভাপতির আজ্ঞাক্রমে অধ্যাপক আঙ্গিরস গাঙ্গুলী মৃত মহাত্মার কীর্তিকথা সবিস্তারে বলতে লাগলেন—
আজ যাঁর স্মৃতিতর্পণের জন্য আমরা এখানে এসেছি তিনি আমাদের শোকসাগরে নিমজ্জিত করে দিব্যধামে গেছেন, কিন্তু আমি স্পষ্ট অনুভব করছি যে তাঁর আত্মা এই সভায় উপস্থিত থেকে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি গ্রহণ করছেন। স্বর্গত বদনচন্দ্র চৌধুরী আকারে চরিত্রে কর্মে ধর্মে এক লোকোত্তর মহীয়ান পুরুষ ছিলেন। তাঁর এই তৈলচিত্রের দিকে চেয়ে দেখুন, কি বিরাট সৌম্য মূর্তি নিবিড় শ্যামবর্ণ শালপ্রাংশু বিশাল বপু, পদ্মপলাশ নেত্র, আবক্ষ লম্বিত শ্মশ্রু। তিনি একাধারে কর্মযোগী ধর্মযোগী আর জ্ঞানযোগী ছিলেন, যেমন উপার্জন করেছেন তেমনি বহুবিধ সৎকার্যে ব্যয়ও করেছেন। এক কথায় তিনি যে একজন খাঁটি রাজর্ষি ছিলেন তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আশা করি তাঁর উপযুক্ত পুত্রগণ তাঁদের পুণ্যশ্লোক পিতৃদেবের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন।…এই রকম বিস্তর কথা আঙ্গিরসবাবু এক ঘন্টা ধরে শোনালেন।
ঘনশ্যাম জনান্তিকে বললেন, আহা, কানে যেন মধু ঢেলে দিলে, নয় হে বদন?
তার পর একজন তরুণ কবি একটি গদ্য কবিতা পাঠ করলেন।
—আকাশের গায়ে সোনালী আঁচড়। কিসের দাগ ওটা? দিব্যরথের টায়ারের কর্ষণ। ওই সড়কে বদনচন্দ্র দেবযানে গেছেন। কে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে? উর্বশী না আফ্রোদিতি?…ইত্যাদি।
আরও কয়েকজন বক্তৃতা দেবার পর ব্যারিস্টার কোকিল সেন দাঁড়ালেন। পূর্বের বক্তারা যেটুকু বাকী রেখেছিলেন তা নিঃশেষে বিবৃত করে ইনি বললেন, আমি প্রস্তাব করছি, সেই স্বর্গগত মহাপুরুষের একটি মর্মরমূর্তি দেশবন্ধু বা দেশপ্রিয় পার্কে স্থাপন করা হক, এবং তদুদ্দেশ্যে চাঁদা তোলা আর অন্যান্য ব্যবস্থার জন্য অমুক অমুক অমুককে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হক।
পিছনের বেঞ্চ থেকে একজন শ্রোতা বললেন, বদন চৌধুরীকে আমরা বিলক্ষণ জানতুম। মরা মানুষের নিন্দে করতে চাই না, কিন্তু তাঁর মূর্তির জন্য আমরা কেউ এক পয়সা চাঁদা দেব না।
সভায় হাততালি হল, প্রথমে অল্প, যেন ভয়ে ভয়ে, তার পর খুব জোরে। গোলমাল থামলে কোকিল সেন বললেন, আমরা অশ্রদ্ধার দান চাই না, মৃত মহাপুরুষের পুত্রগণই সব খরচ দেবেন। বেদীর উপর থেকে একজন আস্তে আস্তে বললেন, হিয়ার হিয়ার।
অতঃপর সভাপতি গোবর্ধন মিত্রের বক্তৃতার পালা। জজিয়তির সময় তিনি লম্বা লম্বা রায় দিয়েছেন, দু—চারটে ফাঁসির হুকুমও তাঁর মুখ থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু সভায় কিছু বলতে গেলেই তিনি নার্ভাস হয়ে পড়েন। তাঁর বক্তব্য কোকিল সেনই লিখে দিয়েছেন। গোবর্ধনবাবু দাঁড়িয়ে উঠে তাঁর ভাষণটি পড়বার উপক্রম করছেন, এমন সময় হঠাৎ ঘনশ্যাম তড়াক করে লাফিয়ে তাঁর কাঁধে চড়লেন। যমদূত ভৃঙ্গরোল আটকাতে গেল, কিন্তু ঘনশ্যাম নিমেষের মধ্যে গোবর্ধনবাবুর কানের ভিতর দিয়ে তাঁর মরমে প্রবেশ করলেন।
