বটেশ্বর সিকদার প্রতিশ্রুতি পালন করলেন, তাঁর গল্প ‘কে থাকে কে যায়’ মিলানন্তরূপেই সমাপ্ত হল। কিন্তু আট মাস হতে চলল, কদম্বানিলার দেখা নেই কেন? তার ঠিকানাটাও জানেন না যে চিঠি লিখে খবর দেবেন।
সকাল বেলা বটেশ্বর তাঁর নীচের ঘরে বসে নিবিষ্ট হয়ে একটি নূতন গল্প লিখছেন—’মন নিয়ে ছিনিমিনি।’ সহসা একটা চেনা গলার আওয়াজ তাঁর কানে এল—আসতে পারি সিকদার মশাই?
ডাক্তার সঞ্জীব চাটুজ্যে ঘরে প্রবেশ করলেন, তাঁর পিছনে প্রিয়ব্রত রায় এবং একটি অচেনা মেয়ে। সঞ্জীব ডাক্তার বললেন, গুড মর্নিং সার। ওঃ আপনার সেই গল্পটিকে একেবারে মহত্তম অবদান বানিয়েছেন মশাই! একে নিশ্চয় চিনতে পেরেছেন—প্রিয়ব্রত রায়, যাকে আপনি পাগল বলে হাঁকিয়ে দিয়েছিলেন। আর এই দেখুন আপনার অলকা, আপনি যার প্রাণরক্ষা করেছেন।
বটেশ্বরকে প্রণাম করে তাঁর পায়ের কাছে অলকা একটি পাতলা কাগজে মোড়া বড় কৌটো রাখল। সঞ্জীব ডাক্তার বললেন, আপনার জন্যে অলকা নিজের হাতে ছানার মালপো করে এনেছে, খাবেন সার।
হতভম্ব হয়ে বটেশ্বর বললেন, কিছুই তো বুঝতে পারছি না!
—এটা হল আপনার গল্পের সত্যিকার উপসংহার। বুঝিয়ে দিচ্ছি শুনুন।—এই হচ্ছে অলকা প্রিয়ব্রতর স্ত্রী, আমার শালী—মানে আমার স্ত্রীর মাসতুতো বোন। অলকা বছর খানিক স্যানিটোরিয়মে ছিল, বেশ সেরেও উঠেছিল, কুক্ষণে এর হাতে এল ‘প্রগামিণী’ প্রত্রিকা। আপনার গল্প পড়তে পড়তে এর মাথায় এক বেয়াড়া ধারণা এল—গল্পের অলকা যদি বাঁচে তবেই আমি বাঁচব, সে যদি মরে তবে আমিও মরব। আমরা অনেক বোঝালুম, ওসব রাবিশ গল্প পড়ে মাথা খারাপ ক’রো না, তুমি তো সেরেই উঠছ। কিন্তু অলকার বদখেয়াল কিছুতেই দূর হল না, রেগুলার অবসেশন। অগত্যা ওর স্বামী এই প্রিয়ব্রত আপনার দ্বারস্থ হল, আপনি ওকে পাগল বলে হাঁকিয়ে দিলেন। তারপর আমি এসে আপনাকে একটি সারগর্ভ লেকচার দিলুম, আপনি তো চটেই উঠলেন। তখন আমার স্ত্রী বলল, তোমাদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না, যত সব অকম্মার ধাড়ী, আমিই যাচ্ছি, দেখি বুড়োকে বাগ মানাতে পারি কিনা। সে আপনার সঙ্গে দেখা করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে কাজ হাসিল করল। আপনি গল্পের প্লট বদলালেন, অলকাও চটপট সেরে উঠল। এখন কি রকম মুটিয়েছে দেখুন।
বটেশ্বর বললেন, কিন্তু আমার কাছে যিনি এসেছিলেন তিনি তো সিনেমা অভিনেত্রী, কদম্বানিলা চ্যাটার্জি।
—ওর চোদ্দপুরুষ কখনও সিনেমায় নামে নি। ও হল আমার স্ত্রী অনিলা, নাম ভাঁড়িয়ে কদম্বানিলা সেজে আপনাকে ঠকিয়ে গেছে। অতি ধড়িবাজ মহিলা মশাই। যাক, এখন আপনি এই আসল অলকাকে ভাল করে আশীর্বাদ করুন দেখি।—
—হাঁ হাঁ, নিশ্চয় করব। মা অলকা, চিরায়ুষ্মতী হও, সুখে থাক, স্বামীর সোহাগিনী হও, সুসন্তানের জননী হও, লক্ষ্মী তোমার ঘরে অচলা হয়ে থাকুন। আচ্ছা ডাক্তার, সব তো বুঝলুম, কিন্তু আপনার স্ত্রী অনিলা না কদম্বানিলা এলেন না কেন?
—আসবে কি করে মশাই! সে আছে মেটার্নিটি হোমে, তার একটা খোকা হয়েছে, পাক্কা দশ পাউণ্ড ওজন। অনিলা চাঙ্গা হয় উঠুক, তারপর আপনার কাছে এসে ধাপ্পাবাজির জন্যে মাপ চাইবে।
১৮৭৮ শক (১৯৫৬)
বদন চৌধুরীর শোকসভা
বদনচন্দ্র চৌধুরী একজন নবাগত নারকী, সম্প্রতি রৌরবে ভরতি হয়েছেন। যমরাজ আজ নরক পরিদর্শন করে বেড়াচ্ছেন। তাঁকে দেখে বদন হাত জোড় করে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন।
যম বললেন, কি চাই তোমার?
—আজ্ঞে দু ঘণ্টার জন্যে ছুটি ।
—কবে এসেছ এখানে?
—আজ এক মাস হল।
—এর মধ্যেই ছুটি কেন? ছুটি নিয়ে কি করবে?
—আজ্ঞে একবার মর্ত্যলোকে যেতে চাই। আজ বিকেলে পাঁচটার সময় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে আমার জন্যে শোকসভা হবে, বড্ড ইচ্ছে করছে একবার দেখে আসি।
যমালয়ের নিবন্ধক অর্থাৎ রেজিস্ট্রার চিত্রগুপ্ত কাছেই ছিলেন। যম তাঁকে প্রশ্ন করলেন, এই প্রেতটার প্রাক্তন কর্ম কি?
চিত্রগুপ্ত বললেন, এর পূর্বনাম বদনচন্দ্র চৌধুরী, পেশা ছিল ওকালতি তেজারতি আর নানা রকম ব্যবসা। প্রায় দশ বছর করপোরেশনের কাউন্সিলার আর পাঁচ বছর বিধান সভার সদস্য ছিল। এক মাস হল এখানে এসেছে, হরেক রকম বজ্জাতির জন্য হাজার বছর নরকবাসের দণ্ড পেয়েছে। এখন রৌরব নরকে গ—বিভাগে আছে। বর্তমান আচরণ ভালই। ঘণ্টা দুই—এর জন্য ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে। শোকসভায় ওর বন্ধু আর স্তাবকরা কে কি বলে তা শোনবার জন্য আগ্রহ হওয়া ওর পক্ষে স্বাভাবিক।
—ও খবর পেল কি করে যে আজ শোকসভা হবে?
—খবরের অভাব কি ধর্মরাজ, রোজ কত লোক মরছে আর সোজা নরকে চলে আসছে। তাদের কাছে থেকেই খবর পেয়েছে।
যম আজ্ঞা দিলেন, বেশ, দু ঘণ্টার জন্য ওকে ছেড়ে দাও, সঙ্গে একজন প্রহরী থাকে যেন।
চিত্রগুপ্ত হাঁক দিয়ে বললেন, ওহে কাকজঙ্ঘ, তুমি এই পাপীর সঙ্গে মর্ত্যলোকে যাও। দেখো যেন নতুন পাপ কিছু না করে। ঠিক দু ঘণ্টা পরেই ফেরত আনবে।
যে আজ্ঞে বলে যমদূত কাকজঙ্ঘ বদন চৌধুরীর হাত ধরে যমালয় থেকে বেরিয়ে গেল।
অনন্তর যমরাজ অন্য এক মহলে এলেন। তাঁকে দেখে ঘনশ্যাম ঘোষাল কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডবৎ হলেন।
যম বললেন, তোমার আবার কি চাই?
—আজ্ঞে, দু ঘণ্টার জন্যে ছুটি। একবার মর্ত্যলোকে যেতে চাচ্ছি।
—তোমারও শোকসভা হবে নাকি? এখানে এসেছ কবে?
