তিন দিন পরের কথা। বিকেলবেলা দোতলার বারান্দায় বসে বটেশ্বর চুরুট টানছেন। তাঁর বাতের বেদনাটা বেড়ে উঠেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামাওঠায় কষ্ট হয়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে গৃহিণী কাশীপুরে তাঁর ছোট বোনের বাড়ি বেড়াতে গেছেন। বটেশ্বরের কোথাও যাবার জো নেই, কথা কইবার লোকও নেই। তাঁর অনুরক্ত বন্ধুদের কেউ যদি এখন এসে পড়েন তো তিনি খুশী হন।
চাকর এসে খবর দিল, একজন মহিলা দেখা করতে এসেছেন। বটেশ্বর বললেন, এখানে নিয়ে আয়।
একটি সুবেশা চব্বিশ—পঁচিশ বছরের মেয়ে তার কাছে এল, একটু মোটা হলেও বেশ সুন্দরী বটে। সে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে পায়ে হাত দিলে। বটেশ্বর বললেন, থাক, থাক, ওই হয়েছে। কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
—চিনতে পারছেন না? আমি কদম্বানিলা চ্যাটার্জি, সিনেমার ছবিতে আমাকে দেখেন নি? মধ্যগগনের তারকা না হলেও আমাকে সবাই উদীয়মানা মনে করে।
—বেশ বেশ। সিনেমা বড় একটা দেখি না, খবরও বিশেষ রাখি না। আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন ওই চেয়ারটায়।
—আমাকে ‘আপনি’ বলবেন না সার।
কদম্বানিলা পান চিবুতে চিবুতে কথা বলছিল, সেই বেআদবি দেখে বটেশ্বর একটু অপ্রসন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটির নম্র ব্যবহারে তাঁর বিরাগ কেটে গেল, ভাবলেন, আমার সামনে সিগারেট ফুঁকছে না এই ঢের। প্রশ্ন করলেন, কদম্বানিলা তো ছদ্মনাম, তোমার আসল নামটি কি?
—তা যে বলতে নেই সার। সন্ন্যাসী আর সিনেমা—তারার পূর্বনাম জানানো বারণ, গুরুর নিষেধ থাকে কিনা। কদম্বানিলা বলতে যদি অসুবিধে হয়তো আপনি কদু বলবেন।
—উঁহু, কদু চলবে না, পুরো নামটাই বলব। এখন কি দরকারে এসেছ তা বল।
মাথা পিছনে হেলিয়ে চোখ আধবোজা করে গদগদস্বরে কদম্বানিলা বলল, উঃ কি আশ্চর্য গল্প আপনি লিখেছেন দাদু, ওই ‘প্রগামিণী’ পত্রিকায় যেটি ক্রমশ বেরচ্ছে! সবাই ধন্য ধন্য করছে, বলছে এত বড় সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে এ পর্যন্ত আর হয় নি। আমি একটি প্রস্তাব এনেছি, বিজনেস প্রোপোজাল। এই গল্পটির ছবি অতি চমৎকার হবে। লালা নেবুচাঁদ নাজার দশ লাখ পর্যন্ত খরচ করতে প্রস্তুত আছেন। আপনার নায়িকা অলকার পার্ট আমিই নেব। দেবকী বোস কি অন্য কোনও উপযুক্ত লোককে ডিরেকশনের ভার দেওয়া হবে। তা হাজার দশ টাকা কি আরও বেশী লালাজী আপনাকে দেবেন, আমাকেও মন্দ দেবেন না। এখন আপনি রাজী হলেই হয়।
খুশী হয়ে বটেশ্বর বললেন,তা আমার আর আপত্তি কি, তুমি নায়িকা সাজলে খুব ভালই হবে। কিন্তু গল্পটি শেষ হতে এখনও তো ছ—সাত মাস লাগবে।
—তার জন্যে ভাববেন না দাদু। আমারও এখন অনেক এনগেজমেণ্ট, সাত মাস আমি বোম্বাইএ ব্যস্ত থাকব, নেবুচাঁদজীও থাকবেন। তিনি এখন শুধু আপনার মতটি জানতে চান, পাকা কথাবার্তা সাত মাস পরেই হবে। কিন্তু এর মধ্যে আপনি আর কাউকে কথা দিয়ে ফেলবেন না যেন।
—না, না, তা কেন দেব।
—আপনি দেখে নেবেন, আমার অভিনয় কি ওআণ্ডারফুল হবে, আপনার ওই অলকাকে আমার খুব ভাল লেগেছে কিনা। উঃ ছবির শেষে অলকা যখন বেশ মোটাসোটা হয়ে তার তিন মাসের খোকাটিকে কোলে নিয়ে পর্দায় দেখা দেবে তখন হাততালিতে হাউস একেবারে ফেটে পড়বে, আর আপনি উপস্থিত থাকলে লোকে আপনাকে কাঁধে তুলে নাচবে।
বটেশ্বর ত্রস্ত হয়ে বললেন, এই মাটি করলে, সব শেয়ালের এক রা! আমাকে পাগল না করে তোমরা ছাড়বে না দেখছি। শোন কদম্বানিলা, আমার গল্পটি বিয়োগান্ত, অলকা মরবে, দু বছর পরে তার স্বামী হেমন্তর সঙ্গে শর্বরীর বিয়ে হবে।
চমকে উঠে চোখ কপালে তুলে কদম্বানিলা বলল, অ্যাঁ, অলকাকে মারবেন! তবে আমি ওতে নেই, ও আমি পারব না।
—নিশ্চয় পারবে, ট্রাজেডির নায়িকা সেজেও তো চমৎকার অভিনয় করা যায়।
—তা হতেই পারে না, মরতে আমি মোটেই রাজী নই, অলকা সেজেও নয়। আপনি সব মাটি করে দিলেন দাদু, মিছেই এখানে এসে আপনাকে বিরক্ত করলুম। তা হলে চললুম, গল্পসরস্বতী দামোদর নশকরের সঙ্গে কথা বলি গিয়ে তাঁর ‘মানস—মরালী’ উপন্যাসটি অপূর্ব হয়েছে, তার নায়িকা মঞ্জুলার পার্টটিও আমার বেশ পছন্দ।
বটেশ্বর চঞ্চল হয়ে উঠলেন। দিন কতক আগে ‘দুন্দুভি’ পত্রিকায় একটা গণ্ডমূর্খ সমালোচক লিখেছিল—দামোদর নশকরের গল্প যুগচেতনা সমাজচেতনা যৌনচেতনায় পরিপূর্ণ, বটেশ্বর সিকদারের রচনা একেবারে অচেতন, শুধু চর্বিতচর্বণ। এই সমালোচনা পড়ার পর থেকে দামোদরের নাম শুনলে বটেশ্বর খেপে ওঠেন। উত্তেজিত হয়ে হাত নেড়ে বললেন, খবরদার ওটার কাছে যেয়ো না। অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন দু দিন সময় আমাকে দাও, ভেবে দেখি অলকাকে বাঁচিয়ে গল্পটি মিলনান্ত করা চলে কিনা।
—ভাবনার যে সময় নেই দাদু। কালই আমি বোম্বাই চলে যাচ্ছি, আজকের মধ্যেই একটা হেস্তনেস্ত করে নেবুচাঁদজীকে জানাতে হবে।
গালে হাত দিয়ে একটু ভেবে বটেশ্বর বললেন, আচ্ছা আচ্ছা, অলকাকে বাঁচিয়েই রাখব, শর্বরীই না হয় মরবে। অন্য কারও কাছে তোমাকে যেতে হবে না। জান কদম্বানিলা, আমরা গল্পলিখিয়েরা হচ্ছি সর্বশক্তিমান, কলমের খোঁচায় সৃষ্টি স্থিতি লয় করতে পারি।
কদম্বানিলা উৎফুল্ল হয়ে বলল, থ্যাংক ইউ দাদু, এই তো লক্ষ্মী ছেলের মতন কথা। দিন পায়ের ধুলো। গল্পটি কিন্তু বেশ ভাল করে শেষ করতে হবে, শেষ দৃশ্যে ছেলে কোলে করে অলকার আসা চাই। এখন চললুম, নেবুচাঁদজীকে সুখবরটা দিইগে।
