কন্দর্প বললেন—অতি পাকা কথা। আচ্ছা, এইবার ওই সুদূর নৈমিষারণ্যে দৃষ্টি নিক্ষেপ কর।
ভুণ্ডিল তাই করলেন। আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন—আহা, কি দেখলুম!
কি দেখলে?
তিনটি পরমাসুন্দরী তরুণী গোমতীসলিলে স্নান করছে।
প্রাণে পুলক জাগছে?
জাগছে।
হিয়ায় হিল্লোল উঠছে?
উঠছে।
চিত্ত চুলবুল করছে?
করছে।
চিংড়ি বললে—’মামা, এইখানটা ভারী গ্র্যাণ্ড লিখেছ কিন্তু।’
‘হুঁ হুঁ, এখনই হয়েছে কি। পরে দেখবি আরও মধুর, আরও মর্মস্পর্শী। তারপর শোন।—
কন্দর্প বললেন—ভুণ্ডিল।
আজ্ঞে।
কোনটিকে পছন্দ হয়।
ঠিক করতে পারছি না যে।
আচ্ছা, ওই যেটি তন্বী, দীর্ঘকায়, পদ্মকোরকবর্ণা, রাজহংসীর মতন যার গলা?
অতি সুন্দর।
আর যেটি সুমধ্যমা, চম্পকগৌরী, মদমুকুলিতাক্ষী, দোহারা গড়ন, টুকটুকে ঠোঁট?
চমৎকার।
আর ওই বেঁটেটি, শ্যামাঙ্গী, চঞ্চলা, চকিতমৃগনয়না, বেশ মোটা—সোটা, টেবো টেবো গাল?
ওটিও খাসা।
ব’লে ফেল কোনটিকে চাও।
আজ্ঞে তিনটিকেই।
কন্দর্প ভুণ্ডিলের পিঠ চাপড়ে বললেন—সাধু ভুণ্ডিল—সাধু। তবে আর দেরি ক’রো না, সোজা নৈমিষারণ্যে চ’লে যাও, গোমতীর তীরে বসে তোমার ওই বাঁশিটি বাজাও গে।
সমিতা জমিতা আর তমিতা বিকেলবেলা গোমতীর ধারে ব’সে নৈমিষারণ্যের বিখ্যাত চিঁড়েভাজা খাচ্ছে। হঠাৎ একটা করুণ বেসুরো বাঁশির আওয়াজ কানে এল। সমিতা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেল একটি লোক কশ্যপ—ঘাটে ব’সে তাদের দিকে চেয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে।
সমিতা বললে—কে ওই তরুণ? আগে তো দেখি নি কখনও।
জমিতা বললে—কেন বাঁশি বাজাচ্ছে কে জানে। কেমন যেন উদাস সুর।
তমিতা বললে—সুন্দর চেহারাটি কিন্তু।
সমিতা বললে—তোর হারিত—দার চেয়েও সুন্দর?
তমিতা ভ্রূভঙ্গী করে বললে—কি যে বলিস! হারিত—দা জারিত—দা লারিত দার চাইতে বুঝি কারও সুন্দর হ’তে নেই!
মেয়েরা অন্যমনস্ক হয়ে আড়চোখে দেখতে লাগল। —’আচ্ছা চিংড়ি, আড়চোখে চাওয়া কি রকম করে আঁকতে হয় জানিস?’
চিংড়ি বললে—’খুব সোজা। একটা আন্ডার মতন আঁক। মাথায় ইচ্ছেমত চুল বসাও। কপালে নিরেনব্বই লেখ, তার নীচে একটা কাত—করা বিসর্গ, তার নীচে একটা পাঁচ। যদি দাঁত দেখাতে চাও তবে চুয়াল্লিশ বসাও। আর যদি মোনা—লিসার ধরনের নিগূঢ় হাসি ফোটাতে চাও তবে আট লেখ।’
‘বাঃ ঠিক হয়েছে। পাঁচ নম্বর চিত্র দেখ। তার পর শোন।’
একটি বৎসর দেখতে দেখতে কেটে গেল। হারিত জারিত আর লারিত প্রায়শ্চিত্ত শেষ করে তীব্র আশা আর দারুণ উৎকন্ঠা নিয়ে নৈমিষারণ্যে ফিরে এল। মেয়েদের সংবাদ কি? তারা কি এখনও নিজেদের গোঁ বজায় রেখেছে? এই বৎসরব্যাপী বিচ্ছেদের ফলে তারা কি প্রেমের সোজা পথটি খুঁজে পায় নি, মনে একটুও প্রতিদানস্পৃহা জাগে নি? হবেও বা।
কিন্তু খবর যা শুনলে তা মর্মান্তিক। সমিতা জমিতা তমিতা তিনজনেই ভুণ্ডিলকে মাল্যদান করেছে। হা রে কন্দর্প, এই কি তোর মনে ছিল? প্রেম—চক্রে বৃথাই এতদিন ঘুরপাক খাওয়ালি? হায় হায়, কেন তারা মেয়েদের মতেই সায় দেয়নি, সে তো মন্দের ভাল ছিল। আর মেয়ে তিনটেরও ধন্য রুচি, শেষে কিনা ভুণ্ডিল!
হারিত মাথা চাপড়ে বললে—ওঃ, স্ত্রীচরিত্র কি কুটিল! ওদের কিসসু বিশ্বাস নেই।
জারিত হাত নেড়ে বললে—একেবারে যাসসেতাই।
লারিত দাড়ি ছিঁড়ে বললে—তিনটি বসসর নাহক ভুগিয়েছে মশাই।
তিন উদ্দাম প্রেমিক উর্ধ্বশ্বাসে ছুটল ভুন্ডিলের বাড়ি। ব্যাটাকে ঠেঙিয়ে মনের জ্বালা দূর ক’রতে হবে, তাতে মহামুনি ঔড়ব ভস্মই করুন আর তির্যগযোনিতেই পাঠান।
ভুণ্ডিলের কুটীরে কেউ নেই, শুধু প্রাঙ্গণে একটি আশ্রম—ব্যাঘ্রী তৃণভোজন করছে আর তিনটি হরিণশিশু তার স্তন্য পান করছে। এই স্নিগ্ধ শান্ত আশ্রম—সুলভ দৃশ্য দেখে ঋষিকুমারদের হুঁশ হল, অহিংসার কাছে কিছু নেই। হারিত ব্যঘ্রীটিকে একটু আদর ক’রে সঙ্গীদের বললে—যা হবার তা তো হয়ে গেছে, দৈবই সর্বত্র বলবান। কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ। মিথ্যা ঋষিহত্যা ক’রে কি হবে, চল আমরা গোমুখী তীর্থে ফিরে গিয়ে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি।
সংসারে বীতরাগ হয়ে তারা আবার উত্তর মুখে চলল। কিন্তু দৈবের মতলব অন্য রকম। একটু যেতে না যেতে তারা দেখতে পেলে বটগাছের তলায় একটি বল্মীকস্তূপ, সমিতা জমিতা আর তমিতা তার উপরে ঝাঁটা চালাচ্ছে।
একটি সলজ্জ ম্লান হাসি হেসে তমিতা বললে—এই যে, আসুন নমস্কার। ভাল আছেন তো? কবে এলেন?
হারিত বললে—ভদ্রে, এ কি?
অবনতমস্তকে সমিতা উত্তর দিলেন—এই উই—ঢিপির মধ্যে আছেন। কাল বিকেল পর্যন্ত বেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন, কত গল্প কত হাসি কত গান। যেমন সূর্যাস্ত হ’ল, অমনি হঠাৎ কেমন একটা কাঁপুনি ধরল, আর চেহারাটাও এক মুহূর্তে বিকট কাল মোটা হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এক রাশ জটা আর মুখভরা বিশ্রী দাঁড়ি—গোঁপ। আমরা তো ভয়ে পালিয়ে গেলুম। তার পর খুঁজে খুঁজে পেলুম এই বটতলায় বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে তপস্যা করছেন। অনেক ডাকাডাকি করতে একবার চোখ মেলে চাইলেন, ধমকে বললেন—খবরদার, ভস্ম ক’রে ফেলব। দেখতে দেখতে সর্বাঙ্গে উই লেগে মাটির প্রলেপ জমে গেল, দেখুন না, একদিনেই আগা—পাস্তলা চাপা পড়ে গেছে। আমরা কি আর করি, তিন জনে ঝাঁটা বুলিয়ে উই তাড়াচ্ছি।
হারিত বললে—না না না, অমন কাজও ক’রো না, তাতে ওঁর তপস্যার হানি হবে। উই অত্যন্ত উপকারী প্রাণী, তপশ্চর্যার একটি প্রধান অঙ্গ, বাহ্য বিষয় বোধ ক’রে মনকে অন্তর্মুখ করতে অমন আর দুটি নেই।
