জারিত বললে—তা ছাড়া, উই—মাটি ভেঙে গিয়ে যদি ভিতরে হাওয়া ঢোকে, তবে চ’টে গিয়ে বিলকুল ভস্ম ক’রে ফেলবেন।
লারিত বললে—ওঃ, কি জোচ্চোর হৃদয়হীন তপস্বী, তিন—তিন তরুণীকে ভাসিয়ে দিলে!
তমিতা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললে—ওগো সেই বাঁশিতেই সর্বনাশ করেছে।
জমিতা গদগদ কণ্ঠে ডাকলে—ও হারিদ্দা জারিদ্দা লারিদ্দা!
হারিত বললে—ভয় কি, আমরা তিন জনেই আছি। ওঁকে আর ঘাঁটিয়ে কাজ নেই, কল্পান্ত পর্যন্ত সমাধিস্থ হয়েই থাকুন। তোমরা আমাদের সঙ্গে হিমালয়ে চল, সেইখানেই আশ্রম নির্মাণ করা যাবে।
কিন্তু আমরা যে সতী, হারিত দা।
আমরাই কোন অসৎ। চল চল, বেলা ব’য়ে যায়।’
বঙ্কা বললে—’থামলে কেন মামা, তার পর?’
‘তার পর আর নেই; তোর মামী আর লিখতে দেয় নি।’
‘আঃ, মামীর যদি কিছু আক্কেল থাকে!’
চিংড়ি বললে—’এ মামীর ভারী অন্যায় কিন্তু। সত্যযুগে কী না হ’তে পারে। আচ্ছা, তোমার তো মনে আছে, শেষটা মুখে মুখেই বল না, আমি লিখে নিচ্ছি।’
‘উঁহু একদম গুলিয়ে গেছে, যে তোর মামীর ধমক।’
বঙ্কা বললে—’তোমার মরাল কারেজ কিচ্ছু নেই! দাও আমাকে, আমিই শেষ ক’রব।’
১৩৩৯ (১৯৩২)
বটেশ্বরের অবদান
বটেশ্বর সিকদার একজন প্রখ্যাত গ্রন্থকার এবং বাণীর একনিষ্ঠ সাধক, অর্থাৎ পেশাদার লেখক। যাঁদের লেখা ছাড়া অন্য কর্ম নেই তাঁদের প্রায় অর্থাভাব দেখা যায়, কিন্তু বটেশ্বর ধনী লোক। এই ব্যতিক্রমের কারণ—তিনি প্রথম শ্রেণীর সাহিত্যিক, শুধু বড় উপন্যাস লেখেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর লেখকদের মতন ছোট গল্প প্রবন্ধ কবিতা রম্যরচনা ভ্রম্যরচনা ইত্যাদি লিখে প্রতিভার অপচয় করেন না। তাঁর কোনও উপন্যাস সাত শ পৃষ্ঠার কম নয় এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা দেশের বুভুক্ষু পাঠক—পাঠিকারা তা গোগ্রাসে পড়ে ফেলেন এবং পরবর্তী রচনার জন্য ব্যগ্র হয়ে প্রতীক্ষা করেন। সম্প্রতি তাঁর পঁয়ষট্টিতম জন্মদিনের উৎসব খুব ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সকালবেলা বটেশ্বর তাঁর সাধনকক্ষে বসে লিখছেন এবং মাঝে মাঝে একটি বড় টিপট থেকে চা ঢেলে খাচ্ছেন, এমন সময় একটি অচেনা যুবক ঘরে এসে ঝুঁকে নমস্কার করে বলল, আমার নাম প্রিয়ব্রত রায়, পাঁচ মিনিট সময় দিতে পারবেন কি?
আগন্তুকের বয়স প্রায় ত্রিশ, সুশ্রী চেহারা, সজ্জায় দারিদ্র্যের লক্ষণ নেই, পারিপাট্যও নেই। বটেশ্বর একাট চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ব’স! নতুন পত্রিকা বার করছ, তার জন্যে আমার লেখা চাও, এই তো? আগেই বলে দিচ্ছি, আমি কল্পতরু নই, যে চাইবে তাকেই লেখা দিতে পারি না। একটা আশীর্বাণী যদি চাও তো দিতে পারি, দশ টাকা লাগবে।
প্রিয়ব্রত বলল, আজ্ঞে, লেখার জন্যে অপনাকে বিরক্ত করতে আসিনি, শুধু একটি কথা জানতে এসেছি। ‘প্রগামিণী’ পত্রিকায় ‘কে থাকে কে যায়’ নামে আপনার যে গল্পটি বার হচ্ছে তা শেষ হতে আর ক—মাস লাগবে, দয়া করে বলবেন কি?
—আরও ছ—সাত মাস লাগবে। কেন বল তো? কেমন লাগছে লেখাটা?
—অতি চমৎকার, সব চরিত্র যেন জীবন্ত। বড্ড কৌতূহল হচ্ছে তাই জানতে এসেছি—গল্পের নায়িকা ওই অলকা মেয়েটি যে টি—বি স্যানিটেরিয়মে আছে, সে সেরে উঠবে তো?
প্রিয়ব্রতর আগ্রহ দেখে বটেশ্বর খুশী হলেন। একটু হেসে বললেন, তা তোমাকে বলব কেন? প্লট আগেই ফাঁস করে দিলে রচনার রসভঙ্গ হয়।
হাত জোড় করে প্রিয়ব্রত বলল, সার দয়া করে অলকাকে বাঁচিয়ে দেবেন।
—তোমার তো বড় অদ্ভুত আবদার হে! গল্পের নায়িকার জন্য এত ভাবনা কেন? লোকে মিলনান্ত বিয়োগান্ত দু রকম গল্পই চায়, তোমার ফরমাশ মতন আমি লিখতে পারি না, মিলনান্ত চাও তো আমার ‘কাড়াকাড়ি’ ‘তেটানা’ এই সব পড়তে পার।
প্রিয়ব্রত করুণ স্বরে বলল, দয়া করুন সার।
—তুমি একটি আস্ত পাগল। এখন যাও, আমার ঢের কাজ। অলকার জন্যে মাথা খারাপ না করে নিজের চিকিৎসা করাও গে, নিশ্চয় তোমার মনের রোগ আছে।
প্রিয়ব্রত বিষণ্ণমুখে মাথা নীচু করে আস্তে আস্তে ঘর থেকে চলে গেল।
রাত সাড়ে নটার সময় বটেশ্বর খেতে যাচ্ছেন এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার ধরে বললেন, কাকে চান?…হাঁ, আমিই বটেশ্বর। আপনি কে?
উত্তর এল—নমস্কার। আমি ডাক্তার সঞ্জীব চাটুজ্যে, আপনার কাছে একটু বিশেষ দরকার আছে। কাল সকাল আটটার সময় যদি যাই আপনার অসুবিধা হবে না তো?
বটেশ্বর বললেন, না না, আপনি আসতে পারেন। কি দরকার বলুন তো?
—সাক্ষাতেই সব বলব সার। আচ্ছা নমস্কার।
ডাক্তার সঞ্জীব চাটুজ্যের নাম বটেশ্বর শুনেছেন। বছর দুই হল বিলাত থেকে ফিরেছেন, বয়স বেশী নয়, খুব নাকি ভাল সার্জন, বেশ পসার হয়েছে।
পরদিন সকালে সঞ্জীব ডাক্তার এসে বললেন, গুড মর্নিং সার, আপনার মহামূল্য সময় আমি নষ্ট করব না, দশ মিনিটের মধ্যেই বক্তব্য শেষ করব। ওঃ, কি আশ্চর্য আপনার ক্ষমতা! ‘প্রগামিণী’ পত্রিকায় ‘কে থাকে কে যায়’ নামে যে গল্পটি লিখছেন তার তুলনা নেই, দেশ সুদ্ধ লোক মুগ্ধ হয়ে গেছে। শরৎ চাটুজ্যে তারাশংকর বনফুল প্রবোধ স্যাণ্ডেল সবাইকে কাত করে দিয়েছেন মশাই।
বটেশ্বর সহাস্যে বললেন, আপনার তো খুব প্র্যাকটিস শুনতে পাই, আমার লেখা পড়বার সময় পান কি করে?
—সময় করে নিতে হয় সার, না পড়লে যে চলে না। সর্বত্র এই গল্পটির কথা শুনি, আমাদের মেডিক্যাল ক্লাবে পর্যন্ত। সেদিন একটি বৃদ্ধ লোকের হার্নিয়া অপারেশন করছি, অ্যানিসথেটিকের ঝোঁকে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন—কি খাসা মেয়ে অলকা, জিতা রহো অলকা! আমার আত্মীয়স্বজন বন্ধুর দল তো আপনার অলকার জন্যে খেপে উঠেছে। ধন্য আপনি! সকলেই বলে, এখনকার সাহিত্যসম্রাট হচ্ছেন শ্রীবটেশ্বর সিকদার, তাঁর কাছে দামোদর নশকর গল্পসরস্বতী দাঁড়াতেই পারেন না। এখন আমার নিবেদন জানাই। আমার বন্ধুবর্গের তরফ থেকে অনুরোধ করতে এসেছি—অলকা মেয়েটিকে চটপট সারিয়ে দিন, সবাই তার জন্য চিন্তিত হয়ে উঠেছে। স্যানিটেরিয়ম থেকে বেশ সুস্থ করে ফিরিয়ে আনুন। একবারে থরো কিওর চাই, বুঝলেন? তার স্বামী হেমন্তর অবস্থা তো বেশ ভালই, অলকাকে নিয়ে সে সিমলা কি উটকামণ্ড চলে যাক, সেখানে তিনটি মাস কাটিয়ে বেশ মোটাসোটা করে ‘ঘরে নিয়ে আসুক।
