জমিতা খুব হিসেবী। বললে—উঁহু। পঞ্চশরের ভস্ম যদি ভুবন—মাঝে ছড়িয়ে পড়ে তবেই চিত্তির, যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতন প্রেম গজিয়ে উঠবে। একেবারে সাবাড় না করলে নিস্তার নেই!
তমিতার উপস্থিত বুদ্ধি সব চেয়ে বেশী। সে বললে—ভগবান রাহুকে ধর, তিনি কপ করে গিলে ফেলুন।
সমিতা আর জমিতা লাফিয়ে উঠে বললে—সেই খাসা হবে। চল এক্ষুনি রাহুর কাছে যাই।
বঙ্কা বললে—’ছাই গল্প হচ্ছে। শাস্ত্রের কথা না—হয় মেনে নিলুম যে রাহু একটা গ্রহ, আকাশে থাকে। কিন্তু মেয়েরা তার কাছে যাবে কি ক’রে? যত সব গাঁজাখুরি।’
চিংড়ি ধমক দিয়ে বললে—’তুমি থাম ছোড়দা। এটা যে সত্যযুগ সে খেয়াল আছে? প’ড়ে যাও মামা।’
রাহু, তখন আকাশে নিরিবিলিতে বসে পাঁজি দেখছিলেন। মেয়েদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন—’কি চাই? চট ক’রে বলে ফেল, আমার সময় বড্ড কম।’
সমিতা হাতজোড় করে বললে—প্রভু, আমরা প্রেমে পড়েছি।
রাহু ফিক করে হেসে বললেন—মাইরি? তা আমাকে কেন। আমি শূন্য পথে ধাই,চাঁদ—সূয্যি খাই, প্রেমের আমি কিবা জানি। দেখছ তো, আমার শুধুই মুণ্ডু, তাতে প্রেম হয় না। প্রেম চাও তো ইন্দ্রাদি দেবতার কাছে যাও, তাঁদের ওই ব্যবসা।
সমিতা নিবেদন করলে—প্রভু, আপনাকে হৃদয় দেব এমন ভাগ্য আমরা করি নি। আমরা মানুষকেই ভালবেসেছি, কিন্তু কন্দর্প সমস্তই ওলটপালট করে দিচ্ছেন। তিনি ধ্বংস না হ’লে আমাদের স্বস্তি নেই। আপনি কৃপা করে তাঁকে গ্রাস করুন।
রাহু মাথা নেড়ে বললেন—সইবে না, সইবে না। চাঁদ পর্যন্ত আমার হজম হয় না, গিলতে না গিলতে বেরিয়ে যায়। কন্দর্প খেলে পেট ফাঁপবে।
তমিতা বললে—পেট তো আপনার দেখছি না।
রাহু ধমকে বললে—’হাঁ, তুই সব জানিস। আধ্যাত্মিক উদর শুনেছিস? আমার তাই।’
জমিতা বললে—প্রভু, তবে আমাদের তিনটিকে ভক্ষণ করুন, বেঁচে আর সুখ নেই।
রাহু একটু বিষণ্ণ হাসি হেসে বললেন—হজমের কি আর শক্তি আছে রে! শুধু লঘুপথ্য খেয়ে বেঁচে আছি, হ’ল একটু চাঁদের কুচি, হ’ল বা গরম গরম এক কামড় সূয্যি। আচ্ছা, কাছে আয়, দেখি একটু তোদের গাল চেটে।
তমিতা বললে—কি যে বলেন!
তবে এলি কি করতে? যা এখন পালা, আমার খাবার লগ্ন হ’ল।
রাহু তাঁর লকলকে গোঁপ দিয়ে খপ করে পূর্ণচন্দ্র ধরলেন, তার পর তাতে একটু মাখন মাখিয়ে কামড় দিলেন। চার নম্বর চিত্র দেখ। মেয়েরা সে করুণ দৃশ্য সইতে পারলে না, ছুটে পালাল।
মহামুনি ঔড়ব হচ্ছেন নৈমিষারণ্যের বড় আশ্রমের কুলপতি। তাঁর দশ হাজার শিষ্য, বিশ হাজার ধেনু। যজ্ঞশালায় রোজ আড়াই—শ মণ নীবার ধানের চাল রান্না হয়, আর তিন—শ ঝুড়ি উড়ুম্বরের তরকারি। ঔড়ব অত্যন্ত রাশভারী ঋষি। আশ্রমবাসীরা তাঁর ভয়ে তটস্থ।
সকালবেলা হারিত জারিত আর লারিত বেদাধ্যয়ন করতে এসেছে। ঔড়ব জলদগম্ভীর স্বরে ডাকলেন—হারিত!
আজ্ঞে।
এসব কি শুনছি? তোমরা নাকি আশ্রমকন্যাদের পিছু পিছু ঘুরে বেড়াও? জান, এটা হচ্ছে তপোবন, ইয়ারকির জায়গা নয়? এখন তোমাদের ব্রহ্মচর্যের সময়, সে খেয়াল আছে?
সত্যযুগে মিথ্যে কথা লোকে বড় একটা কইত না। হারিত হাতজোড় ক’রে স্বীকার করলে—প্রভু, আমরা অপরাধ করেছি।
তবে প্রায়শ্চিত্ত কর। তিনজনে গোমুখী তীর্থে চলে যাও, নিরন্তর গোসেবা, সদ্যোজাত গোময় আহার, কবোষ্ণ গোমূত্র পান, এই ব্যবস্থা। তাতে চিত্তশুদ্ধি পিত্তশুদ্ধি পাপমোচন একযোগে হবে। একটি বৎসর নৈমিষারণ্যের ত্রিসীমানায় এসো না।
হারিত জারিত আর লারিত গুরুদেবের চরণবন্দনা ক’রে বিষণ্ণ মনে বিদায় হ’ল।
একদিন প্রাতঃকালে কন্দর্প হিমালয়ের পাদদেশে কিন্নরমিথুন শিকার করতে গেছেন। ইতস্তত বিচরণ করতে করতে হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল একটা মস্ত উই ঢিবি উঁচু হয়ে রয়েছে, তার উপর পোকা বিজবিজ করছে। কেমন সন্দেহ হ’ল। গোটা দুই বাণের খোঁচা দিতেই পনর ইঞ্চি উই—মাটির স্তর খ’সে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে মানুষের ক্ষীণ কণ্ঠরব শোনা গেল—অহো, কুসুমশর কি দুঃসহ!
কন্দর্প বললে—ভুণ্ডিল মুনির গলা শুনছি না?
বল্মীকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ভুণ্ডিল বললেন—আমার তপস্যা ভঙ্গ করলে কেন হে? ভস্ম ক’রে ফেলব।
কন্দর্প বললেন—আরে দাঁড়াও ঠাকুর, এখন গোসা রাখ। বেজায় কাহিল হয়ে গেছ যে! নাও, এই দিব্য মকরন্দটুকু খেয়ে ফেল। গায়ে বল পাচ্ছ? বেশ বেশ, আর একটু খাও! তারপর, কিসের জন্য তপস্যা হচ্ছিল?
ভুণ্ডিল উত্তর দিলেন—তপস্যা আবার কিসের জন্য করে? মোক্ষলাভের জন্য।
মোক্ষ এখন থাকুক। দিব্যকান্তি চাও? তপ্তকাঞ্চনবর্ণ চাও? রমণীর মন হরণ করতে চাও?
ভুণ্ডিল একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন—কিন্তু তপস্যার কি হবে?
তপস্যা এখন থাক না। দিন—কতক ছুটি নাও, ফুর্তি কর।
ভুণ্ডিল ভেবে দেখলেন, এরকম তো অনেক মহামুনিই ক’রে থাকেন, পরাশর বিশ্বামিত্র ব্যাসদেব। তাতে আর দোষ কি। বললেন—আচ্ছা, রাজী আছি, কিন্তু এক বৎসরের বেশী নয়।
কন্দর্প বললেন—মোটে? বেশ তাই হবে। আমি বর দিচ্ছি, ভুবনমোহন রূপ ধারণ কর। বৎসরান্তে আবার স্বমূর্তি ফিরে পাবে, তখন যত খুশি তপস্যা ক’রো, কেউ বাধা দেবে না।
ভুণ্ডিলের আপাদমস্তকে একটা তারুণ্যের প্লাবন ব’য়ে গেল। কাঁচা—পাকা জটাজুট উড়ে গিয়ে মাথায় ভ্রমরবিনিন্দিত কৃষ্ণ কেশ ঝাঁকড়া—ঝাঁকড়া গজিয়ে উঠল। একটা অদৃশ্য ক্ষুর চরর ক’রে মুখমণ্ডল নির্লোম করে দিলে, রইল শুধু দু’পাশে দুটি কচি কচি জুলপি। ছাতাপড়া নড়া দাঁত খটাখট উপড়ে গিয়ে দু—পাটি দন্তরুচিকৌমুদী ফুটে উঠল। কটিতটে শুভ্র পট্টবাস জড়িয়ে গেল, কাঁধে চড়ল আপীত উত্তরীয়, গলায় মল্লিকার মালা, হাতে মোহন মুরলী, সর্বাঙ্গে দিব্যকান্তির পলেস্তারা। ভুণ্ডিল একটি লম্ফ দিয়ে হুংকার ছেড়ে বললেন—ভো বিশ্বচরাচর শৃন্বন্তু, আমি আছি, তোমরাও আছ, এইবার দেখে নেব।
