চিংড়ি বললেন—’খুব আর্টিস্টিক সাজ। আচ্ছা মামা, স্টেজে ব্রাউন রঙের জর্জেট প’রলে ঠিক বল্কলের মতন দেখাবে না?’
‘নিশ্চয়। তার পর শোন।—ঋষিপত্নীদের সাজও ঐরকম। মাথায় কাপড় টানবার উপায় ছিল না, লজ্জা প্রকাশ করবার দরকার হ’লে কিঞ্চিৎ জিহ্বা প্রদর্শন করতেন। উঁচুদরের মুনিঋষিরা, যাঁরা রাগ—দ্বেষ—শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠতেন, তাঁদের কিছুই দরকার হ’ত না; তবে তাঁরা লোকালয়ে যেতে পারতেন না, কুকুর ঘেউ ঘেউ করত। সাধারণ ঋষির বল্কলই ধারণ করতেন, কিন্তু ছেলে—ছোকরাদের ব্যবস্থা ছিল বেল—কাঠের কৌপীন।’
বঙ্কা বললে—’বেল—কাঠের?’
হাঁ। কর্তারা বলতেন—তোদের এখন ব্রহ্মচর্যের সময়, বেশী বিলাসিতা ভাল নয়। তোরা বেদ পড়বি, ধেনু চরাবি, কাঠ কাটবি, বনে—বাদাড়ে ঘুরে হরদম বল্কল ছিঁড়বি। কাঁহাতক যোগাব? তার চেয়ে কাঠের কৌপীন পরিধান কর, তোদের পুত্রপৌত্রাদিক্রমে টিকবে।’
বঙ্কা বললে—’কিন্তু কাছা দেবে কি ক’রে?’
‘কেন দেবে না? তিন নম্বর চিত্র দেখ।’
চিংড়ি বললে—’ও! রোল—টপ টেবিলের মতন।’
‘ঠিক বুঝেছিস। চিংড়ি, তোর মাথা একদম ক্লিয়ার।’
চিংড়ি বললে—’কিন্তু মামা, তোমার এ গল্প অভিনয় করা চলবে না।’
বঙ্কা বললে—’বেল—কাঠের জন্য ভাবছিস। কিচ্ছু দরকার নেই, জারুল—কাঠ হ’লেও চলবে, ফুট—লাইটে ঠিক বেল—কাঠ ব’লে মনে হবে।’
চিংড়ি বললে—’পড়ে যাও মামা।’
‘জারিত বলছিল—সখা, প্রাণ যে যায়!’
লারিত বললে—তাই তো দেখছি। কি একগুঁয়ে মেয়ে সব! আরে, আমাদের ভালই যদি বাসিস তবে অমন গুলিয়ে ফেললি কেন? কিন্তু একটা কথা না ব’লে থাকতে পারছি না। তমিতার জন্য ম’রে আছি দাদা, কিন্তু জমিতা যে আমাকে চায় তাতে আনন্দও হয়। আহা, যদি দুটিকেই পেতুম।
হারিত ঘাড় নেড়ে বললে—ঠিক, ঠিক! পঞ্চশরের কি বিচিত্র লীলা!
লারিত বললে—আচ্ছা হারিত—দা, ওদের জোর ক’রে ধ’রে নিয়ে গিয়ে রাক্ষস বিবাহ করলে কেমন হয়?
হারিত বললে—দূর বোকা, আমরা যে ঋষির সন্তান। হয় ব্রাহ্মবিবাহ না হয় গান্ধর্ববিবাহ, এ ছাড়া অন্য বিধি নেই। চল, আর একবার ওদের বুঝিয়ে দেখি।
ওদিকে নদীর ধারে পায়চারি করতে করতে জমিতা বলছিল—সখী, যৌবন যে যায়!
তমিতা উত্তর দিলে—যায় যাক গে, তা ব’লে তো দ্বিচারিণী হ’তে পারি না। হৃদয় যাকে চায় না তাকে মাল্যদান ক’রব কি ক’রে? কিন্তু লারিত বেচারার জন্য সত্যি আমার দুঃখ হয়, কেনই বা আমাকে চায় সে!
জমিতা বললে—অতই যদি দরদ তবে গলায় মালা দিলেই পারিস। আমারও এক জ্বালা হয়েছে—কেনই বা মরতে সেদিন বেনারসী বল্কলটা পরেছিলুম, জারিত বেচারার তো দেখে আশ মেটে না। কিন্তু লারিত—দার কোনও পছন্দ নেই, কেমন যেন একরকম।
তমিতা বললে—আহা চটো কেন জমিতা—দি, লারিতকে তো আর কেড়ে নিচ্ছি না। তাকে আজীবন ভাই বলতে পারি, দাদা বলতে পারি, ঠাকুরপো বলতে পারি, কিন্তু প্রাণনাথ বলতে শুধু হারিত—দা।
একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে সমিতা বললে—কিন্তু সে যে আমাকেই চায়। আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেছে।
এমন সময় তিন বন্ধু এসে উপস্থিত। হারিত সম্ভাষণ করলে—কিগো বরবর্ণিনীরা, কি হচ্ছে?
তমিতা একটু জিহ্বাবিলাস ক’রে বললে—এই যে আসুন, নমস্কার।
হারিত বললে—আর কত কাল আমাদের কষ্ট দেবে, দয়া কি হয় না? সমিতে, একবারটি হাঁ বল।
জারিত জড়িত স্বরে বললে—জমিতে, সাড়া দাও।
লারিত হাঁকলে—তমিতে, আমি যে তোমার তরে ম’রে আছি প্রিয়ে।
তমিতা স’রে গিয়ে বললে—ও হারিত—দা, দেখ না কি বলছে!
হারিত বললে—অন্যায় কিছু বলে নি। তুমি লারিতকে ধন্য কর, জমিতা জারিতকে করুক আর সমিতা আমাকে।
সমিতা বললে—সে হ’তেই পারে না। আমরা হৃদয় বিলি ক’রে ফেলেছি, তার আর নড়চড় নেই।
হারিত বললে—একটা রফা করা যায় না? ভগবান কন্দর্পকে না—হয় মধ্যস্থ মানা যাক।
জমিতা আর তমিতা প্রথমটা এ প্রস্তাবে রাজী হ’ল না। কিন্তু সমিতা তাদের বুঝিয়ে দিলে—দেখাই যাক না কন্দর্প কি করেন, আমরা তো নিজেদের মত বদলাচ্ছি না।
কন্দর্প নিকটেই ছিলেন, পাঁচ মিনিট আবাহন করতেই দেখা দিলেন। সব শুনে বললেন—দেখ, এ বিসংবাদ তোমরা নিজেরাই মিটিয়ে ফেল। আমার কি বা ক্ষমতা, শুধু প্রজাপতির আদেশে পঞ্চবাণ মোচন করি। তার আঘাত যদি তোমাদের পছন্দসই না হয় তো আমি নাচার।
লারিত বললে—আপনি প্রেমচক্রে একটা উলটো পাক লাগিয়ে দিন না!
হারিত বললে—দূর গর্দভ, তাতে শুধু উলটো বিপত্তি হবে, প্রেমচক্র দক্ষিণাবর্তে না ঘুরে বামাবর্তে ঘুরবে, আমি চাইব তমিতাকে, তমিতা চাইবে লারিতকে—এই রকম বিপরীত অবস্থা দাঁড়াবে, তাতে কোন পক্ষের মনস্কামনা পূর্ণ হবে না।
সমিতা কন্দর্পকে বললে—আপনি অতি বেয়াড়া লোক, ছটি নিরীহ তরুণ—তরুণীকে খামকা চরকি ঘোরাচ্ছেন। কি সুখ পাচ্ছেন এতে?
জমিতা ঘাড় বেঁকিয়ে বললে—আমরা অভিশাপ দেব কিন্তু, তখন মজা টের পাবেন।
তমিতা কিল তুলে বললেন—লাগাও না দু—চার ঘা লারিত—দা।
বেগতিক দেখে কন্দর্প চট ক’রে স’রে পড়লেন।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে, হারিত বললে,—আজ আমরা বিদায় নি, রাত্রে আবার বৃহদারণ্যক আগাগোড়া মুখস্থ করতে হবে। কাল বিকেলে এসে ফের আমাদের আবেদন জানাব।
ঋষিকুমাররা চলে গেলে সমিতা অনেকক্ষণ ভেবে বললে—দেখ, কন্দর্প বেঁচে থাকতে এই প্রেমচক্রের ঘুরপাক থামবে না। চল, আমরা মহাদেবকে গিয়ে ধরি, তিনি আর একবার মদনভস্ম করুন।
