কিন্তু বঙ্কার তা পছন্দ নয়। বললে—’রাবিশ। ওসব সেকেলে ছড়া একদম চলবে না।’
আমি বললুম—’খুব চলবে। এই কবিতাই কিছু অদলবদল করে দিলে আধুনিক হয়ে দাঁড়াবে। দু—চারটে ভূমা, গোটা—তিন অবদান, একটু রুদ্র শিহরণ একটু রিনকি—ঝিনি—’
বঙ্কা তিড়বিড় ক’রে হাত—পা নেড়ে বললেন—’না না না। ওসব পচা কবিতা একদম চলবে না। মামা, তুমি গল্প লেখ, বেশ ঘোরালো প্লট চাই, শিগগির দিতে হবে কিন্তু।’
বললুম—’আচ্ছা তাই হবে।’
‘ছবিও চাই কিন্তু।’
‘বলিস কি রে! আমার চোদ্দপুরুষ কখনও ছবি আঁকে নি।’
‘বাঃ সেই যে তুমি ঘোষ কোম্পানির আপিসে ছবি আঁকতে?’
কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। চার বার বি.এ. ফেল হবার পর বাবার উপরোধে দিন—কতক এঞ্জিনিয়ার ঘোষ কোম্পানির আপিসে প্ল্যান আঁকা শিখি। কত রকম যন্ত্র, কত রকম রং। আমি মনের সুখে সেট—স্কোয়ার দিয়ে পুকুর আঁকতুম আর কম্পাস দিয়ে চাঁদামাছ আঁকতুম। ঘোষ সাহেব দেখেও দেখতেন না, পিতৃবন্ধু কিনা! বঙ্কা সেই থেকে ঠাউরেছে আমি একজন আর্টিস্ট। তা হোক, একটু চেষ্টা করলে যদি একাধারে লিখিয়ে আর আঁকিয়ে হতে পারি তো মন্দ কি। বঙ্কাকে বললুম—’কাল সন্ধ্যাবেলা আসিস, দেখি কি করতে পারি।’
পরদিন সন্ধ্যা হ’তে না হ’তে বঙ্কা এসে হাজির। সঙ্গে আবার তার ছোটবোন চিংড়িকে এনেছে। সে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, গল্প আর ছবির একজন মস্ত সমঝদার। জিজ্ঞাসা করলুম,—’হাবলা এল না?’
বঙ্কা বললে—’দাদা ভীষণ চটেছে। বললে, দেখি আমাকে বাদ দিয়ে তোদের পত্রিকা কদিন চলে। দাদা ম্যালেরিয়া—বধ কাব্য শুরু করেছে, শ্যাওড়াপুলি—হিতৈষীতে ক্রমশ প্রকাশ্য। যাক, তুমি চটপট পড়ে ফেল মামা। লেখাটা এখনি ছাপাখানায় দিতে হবে, ছবির ব্লক করতে হবে। নাও, আরম্ভ কর।’
আরম্ভ করলুম।—
‘স্থান—নৈমিষারণ্যের ঋষিপাড়া। কাল—সত্যযুগ। পাত্র—তিন ঋষিকুমার, হারিত জারিত আর লারিত। পাত্রী—তিন ঋষিকন্যা, সমিতা জমিতা আর তমিতা।’
বঙ্কা বললে—সত্যযুগে গেলে কেন? আধুনিক হলেই বেশ হত, প্রেমের পথে কোন বাধা পেতে না। যদি বর্তমান যুগধারার সঙ্গে তোমার পরিচয় না থাকে তবে বৌদ্ধ মুঘল আমল চালাতে পারতে।’
বললুম—’তুই কতটুকু খবর রাখিস? যদি হৃদয়ের অবাধ প্রসার আর কল্পনার উদ্দাম প্রবাহ দেখাতে হয় তবে সত্যযুগের প্লট ফাঁদতেই হবে।’
চিংড়ি বললে—’যেমন কচ ও দেবযানী।’
‘ঠিক। চিংড়ি, তুই জানিস দেখছি।’
চিংড়ি খুশী হয়ে উত্তর দিলে—’মামা, তুমি কারও কথা শুনো না, চালাও সত্যযুগ।’
‘চালাবই তো। তারপর শোন।—হারিত ভালবাসে সমিতাকে, কিন্তু সমিতা চায় জারিতকে। আবার জারিত চায় জমিতাকে, অথচ জমিতার টান লারিতের ওপর। আবার লারিত ভালবাসে তমিতাকে, কিন্তু তমিতার হৃদয় হারিতের প্রতি ধাবমান।’
বঙ্কা বললে—’ভয়ংকর গোলমেলে প্লট, মনে রাখা শক্ত।’
‘মোটেই না। এক নম্বর চিত্র দেখ।’
চিংড়ি বললে—’উঃ করেছ কি মামা! এ যে ইটার্নাল ট্র্যাংগলের বাবা, হোপলেস হেক্সাগন! আচ্ছা মামা, মধ্যিখানে এটা কি এঁকেছ, চামচিকে?’
‘চামচিকে নয়, ইনি হচ্ছেন খোদ কন্দর্প। অতনু কিনা, তাই অঙ্গপ্রতঙ্গ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। লেন্স দিয়ে দেখলে টের পাবি ওঁর দুই হাতে দুই ধনুক, তার ছিলের একপ্রান্ত খোলা, তাই দিয়ে ডাইনে বাঁয়ে ওপর নীচে সপাসপ চাবুক লাগাচ্ছেন, আর প্রেমচক্র বন বন ক’রে ঘুরছে।’
চিংড়ি বললে—’বনবন সেকেলে ভাষা। বাঁইবাঁই লেখ, অথবা পাঁইপাঁই।’
‘ঠিক। প্রেমচক্র বাঁইবাঁই অথবা পাঁইপাঁই ক’রে ঘুরছে। এই চক্রের বাইরে আর একটি মূর্তি আছেন, তিনি হলেন ভুণ্ডিল মুনি। ব্রহ্মচর্য শেষ করার পর গৃহী হবার জন্য কিছুদিন চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনও ঋষিকন্যাই একে বিয়ে করতে রাজী হয় নি, কারণ ভুণ্ডিল মুনি যেমন মোটা তেমন গম্ভীর, আর তাঁর বয়স প্রায় চার হাজার বৎসর, অর্থাৎ এই কলিযুগের হিসেবে চল্লিশ। অবশেষে তিনি বুঝলেন যে দৃশ্যমান জগৎটা নিছক মায়া, আর নারী সেই মায়াসমুদ্রের ভুড়ভুড়ি, তাদের আকার আছে, কিন্তু বস্তু নেই। তখন তিনি আশ্রম ত্যাগ ক’রে নিবিড় অরণ্যে গিয়ে নাসিকাগ্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। দু—নম্বর চিত্র দেখ।’
চিংড়ি বললে ‘মামা, এবার আমাদের বার্ষিক উৎসবে তোমার গল্পটা অভিনয় করব। সরসী—দি যদি ভুণ্ডিল মুনি সাজেন, ওঃ কি চমৎকার মানাবে! গোঁফ লাগবে না, শুধু চাট্টি দাড়ি আনলেই চলবে। তারপর প’ড়ে যাও মামা।’
‘একদা বসন্ত সমাগমে যখন বনভূমি রমণীয় হয়ে উঠেছে, অশোক কিংশুক কুরুবক পুন্নাগ প্রভৃতি তরুরাজি পুষ্পভারে নমিত হয়েছে, ভ্রমরের গুঞ্জন আর কোকিলের কূজন বুড়ো বুড়ো তপস্বীদের পর্যন্ত উদব্যস্ত করে তুলেছে, তখন এক মধুর অপরাহ্নে সমিতা জমিতা আর তমিতা তিন সখীতে মিলে গোমতী তীরে বায়ু সেবন করতে করতে মনের কথা আলোচনা করছিল। ঠিক সেই সময়ে হাত তিরিশ পিছনে একটি আম্রকাননের অন্তরালে হারিত জারিত আর লারিত ঘাসের ওপর বসে আড্ডা দিচ্ছিল।’
চিংড়ি বললে—’ঋষিকন্যাদের সাজ কি রকম তা লিখলে না?’
‘হচ্ছে, হচ্ছে। সত্যযুগে বস্ত্র বড়ই দুর্মূল্য ছিল। ঋষিকন্যারা একখানি সাদাসিদে খাপী বল্কল পরিধান করতেন, আর একখানি শৌখিন মিহি বল্কল গায়ে তেড়চা ক’রে বাঁধতেন।’
