কুঞ্জর মা সোজা তাঁর কাছে গিয়ে কান ধরে বললেন, ইষ্টপিট মুখপোড়া বাঁদর! তোর বেতগাছটা কোথা রে?
আমরা বললাম, ওই যে, চেয়ারে ওঁর পাশেই রয়েছে। কুঞ্জর মা কিন্তু আমাদের নিরাশ করলেন। বেতটা বাঁ হাতে নিলেন বটে, কিন্তু লাগালেন না, শুধু ডান হাত দিয়ে মধু মাষ্টারের দাড়ি-ভরা গালে গোটা চারেক থাবড়া লাগালেন। তার পর বেতটা নিয়ে কুঞ্জর হাত ধরে গটগট করে চলে গেলেন।
গোলমাল শুনে মাষ্টাররা সবাই আমাদের ক্লাসে এলেন। হেড মাষ্টার মশাই বললেন, বাড়ি যা তোরা।
পরদিন থেকে মধু মাষ্টার গোবেচারার মতন বিনা বেতেই পড়াতে লাগলেন।
ছ মাস পরেই কুঞ্জর সঙ্গে মধু মাষ্টারের একটা পাকা রকম মিটমাট হয়ে গেল। রেল স্টেশনের মালবাবু যামিনী ঘোষাল ছিলেন কুঞ্জর দূর সম্পকের ভাই, তাঁর সঙ্গে মধু মাষ্টারের বৈমাত্র বোন ভুতির বিয়ে স্থির হল। মধু মাষ্টার যথাসাধ্য আয়োজন করলেন, অনেক লোককে নিমন্ত্রণ করলেন, কিন্তু হঠাৎ সব ওলটপালট হয়ে গেল। বিবাহসভায় সবাই বরের জন্যে অপেক্ষা করছে, এমন সময় বরপক্ষের একজন খবর আনল–যামিনী বলেছে, মধ; চামারের বোনকে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না। কেষ্ট আমাদের চুপিচুপি বলল, কুঞ্জই ভাঙচি দিয়েছে।
বিয়েবাড়িতে প্রচণ্ড হইচই উঠল। মধু মাষ্টারের বিমাতা কুঞ্জর মায়ের পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, রক্ষা কর দিদি, এখন বর কোথায় পাব, তোমার ছেলে কুঞ্জকে আদেশ কর।
কুঞ্জর মা বললেন, নিশ্চয় নিশ্চয়, বামনের জাতধর্ম বাঁচাতে হবে বইকি। এই কুঞ্জ, তোর ময়লা কাপড়টা ছেড়ে এই চেলিটা পর।
কুঞ্জ বলল, ভুতি যে বিচ্ছিরি!
তার মা বললেন, আহা, কি আমার কাত্তিক ছেলে রে! ওঠ বলছি, নয়তো মেরে হাড় গুড়ো করে দেব।
কুঞ্জর বাবা বললেন, ছেলেটার যখন আপত্তি তখন জোর করে বিয়ে দেবার দরকার কি?
কুঞ্জর মা বললেন, যাও যাও, তুমি আবার এর মধ্যে নাক গলাতে এলে কেন?
কুঞ্জ তব, ইতস্তত করছে দেখে কেষ্ট তাকে চুপিচুপি বলল, বিয়েটা করে ফেল কুঞ্জ, অনেক সুবিধে। সোনার আঙটি পাবি, রপোর ঘড়ি আর ঘড়ির চেন পাবি, ক্লাসে প্রমোশনও পেয়ে যাবি। আর, মধু, মাষ্টার মশাই তোর কে হবেন জানিস তো? শালা।
কুঞ্জ আর আপত্তি করে নি।
প্রেমচক্র
‘এখনও বল হাবলা।’
‘হাঁ হাঁ হাঁ, আমি বলছি তুমি ফেলে দাও মামা।’
‘কিন্তু লোকে কি বলবে?’
‘ভালই বলবে।’
‘তোর মামী?’
‘মামী খুশী হবে, তুমি দেখো।’
‘তুই না—হয় একবার ওপরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়।’
‘তা আসছি! তুমি ততক্ষণ বেশ ভিজিয়ে নরম ক’রে রাখ।’
হাবলা ওপরে গেল। আমি বুরুশ ঘষতে লাগলুম। হুকুম এলেই জয়—মা—কালী ব’লে চোপ বসাব।
কিন্তু শুভকর্মে অনেক বাধা। হাবলার ছোট ভাই বঙ্কা ঝড়ের মতন ঘরে ঢুকে বললেন—’ওকি হচ্ছে মামা?’
‘কি আবার হবে, গোঁপটা ফেলে দেব।’
বঙ্কা বললে—’গোঁপ এখন থাকুক। দাও ধাঁ করে একটা গল্প লিখে। একটা মাসিক পত্রিকা বার করেছি—চিরন্তনী।’
‘ক—মাস বার হবে?’
‘চিরকাল। এ পত্রিকা মরবে না, তুমি দেখে নিও। দস্তুরমত এস্টিমেট ক’রে আটঘাট বেঁধে নামা হচ্ছে। পঁচিশজন নামজাদা লেখকের সঙ্গে কনট্রাক্ট করেছি। প্রতি সংখ্যায় উনিশটা গল্প—পাঁচটা সোজা প্রেম, দশটা বাঁকা প্রেম, চারটে লোমহর্ষণ। প্রথম সংখ্যা প্রায় ছাপা হয়ে এল, কেবল শেষ ফর্মার লেখাটা যোগাড় হয়ে ওঠেনি। তাই তোমার শরণাপন্ন হয়েছি। দাও চটপট একটা লিখে।’
‘কেন তোর কনট্রাক্টরদের কাছে যা না।’
‘তাদের খোশামোদ করবার আর সময় নেই, তুমিই একটা লিখে দাও, আজই চাই কিন্তু।’
এমন সময় হাবলা ফিরে এল। মুখখানা হাঁড়ির মতন ক’রে বললে—র্’মামী রাজী নয়।’
‘কি বললে?’
‘বললেন—খবরদার, ঐ তো মুখের ছিরি, গোঁপ ফেললে দেখাবে যা, মরি মরি! মামা, অমন মুষড়ে গেলে চলবে না কিন্তু। প্রতিশোধ নিতে হবে, ভীষণ প্রতিশোধ। আমি বলছি তুমি দাড়ি রাখ, দিব্যি মুখ—ভরা কোমর পর্যন্ত, নিরঞ্জন সিংএর মতন।’
বঙ্কা অস্থির হয়ে বললে—’আঃ কেবল গোঁপ আর দাড়ি। তার চেয়ে ঢের বড় জিনিস সৃষ্টি করবার আছে। মামা, তুমি অন্য চিন্তা ত্যাগ করে গল্প লেখ।’
হাবলা বললে—’তোদের সেই পত্রিকাটার জন্যে বুঝি?’
বঙ্কা জবাব দিল না। সে তার দাদাকে গ্রাহ্য করে না, কারণ হাবলা একটু সেকেলে গোছের, আর বঙ্কা হচ্ছে খাজা—তরুণ।
আমি বললুম—’বঙ্কার পত্রিকায় এক ফর্মা খালি রয়েছে, তুই একটা লিখে দে না হাবলা।’
হাবলা বললে—’কবিতা চায় তো দিতে পারি। পুঁটুর বিয়ের জন্যে একটা লিখেছি, তাই একটু অদলবদল ক’রে দিলে চলবে।’
বিয়ের পদ্যে হাবলার হাত খুব পাকা। তার বন্ধুরা বলে, এ লাইনে ও—ই এখন সম্রাট। হাবলাদের রাবণের বংশ, জেটতুতো খুড়তুতো পিসতুতো মাসতুতো। মামাতোর অন্ত নেই, তার সমস্ত তাল সামলায় শ্রীমান হাবুলচন্দ্র। বছরের মধ্যে গোটা—পাঁচেক হৃদয়বাণী, গণ্ডা দুই মর্মোচ্ছ্বাস, ছ—সাতটা প্রীতি—উপহার তাকে লিখতেই হয়। ভাষা ছন্দ ভাব তিনটেই বেশ স্ট্যাণ্ডারডাইজ ক’রে ফেলেছে। আজি কি সুন্দর প্রভাত, নীল নভে পূর্ণচন্দ্র উঠিছে, মলয় মৃদু হিল্লোলে বহিছে, কুসুম থরে থরে ফুটিছে, হৃদয়ে সাহানা রাগিণী বাজিছে। কেন এ সব হচ্ছে? কারণ, আমাদের স্নেহের পুঁটুরানীর সঙ্গে শ্রীমান চামেলিরঞ্জন বি. এস—সির শুভপরিণয়। অতএব হে বিভু, তুমি প্রচুর মধুলেপন ক’রে এই দুটি তরুণ হিয়া জুড়ে দাও।
