রঘুপতি বললেন, আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। কারও নাম করব না, কিন্তু এই কারখানায় এমন লোক দু—তিন জন আছে যারা খুব নেশা করে, মাইনে পাবার পর তিন—চার দিন বুঁদ হয়ে কামাই করে, শুনেছি স্ত্রীকে মারধরও করে। তাদের তাড়াতে চাও না কেন?
এককড়ি নশকর বলল, সে তো বাবু মদের ঝোঁকে করে, নেশা ছুটে গেলেই আবার যে—কে—সেই সহজ মানুষ। কিন্তু বাড়িতে সতীলক্ষ্মী স্ত্রী থাকতে তার ঘাড়ে একটা সতিন চাপানো যে বারমেসে অষ্টপ্রহর জুলুম।
রঘুপতি বললেন, বেশ, তোমরা সবাই যখন একমত তখন আনন্দকে আমি বলব, আবার একটা বিয়ে করার মতলব ছাড়, না হয় চাকরি ছাড়।
সকলে তুষ্ট হয়ে নিজের নিজের কাজে ফিরে গেল।
যোগেন হাজরা এই কারখানার নকশা—বাবু অর্থাৎ ড্রাফটসম্যান, সে সকলের সব খবর রাখে। রঘুপতি তাকে ডেকে বললেন, ওহে যোগেন, ব্যাপারটা কি? আনন্দ হঠাৎ আর একটা বিয়ে করতে চায় কেন, আর আনন্দর বউ—এর ওপরেই বা কারখানা সুদ্ধ লোকের এত দরদ কেন?
যোগেন বলল, শুনেছি আনন্দের ছেলেবেলায় মা—বাপ মারা গেলে খিদিরপুরের মুকুন্দ মিস্ত্রীই তাকে মানুষ করে। আনন্দর যত কিছু বিদ্যে সব সেই মুকুন্দর কাছে শেখা। বামপন্থী স্ক্রু কাটা, ড্রিল দিয়ে চৌকো ছেঁদা করা, নরম লোহার ওপর কড়া ইস্পাতের ছাল ধরানো, এসব কাজ মুকুন্দর কাছেই আনন্দ শিখেছে, কারখানার আর কেউ এসব পারে না। গুরুর ওপরে আনন্দর ভক্তি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু স্ত্রী থাকতে মুকুন্দর মেয়েকে বিয়ে করবার কি দরকার বুঝি না। হয়তো কিছু গোলমাল আছে, কারখানার কেউ তা জানে না, আনন্দও কিছু ভাঙতে চায় না। আর, আনন্দর বউএর ওপর সকলের দরদ কেন জানেন? খুব পরোপকারী কাজের মেয়ে, যেমন রাঁধিয়ে তেমনি খাটিয়ে, দেখতেও সুশ্রী। এই সেদিন তালের বড়া করে আমাদের সবাইকে খাওয়ালে। বিশ্বকর্মা পূজোর যোগাড় আর তিন—চার শ লোকের ভোজের রান্নাও সে প্রায় একাই করে। কিন্তু ভারী কুঁদুলী। কারিগররা তার ভক্ত বটে, কিন্তু তাদের বউরা তাকে দেখতে পারে না।
—কি রকম ভক্ত তা বুঝি না। আনন্দর চাকরি গেলে তার বউএর তো ক্ষতি হবে।
—কি জানেন? সতীর পুণ্যে পতির স্বর্গবাস, কিন্তু পতির পাপে সতীর সর্বনাশ। তবে এখানকার চাকরি গেলেও আনন্দের কাজের অভাব হবে না।
আনন্দ মণ্ডলকে ডাকিয়ে এনে রঘুপতি বললেন, এসব কি শুনছি হে আনন্দ? তুমি নাকি আর একটা বিয়ে করবে?
মাথা নীচু করে আনন্দ বলল, আজ্ঞে হাঁ।
—সে কি। তোমার স্ত্রী তো খুব ভাল মেয়ে শুনতে পাই, বিনা দোষে তার ঘাড়ে একটা সতিন চাপাবে? এই কুমতলব ছাড়।
—ছাড়বার উপায় নেই বাবু। মুকুন্দ মিস্ত্রী মশায়ের মেয়েকে আমার বিয়ে করতেই হবে?
—মুকুন্দ মিস্ত্রী তোমার বাপের মতন ছিলেন, তাঁর কাছে তুমি কাজ শিখেছ, এসব আমি জানি। কিন্তু তোমার স্ত্রী থাকতে আবার বিয়ে করা অন্যায় নয় কি?
—উপায় নেই বাবু।
—উপায় নেই এ যে বিশ্রী কথা আনন্দ। দেখ, তুমি কাজের লোক, তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়। কিন্তু তোমার কুমতলব শুনে কারখানার সবাই খেপে উঠেছে, তাদের আপত্তি আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না। তুমি আমাকে কথা দাও যে বিয়ে করবে না। তাতে রাজী না হও তো কাজে ইস্তফা দিতে হবে।
—যে আজ্ঞে। আজ মাসের বিশ তারিখ, মাস কাবারের সঙ্গে সঙ্গে কাজ ছেড়ে দেব।
আনন্দ নমস্কার করে চলে গেল।
রঘুপতি রায় কারখানারই এক অংশে বাস করেন। সন্ধ্যাবেলা তিনি বারান্দায় বসে আছেন আর বিষণ্ণ মনে আনন্দের কথা ভাবছেন, এমন সময় বাইসম্যান অনন্ত এসে বলল, সার, আনন্দ মিস্ত্রীর স্ত্রী যশোদা বউদি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।
রঘুপতি বললেন, এখানে নিয়ে এস।
একটি ঘোমটাবতী মেয়ে ভূমিষ্ট হয়ে প্রণাম করল। অনন্ত তাকে বলল, লজ্জা ক’রো না বউদি, যা বলবার বাবু মশায়কে বল।
ঘোমটার ভেতর থেকে তীক্ষ্ন কণ্ঠে যশোদা বলল, এ কেমন ধারা বিচার বাবু মশায়? আমার সোয়ামী দুটো বিয়ে করুক দশটা করুক, সে আমি বুঝব। কারখানার অলপ্পেয়েদের তার জন্যে মাথাব্যথা কেন? মানুষটার কাজে কোন গলদ নেই, আপনি তাকে স্নেহও করেন, তবে কিসের জন্যে তার অন্ন মারবেন? আমরা আট—দশ বছর বরানগরে এই কারখানায় আছি, এ জায়গা ছেড়ে এখন কোথায় যাব?
রঘুপতি বললেন, কারখানা সুদ্ধ লোকের আপত্তি আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না। তাদের রাগ হবারই কথা, তোমার মতন ভাল মেয়ের একটা সতিন আসবে, কারখানার কেউ তা সইতে পারছে না।
ঘোমটা খুলে ফেলে যশোদা হাত নেড়ে বলল, আ মর! সতিন কি কারখানার না আমার? আমার সতিন আমি বুঝব, ঝাঁটাপেটা করে সিধে করে দেব, তোরা হতভাগারা এর মধ্যে আসিস কেন? হাঁ রে অনন্ত, তুইও ওদের দলে নেই তো? কি আমার দরদী লোক সব। আপনি কারু কথা শুনো নি বাবু, মিস্ত্রী যেমন কাজ করছে করুক।
রঘুপতি বিব্রত হয়ে বললেন, তোমার কথা বিবেচনা করে দেখব। আচ্ছা, এখন এস বাছা।
পরদিন সন্ধ্যার সময় অনন্ত রঘুপতির কাছে এসে বলল, মুকুন্দ মিস্ত্রী মশায়ের স্ত্রী আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
রঘুপতি বললেন, তোমার ভাবগতিক তো বুঝতে পারছি না অনন্ত। আনন্দর বিরুদ্ধে তুমিই কাল বলেছিলে, আবার তার স্ত্রীকে নিয়ে আমার কাছে এসেছিলে, আজ আবার মুকুন্দ স্ত্রীর সঙ্গে এসেছ। তোমার ইচ্ছেটা কি?
