হাসির প্রকোপ একটু কমলে নিমাই বললে, হলধর দত্তর ‘চোরে চোরে’ গল্পের চাইতে মজার।
প্রবোধ বললে, যাক, আমরা ঠকি নি, আতার পায়েস খেয়েছি, পেয়ারাও পেয়েছি। কিন্তু ভীমচন্দ্র সেন মশায়ের জন্য দুঃখ হচ্ছে, তাঁর গিন্নী তাঁকে বঞ্চিত করেছেন।
নিমাই বললে, ভাববেন না স্যার, দিন দুই পরেই আবার বিস্তর আতা পাকবে, তখন পায়েস করে ভীমসেন মশায় আর তাঁর গিন্নীকে খাওয়াব।
১৩৬০ (১৯৫৩)
আনন্দ মিস্ত্রী
বিশ্বকর্মা এঞ্জিনিয়রিং ওআর্কসের কর্তা রঘুপতি রায় নিবিষ্ট হয়ে একটি জটিল নকশা পর্যবেক্ষণ করছেন এমন সময় তাঁর কামরার দরজায় মৃদু ধাক্কা পড়ল। রঘুপতি বললেন, আসতে পার।
ফোরম্যান প্রসন্ন সামন্ত দরজা খুলে ঘরে এল। তার পিছনে আরও আট—দশ জন ঠেলাঠেলি করছে দেখে রঘুপতি বললেন, ব্যাপার কি?
প্রসন্ন বলল, আমাদের একটি আরজি আছে বাবু, এরা তাই নিবেদন করতে এসেছেন।
রঘুপতি বললেন, সবাই ভেতরে এস।
চল্লিশ বৎসর আগেকার কথা। এখনকার তুলনায় তখন ধনিক বেশী শোষণ করত, শ্রমিক বেশী শোষিত হত, কিন্তু কর্মী আর কর্মকর্তার মধ্যে হৃদ্যতার অভাব ছিল না। বিশ্বকর্মা কারখানার লোকে বলত, রঘুপতি রায় কড়া মনিব কিন্তু মানুষটা অবুঝ নয়, দয়ামায়া আছে।
কারখানায় নানা বিভাগ থেকে এক—এক জন এসেছে, কেরানী আর কারিগর দুইই উপস্থিত হয়েছে। রঘুপতি প্রশ্ন করলেন, কি চাও তোমরা?
ফোরম্যান প্রসন্ন সামন্ত মুখপাত্র হয়ে এসেছে, কিন্তু সে একটু তোতলা, মাঝে মাঝে কথা আটকে যায়। বাইসম্যান অনন্ত পালকে সামনে ঠেলে দিয়ে প্রসন্ন বলল, তুই বল রে অনন্ত, বেশ গুছিয়ে বলবি।
অনন্তর বয়স বাইশ—তেইশ, ছাত্রবৃত্তি পাস, সুশ্রী চেহারা, ঝাঁকড়া চুল, শখের যাত্রায় নায়ক সাজে, বেহালাও বাজায়। সে নমস্কার করে ঢোক গিলে বলল, আমাদের আরজিটা হচ্ছে সার—আনন্দ মিস্ত্রীকে জবাব দিতে হবে।
রঘুপতি আশ্চর্য হলেন। ফিটার মিস্ত্রী আনন্দ মণ্ডল অতি নিুণ কারিগর, সকল যন্ত্রেই তার সমান হাত, কোন কাজে কিছুমাত্র খুঁত রাখে না। বয়স বত্রিশ—তেত্রিশ, কথা কম বলে, নেশা করে না, অন্য দোষও শোনা যায় না। কারখানার সকলেই তাকে ভালবাসে, কেবল ফোরম্যান প্রসন্ন আর টার্নম্যান এককড়ির তার ওপর একটু ঈর্ষা আছে। আজ দল বেঁধে এতলোক আনন্দকে তাড়াতে চাচ্ছে কেন? রঘুপতি বললেন, তার অপরাধ কি?
একসঙ্গে কয়েকজন বলে উঠল, অতি বদ লোক বাবু, তার সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারব না।
অনন্ত বলল, তোমরা চুপ কর, যা বলবার আমি বলছি। শুনুন সার। আনন্দ মিস্ত্রীর বউ আছে, বুড়ী নয়, কানা খোঁড়া নয়, কুচ্ছিতও নয়, কাজকর্মে তাঁর জুড়ি মেলে না। আমরা তাঁকে বউদিদি বউমা কাকী এই সব বলি। পাঁচ বছরের একটি ছেলে আর দু বছরের একটি মেয়েও আছে। আনন্দ তবু আর একটা বিয়ে করবে। খিদিরপুরের মেকেঞ্জি কোম্পানির কারখানায় মুকুন্দ মিস্ত্রী ছিলেন না? চৌকস কারিগর, খুব নাকডাক। আনন্দ তাঁর কাছে কাজ শিখেছিল। সেই মুকুন্দ ঘোষ মাস খানিক হল মারা গেছেন। তাঁরই মেয়েকে আনন্দ বিয়ে করবে, আসছে মাসেই বিয়ে। সামন্ত মশায় তাকে বিস্তর বুঝিয়েছেন—ছি ছি আনন্দ, এই কুবুদ্ধি ছাড়, তোমার ঘরে অমন সতীলক্ষ্মী রয়েছে, বিনা দোষে তাঁর ঘাড়ে একটা সতিন চাপাতে চাও কেন?
টার্নম্যান এককড়ি নশকর বলল, শুধু সতিন? শুনেছি সতিনের মাকে পর্যন্ত নিজের বাড়িতে এনে রাখবে। আনন্দর মতিচ্ছন্ন হয়েছে, আমাদের কোনও কথা শুনবে না, বিয়ে করবেই। তাই আমরা বললাম, আচ্ছা বিয়ে কর, কিন্তু সতীলক্ষ্মীর মনে যে কষ্ট দিচ্ছ সেই পাপ আমরা সইব না, ম্যানেজার বাবুকে বলে তোমার চাকরিটি মারব। আমাদের এতজনের কথা বাবু কখনও ঠেলবেন না।
রঘুপতি বললেন, আবার একটা বিয়ে করা আনন্দর খুবই অন্যায় হবে। আমি তাকে বোঝাবার চেষ্টা করব। কিন্তু সে যদি আমার কথা না শোনে তবে কি করতে পারি? আনন্দের সঙ্গে আমাদের শুধু কাজের সম্পর্ক, সে দুটো বিয়ে করছে কি চারটে বিয়ে করছে তার বিচারের অধিকার আমার নেই।
পাকা দাড়িওয়ালা টিণ্ডেল দিলাবর হুসেন কারখানার বয়লার—এঞ্জিন চালায়। সে এগিয়ে এসে বলল, এখতিয়ার আপনার জরুর আছে হুজুর, আপনি হলেন আমাদের ওআলিদ মায়—বাপ, আমাদের বেচাল দেখলে আপনি সাজা দেবেন।
রঘুপতি হেসে বললেন, ওহে দিলাবর, তোমাদের সমাজে তো চারটে বিবি ঘরে আনবার ব্যবস্থা আছে, তবে আনন্দর বেলা দোষ ধèছ কেন? হিন্দুমতে শুধু চারটে নয়, যত খুশি বিয়ে করা যেতে পারে।
রং—মিস্ত্রী বেলাত আলী বলল, সে কি একটা কাজের কথা হল বাবু মশায়? যার বিস্তর টাকা সে যত খুশি বিয়ে করলে কসুর হয় না, কিন্তু আমাদের মতন গরিব লোকের একটার বেশী জরু আনা খুব অন্যায়। মুসলমানদের মধ্যেও জাস্তি শাদির রেওয়াজ কমে আসছে। দু—চার জন সেকেলে লোক করছে বটে, কিন্তু হিঁদুর বাড়িতে তো বেশী বউ দেখা যায় না। যাদের যেমন রীতি তাই তো মানতে হবে বাবু। মুসলমান মুরগি খেতে পারে, কিন্তু হিঁদু কেন খাবে। হিঁদু কচ্ছপ খেতে পারে, কিন্তু মুসলমান কেন খাবে?
রঘুপতি বললেন, তোমরা সকলেই কি এই চাও যে আনন্দ যদি আর একটা বিয়ে করে তবে তাকে বরখাস্ত করতেই হবে?
সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, হাঁ, তাই আমরা চাই, অন্যায় আমরা বরদাস্ত করব না।
