অনন্ত বলল, আমার একার ইচ্ছে অনিচ্ছাতে কি হবে সার, কারখানার সকলের যা ইচ্ছে আমারও তাই। তবে কিনা মেয়েদেরও বলবার অধিকার আছে, তাই তাঁদের সঙ্গে আমাকে আসতে হয়েছে।
মুকুন্দ মিস্ত্রীর স্ত্রী সিন্ধুবালা রঘুপতিকে প্রণাম করে বলল, বাবুমশায়, আপনি সব কথা শুনে ন্যায্য বিচার করবেন এ ভরসায় খিদিরপুর থেকে বরানগরে ছুটে এসেছি। ওই যে আপনাদের আনন্দ মণ্ডল, আমার সোয়ামীই ওকে মানুষ করেছেন। মিস্ত্রী মশায় বলতে আনন্দ অজ্ঞান, তাকে গুরুঠাকুরের মতন ভক্তি করত, এখনও করে। ওর যা কিছু বিদ্যে সব কর্তার কাছে শেখা। মারা যাবার সময় তিনি আনন্দকে বলে গেছেন—আনন্দ, আমার পুঁজি তো কিছু নেই, ছেলেটাও লক্ষ্মীছাড়া, কোথায় থাকে কি করে কেউ জানে না। আমি কোম্পানির কোআটারে থাকি, মরবার পর আমার পরিবারের এখানে স্থান হবে না। আমার স্ত্রী আর মেয়ে সুশীলার কি দশা হবে? আনন্দ, তুমি যদি এদের ভার নাও তো আমি নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে পারি। তাই শুনে আনন্দ বলল, মিস্ত্রী মশায়, আপনার পা ছুঁয়ে দিব্যি করছি, আমি এঁদের ভার নিলাম। কর্তা গত হলে আনন্দ আমায় বলল, মা, ভাববেন না, মেয়েকে নিয়ে আমার বাসায় চলে আসুন।
রঘুপতি বললেন, আনন্দ ভালই বলেছ। কিন্তু তার স্ত্রী থাকতে আপনার মেয়েকে বিয়ে করবে কেন? মেয়ের বিয়ে তো অন্য লোকের সঙ্গে দিতে পারেন।
কপাল চাপড়ে সিন্ধুবালা বলল, তা যে হবার জো নেই বাবু, উপায় থাকলে সতিনের ঘরে মেয়ে দেব কেন?
—উপায় নেই কেন?
—আমার মেয়েকে আর কে নেবে বাবা? সে রূপে গুণে লক্ষ্মী কিন্তু বোবাকে কেউ চায় না। ছেলেবেলায় ছ মাস জ্বরে ভোগার পর থেকে সে আর কথা কইতে পারে না।
—ভারী দুঃখের কথা। কিন্তু আনন্দর সঙ্গে তার বিয়ে দেবার দরকার কি? আনন্দর বউ—এর অনিষ্ট কেন করবেন? আপনারা না হয় আনন্দর বাড়িতেই থাকবেন, কিন্তু মেয়ের তো অন্য পাত্র জুটতে পারে। না হয় যোগাড় করতে কিছুদিন দেরি হবে।
—সোমত্ত আইবুড়ো মেয়েকে আনন্দর বাড়িতে রাখলে যে বদনাম হবে বাবা। আমাদের জাতের লোক ভারী নচ্ছার, আনন্দ আমাদের ওখানে আনাগোনা করে তাইতেই আত্মীয় কুটুমরা নানা কথা রটিয়েছে।
রঘুপতি বললেন, আজ আপনি আসুন। আমি একটু ভেবে দেখি, অন্য উপায় হতে পারে কিনা। দু—এক দিনের মধ্যে এই অনন্তকে দিয়ে আপনাকে খবর পাঠাব।
পরদিন রঘুপতির আজ্ঞায় প্রসন্ন সামন্ত সদলে তাঁর কামরায় উপস্থিত হল, আনন্দ মণ্ডলও এল। মুকুন্দ মিস্ত্রীর স্ত্রীর কাছে যা শুনেছেন। সব বিবৃত করে রঘুপতি বলেলেন, আচ্ছা আনন্দ মুকুন্দর মেয়ের জন্যে যদি একটি পাত্র যোগাড় করতে পারি তা হলে কেমন হয়?
আনন্দ বলল, তার চাইতে ভাল কিছুই হতে পারে না বাবু। কিন্তু পাত্র পাবেন কোথায়? মকুন্দ মিস্ত্রী মশায় ঢের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বোবা মেয়েকে কেউ নিতে রাজী হয় নি।
রঘুপতি বললেন, আমার প্রস্তাবটা তোমরা মন দিয়ে শোন। শুনেছি মেয়েটি সুশ্রী, কাজকর্মও সব জানে, শুধু কথা বলতে পারে না। তোমরা সবাই তার জন্যে একটি ভাল পাত্রের সন্ধান কর। যদি এই কারখানায় একটি কাজ দেওয়া হয় আর ভাল যৌতুক দেওয়া হয় তবে পাত্র পাওয়া অসম্ভব হবে না। আমি যৌতুকের জন্যে এক শ টাকা চাঁদা দেব, তোমরাও যা পার দাও।
যারা এসেছিল তারা মৃদুস্বরে কিছুক্ষণ জল্পনা করল। তারপর এককড়ি নশকর বলল, বাবু মশায় যা বললেন, তা খুব ন্যায্য কথা। মুকুন্দ মিস্ত্রীকে আমরা সবাই ভক্তি করতাম, তাঁর মেয়ের বিয়ের যোগাড় আমাদেরই করা উচিত। আমরা সবাই মাইনে থেকে টাকায় দু পয়সা হিসেবে চাঁদা দিতে রাজী আছি, তাতে আন্দাজ তিন শ টাকা উঠবে, আপনার টাকা নিয়ে হবে চার শ। যৌতুক ভালই হবে, তার ওপর আপনি এখানে একটা কাজ তো দেবেন। আমরা সাধ্যমত পাত্রের খোঁজ করব, কিন্তু সুপাত্র পাওয়া বড় শক্ত হবে বাবু!
অনন্ত পাল বলল, পাত্র খোঁজবার দরকার নেই, আমিই বিয়ে করব।
প্রসন্ন সামন্ত চুপি চুপি বলল, সে কি রে অনন্ত, আমার সেই শিবপুরের শালীর মেয়েকে বিয়ে করবি নি? টাকার লোভে বোবা মেয়ে নিবি?
অনন্ত চেঁচিয়ে বলল, টাকা চাই না, অমনিই বিয়ে করব।
অনন্তর পিঠ চাপড়ে রঘুপতি বললেন, বাহবা অনন্ত! উপস্থিত সকলে খুশী হয়ে কলরব করে উঠল।
দুদিন পরে রঘুপতির কামরার দরজা একটু ফাঁক করে আনন্দ মিস্ত্রী বলল, আসতে পারি বাবু? সামন্ত মশায় লিলুয়া জুট মিলে ক্রেন খাটাতে গেছেন, তাই আমাকেই এরা বলবার জন্যে ধরে এনেছে। আমাদের একটা আরজি আছে বাবু।
রঘুপতি বললেন, সবাই ভেতরে এস। আবার কিসের আরজি? কাকে তাড়াতে চাও?
আনন্দ বলল, আমাদের সকলের নিবেদন—বাইসম্যান অনন্ত পালের মাইনেটা কিছু বাড়িয়ে দিতে আজ্ঞা হ’ক।
—সে তোমাদের বলতে হবে না। আসছে মাসেই তো তার বিয়ে? ওই মাস থেকেই তার মাইনে বাড়বে।
শারদীয় ‘গল্প—ভারতী’
১৩৬১ (১৯৫৪)
____________
‘কৃষ্ণকলি’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত নয়।
আনন্দীবাঈ
বহু কারবারের মালিক ত্রিক্রমদাস করোড়ী তাঁর দিল্লির অফিসের খাস কামরায় বসে চেক সহি করছেন। আরদালী এসে একটা কার্ড দিল—এম. জুলফিকার খাঁ। ত্রিক্রমদাস বললেন, একটু সবুর করতে বল।
কিছুক্ষণ পরে সহি করা চেকের গোছা নিয়ে কেরানী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ত্রিক্রমদাস ঘণ্টা বাজিয়ে আরদালীকে ডেকে কার্ডখানা দিয়ে বললেন, আসতে বল।
