রামভকত কৃতার্থ হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
এমন সময় ভিড় ঠেলে প্রাণকান্ত বাবু এলেন। ইনি একজন সম্রান্ত বড় অফিসার, শহরের সকলেই একে খাতির করে। প্রাণ কান্ত বাবু, এগিয়ে এসে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে মদশেরে বললেন, ভৈরবী মাতাজী, আমার প্রতি একটু কৃপাদৃষ্টিতে তাকান, বড়ই সংকটে পড়েছি, আপনি ছাড়া কে উদ্ধার করবে?
ভৈরবী কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ একটু কুঁচকে গেল, মুখে সকৌতুক হাসির রেখা ফুটে উঠল। বললেন, আরে প্রাণকাত যে! হরে রাম হরে রাম! চিনতে পেরেছ তো? ওকি, অমন হতভম্ব হয়ে গেলে কেন, ভূত দেখলে নাকি?
প্রাণকান্ত বাবু নির্বাক বিমূঢ় হয়ে মিটমিট করে চাইতে লাগলেন। ভৈরবী বললেন, সেকি প্রাণকান্ত, এর মধ্যেই ভুলে গেলে? লজ্জা কেন, এখন তুমিও সাধু আমিও সাধবী, দুজনেই পোড়খাওয়া খাঁটী সোনা। ওকি, পালাচ্ছ কেন, দাঁড়াও দাঁড়াও।
প্রাণকাত বা দাঁড়ালেন না, ভিড় ঠেলে সবেগে প্রস্থান করলেন। ভৈরবী স্মিতমুখে বললেন, একটা পুরনো ভূত ভেগে গেল। চল। মুনশী রামভকত, এইবার তোমার কুঠিতে যাব।
ভৈরবী চলে গেলে দর্শকদের মধ্যে কলরব উঠল। এক দল বলল, ভৈরবী না আরও কিছু। ছিছি, এত লোকের সামনে কেলেঙ্কারি ফাঁস করতে মাগীর লজ্জাও হল না। সেই যে বলে, অঙ্গারঃ শতধৌতেন। আর এক দল বলল, অমন কথা মুখে আনতে নেই, উনি এখন পূর্ণমাত্রায় তপঃসিদ্ধা, গৌতমপত্নী অহল্যার মতন পাপ শন্যা, লজ্জা ভয় নিন্দা প্রশংসার বহ, ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন, আগের কথাও লকুতে চান না। সেই জনেই তো সত্যবতী নাম।
ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে আমি কেষ্টকে জিজ্ঞাসা করলুম, কি হয়েছে ভাই, প্রাণকান্ত বাবু পালিয়ে গেল কেন?
কেষ্ট বলল, বুঝতে পারলি না বোকা, এই ভৈরবীর সঙ্গে প্রাণকান্ত বাবর লভ হয়েছিল।
৩। মধু-কুঞ্জ-সংবাদ
সেকালেও বদমাশ ছেলে ছিল, কিন্তু এখনকার মতন তারা কলেকটিভ অ্যাকশন নিতে জানত না। মাষ্টাররা তখন বেপরোয়া ভাবে বেত লাগাতেন, ছেলেরা তা শিক্ষারই অঙ্গ মনে করত, মা-বাপরাও আপত্তি করতেন না।
বেত মারায় আমাদের মধুসূদন মাষ্টারের জুড়ি ছিল না। দোষ করলে তো মারতেনই, বিনা দোষেও শুধু হাতের সুখের জন্যে মারতেন। তিনি একটি নতুন শাস্তি আবিষ্কার করেছিলেন–রসমোড়া, অর্থাৎ পেটের চামড়া খামচে ধরে মোচড় দেওয়া।
মধু মাষ্টার বাঙলা পড়াতেন। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ, কালো রঙ, একমখে দাড়িগোঁফ, তাতে চেহারাটি বেশ ভীষণ দেখাত। তখনও তাঁর বিবাহ হয় নি, বাড়িতে শুধু বিধবা বিমাতা আর দশ-এগারো বছরের একটি আইবুড়ো বৈমাত্র ভগ্নী। শুনতুম দেশে তাঁর যথেষ্ট বিষয়সম্পত্তি আছে, শুধু ছেলে ঠেঙাবার লোভেই নানা জায়গায় মাষ্টারি করেছেন।
আমাদের ক্লাসের একটি ছেলের নাম কুঞ্জ। বয়স চোদ্দ-পনরো, আমাদের চাইতে ঢের বড়। একটু পাগলাটে, লেখাপড়ায় অত্যন্ত কাঁচা, তিন বৎসর প্রমোশন পায় নি।
মধু মাষ্টার চারপাঠ পড়াচ্ছেন। হঠাৎ কুঞ্জ বলল, মাষ্টার মশাই, একবার বাইরে যাব, পেচ্ছাব পেয়েছে।
ধমক দিয়ে মধু, মাষ্টার বললেন, মিথ্যে কথা। রোজ এই সময় তোর বাইরে যাবার দরকার হয়। নিশ্চয় তামাক কি বাসাই খাস।
একটু পরে কুঞ্জ আবার বলল, উঃ, আর থাকতে পারছি না, ছুটি দিন মাষ্টার মশাই। ফিরে এলে বরং আমার মুখে শুখে দেখবেন তামাক খেয়েছি কিনা।
-খবরদার, চুপ করে বসে থাক। ছুটি পাবি না।
মুখ কাঁচুমাচু করে কাতর কণ্ঠে কুঞ্জ বলল, উহুহুহু। তার পর উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মধু মাষ্টার তাকে ধরে ফেলে একটা রসমোড়া দিলেন তার পর সপাসপ বেত মারতে লাগলেন। কুঞ্জ চিৎকার করে বলল, আমার দোষ দিতে পারবেন না কিন্তু! বেত এড়াবার জন্যে সে চারদিকে ছুটোছুটি করতে লাগল, মধু মাষ্টারও সঙ্গে সঙ্গে ধাওয়া করে বেত চালাতে লাগলেন।
আমরা তারস্বরে বললম, মাষ্টার মশাই, সমস্ত ঘর ভিজে নোংরা হয়ে গেল, আপনার কাপড়েও ছিটে লেগেছে। মেথর ডাকতে হবে।
মধু মাষ্টার তখনও উন্মত্ত হয়ে বেত চালাচ্ছেন। হঠাৎ কুঞ্জ মাটিতে শুয়ে পড়ে গোঁগোঁ করতে লাগল। আমরা বললাম, কুঞ্জ মরে গেছে, নিশ্চয় মরে গেছে।
কেষ্ট তাড়াতাড়ি এক ফালি কাগজ ছিড়ে নিয়ে কুঞ্জর নাকের কাছে ধরে বলল, এখনও মরে নি, দেখুন না কাগজটা ফরফর করছে। মারের চোটে কুঞ্জ অজ্ঞান হয়ে গেছে, আর একটু পরেই মরে যাবে। ছুটি দিন মাষ্টার মশাই, আমরা চ্যাংদোলা করে কুঞ্জকে তার বাড়ি নিয়ে যাব, সেখানে মরাই তো ভাল। আপনি মেথর ডাকন আর চান করে কাপড়টা ছেড়ে ফেলুন।
অগত্যা মধু মাষ্টার ক্লাস বন্ধ করলেন।
পরদিন কুঞ্জ স্কুলে এল না। মধু, মাষ্টার বললেন, আজ বিকেলে ওর বাড়িতে খোঁজ নিস তো, কেমন আছে ছোঁড়া।
ক্লাস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, আমরা একসঙ্গে আবত্তি করছি–সকলের পিতা তুমি, তুমি সর্বময়। হঠাৎ কুঞ্জ তার মাকে নিয়ে উপস্থিত হল। মা খুব লম্বা চওড়া মহিলা, নাকে নথ, কানে মাকড়ির ঝালর, চওড়া লালপেড়ে শাড়ি কোমরে জড়িয়ে পরেছেন, মাথায় কাপড় না থাকারই মধ্যে। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নাক সিটকে একবার চারদিকে উঁকি মারলেন, যেন আরশোলা কি নেংটি ইদর খুজছেন। তার পর আমাদের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন, মোধো মাষ্টার কোনটে রে?
একালের চাইতে তখন ছেলেদের মধ্যে শিভালরি ঢের বেশী ছিল। আমরা সকলেই সসমে আঙুল বাড়িয়ে মধু মাষ্টারকে শনাক্ত করলুম।
