জ্বলজ্জট বললেন, অহো কি মূর্খ! তুমি পুড়ে মরলে পাঞ্চালী সহমৃতা হবে, অনর্থক নারীহত্যার নিমিত্তরূপে আমিও পাপগ্রস্ত হব। পাঞ্চালীকেই চাই।
ভীম করজোড়ে বললেন, তপোধন, আমি একটি নিবেদন করছি, শুনতে আজ্ঞা হক। আপনি জ্যেষ্ঠা পাণ্ডববধূ শ্রীমতী হিড়িম্বাকেই গ্রহণ করুন, পাঞ্চালীর পূর্বেই তাঁর সঙ্গে আমার বিবাহ হয়েছিল।
জ্বলজ্জট বললেন, তুমি অতি ধৃষ্ট দুষ্ট প্রতারক, একটা রাক্ষসীকে আমার স্কন্ধে ন্যস্ত করতে চাও!
ভীম বললেন, প্রভু, হিড়িম্বা রাক্ষসী হলেও যখন মানবীর রূপ ধরেন, তখন তাঁকে ভালই দেখায়। তাঁকে যদি যথেষ্ট মনে না করেন তবে আমাদের আরও আটজন অতিরিক্ত পত্নী আছেন, সব কটিকে নিয়ে পাঞ্চালীকে মুক্তি দিন। আমার ভ্রাতারা নিশ্চয় এতে সম্মত হবেন।
নকুল সহদেব সমস্বরে বললেন, নিশ্চয়, নিশ্চয়।
জ্বলজ্জট বললেন, তোমাদের অপর পত্নীরা এখানে নেই, অনুপস্থিত বস্তু দান করা যায় না। আমি এই মুহূর্তেই পত্নী চাই, পাঞ্চালীকেই চাই।
অর্জুন বললেন, প্রভু, ধর্মরাজ আর পাঞ্চালীকে নিষ্কৃতি দিন, আমাদের চার ভ্রাতাকে ভস্ম করে আপাতত আপনার ক্রোধ উপশান্ত করুন। এর পর অবসর মত একটি ঋষিকন্যার পাণিগ্রহণ করবেন।
জ্বলজ্জট বললেন, তোমরা সকলেই মূর্খ, তথাপি তোমাদের আগ্রহ দেখে আমি কিঞ্চিৎ প্রীত হয়েছি। তোমাদের ভস্ম করে আমার কোনও লাভ হবে না। আমি পত্নী চাই, যে আমার সেবা করবে। যদি নিতান্তই দ্রৌপদীকে ছাড়তে না চাও তবে তাঁর নিষ্ক্রয়স্বরূপ তোমরা পঞ্চভ্রাতা আজীবন আমার দাসত্বে নিযুক্ত থাক।
যুধিষ্ঠির বললেন, মহর্ষি, তাই হক, আমরা আজীবন দাস হয়ে আপনার সেবা করব।
ধৌম্য বললেন, মুনিবর, কাজটা কি ভাল হবে? তার চেয়ে বরং পঞ্চগব্য—ভক্ষণ চান্দ্রায়ণ ইত্যাদি প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা করুন। অর্থ তো এঁদের এখন নেই, ত্রয়োদশ বর্ষের অন্তে রাজ্যোদ্ধারের পর যত চাইবেন এঁরা দেবেন।
জ্বলজ্জট প্রচণ্ড গর্জন করে বললেন, তুমি কে হে বিপ্র, আমাদের কথার উপর কথা কইতে এসেছ? ওরে কে আছিস, একটা দীর্ঘ রজ্জু নিয়ে আয়।
যুধিষ্ঠির বললেন, প্রভু, রজ্জুর প্রয়োজন নেই, আমাদের উত্তরীয় দিয়েই বন্ধন করুন।
জ্বলজ্জট যুধিষ্ঠিরাদি প্রত্যেকের কটিদেশে উত্তরীয়ের এক প্রান্ত বাঁধলেন এবং অপর প্রান্তের গুচ্ছ ধারণ করে পাণ্ডবাশ্রম থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। দ্রৌপদী আর্তনাদ করে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। ধৌমাদি বিপ্রগণ স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে রইলেন।
চেতনালাভের পর দ্রৌপদী দেখলেন তিনি তাঁর কক্ষে সেবন্তীর ক্রোড়ে মস্তক রেখে শুয়ে আছেন, কৃষ্ণ তাকে তালবৃন্ত দিয়ে বীজন করছেন।
দ্রৌপদী বললেন, হা পঞ্চ আর্যপুত্র, কোথায় আছ তোমরা?
কৃষ্ণ বললেন, কৃষ্ণা, আশ্বস্ত হও। পঞ্চপাণ্ডব নিরাপদে আছেন, তাঁরা অশ্বত্থ—তরুতলে উপবিষ্ট হয়ে পাপনাশের জন্য অঘমর্ষণ মন্ত্র জপ করছেন। তুমি একটু সুস্থ হলেই তোমাকে তাঁদের কাছে নিয়ে যাব।
—সেই ভয়ংকর ঋষি কোথায়?
—আর ভয় নেই। তিনি পঞ্চপাণ্ডবকে পশুর ন্যায় বন্ধন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, দৈবক্রমে পথে আমার সঙ্গে দেখা হল। আমি তাঁকে বললাম, তপোধন, করেছেন কি? এঁরা অকর্মণ্য বিলাসী ক্ষত্রিয়, আপনার কোনও কাজ করতে পারবেন না, অনর্থক অন্ন ধ্বংস করবেন। তিনি বললেন, না, পাঞ্চালীকেই এনে দাও। আমি উত্তর দিলাম, পাঞ্চালী আরও অকর্মণ্যা, আরও বিলাসিনী, শুধু নিজের প্রসাধন করতে জানেন। আমি ফিরে গিয়ে আপনাকে একটি কর্মিষ্ঠা ব্রজনারী পাঠিয়ে দেব। আপাতত আপনি পাঞ্চালীর নিষ্ক্রিয়স্বরূপ এই সবৎসা ধেনু নিন, দধি, দুগ্ধ, ঘৃতাদি খেয়ে বাঁচবেন। আমার মাতুল রাজর্ষি রোহিত এটি আমাকে উপহার দিয়েছেন। জ্বলজ্জট মুনি তাতেই সম্মত হয়ে পাঞ্চালীর পতিদের মুক্তি দিলেন।
দ্রৌপদী বললেন, ধন্য সেই ধেনু যার মূল্য পাণ্ডবমহিষীর সমান। কিন্তু ঋষিপত্নীহত্যার পাপ থেকে পাণ্ডবগণ মুক্তি পাবেন কী করে?
কৃষ্ণ সহাস্যে বললেন, ঋষিপত্নী হত্যা হয় নি। অপ্সরা পঞ্চচূড়া ঠিক তাঁর পত্নী নন, সেবাদাসী বলা যেতে পারে। বরাহ তাঁকে ঈষৎ দন্তাঘাত করেছিল, তিনি ভয়ে চিৎকার করে আশ্রমে পালিয়ে গিয়ে মূর্ছিত হয়েছিলেন। জ্বলজ্জট তাঁকে দেখে ভেবেছিলেন বুঝি মরে গেছেন। পাণ্ডবদের মুক্তিলাভের পর আমি ঋষির সঙ্গে তাঁর আশ্রমে গিয়ে দেখলাম পঞ্চচূড়া দোলনায় দুলছেন।
দ্রৌপদী বললেন, কৃষ্ণ, এখনই আমাকে পতিগণের সকাশে নিয়ে চল। হা, আমি অপরাধিনী, এক মাস তাঁদের উপেক্ষা করেছি, এখন কোন বাক্যে ক্ষমাভিক্ষা করব?
—পাঞ্চালী, ক্ষমা চেয়ে অনর্থক তাঁদের বিব্রত ক’রো না, তাঁরা তো তোমার উপর অপ্রসন্ন হন নি। বহুদিন পরে তোমার সম্ভাষণ শোনবার জন্য তাঁরা তৃষিত চাতকের ন্যায় উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন।
—গোবিন্দ, আমি তাঁদের কি বলব?
—পুরুষজাতি ভার্যার মুখে নিজের স্তুতি শুনলে যেমন পরিতৃপ্ত হয় তেমন আর কিছুতে হয় না। কৃষ্ণা, তুমি পঞ্চপাণ্ডবের কাছে গিয়ে তাঁদের স্তুতি কর।
—হা কৃষ্ণ, আমি তাঁদের গঞ্জনাই দিয়েছি, এই দগ্ধ মুখে স্তুতি আসবে কেন? কি বলব তুমিই শিখিয়ে দাও।
—সখী কৃষ্ণা, বাগদেবী তোমার রসনায় অধিষ্ঠান করবেন, তুমি আজ সর্বসমক্ষে অসংকোচে তাঁদের সংবর্ধনা কর। এখন আমার সঙ্গে পতিসন্দর্শনে চল। সেবন্তী, মাল্য প্রস্তুত হয়েছে?
