কৃষ্ণ বললেন, তপোধন, আমার আত্মীয় ও প্রীতিভাজন পাণ্ডবগণ রাজ্যচ্যুত হয়ে দ্বৈতবনে বাস করছেন। সম্প্রতি তারা আর এক সংকটে পড়েছেন, তা থেকে তাঁদের মুক্ত করবার জন্য আপনার সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এসেছি। আপনার পরিচিতা কোনও নারী নিকটে আছে?
জ্বলজ্জট বললেন, নারী ফারী আমার নেই, আমি অকৃতদার। এই বিজন অরণ্যে নারী কোথায় পাবে? তবে হাঁ, অপ্সরা পঞ্চচূড়া মাঝে মাঝে তত্ত্বকথা শুনতে আমার কাছে আসে বটে। সে কিন্তু সুন্দরী নয়।
কৃষ্ণ বললেন, সুন্দরীর প্রয়োজন নেই। পঞ্চচূড়া চিৎকার করতে পারে তো? তা হলেই আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। এখন আমার প্রার্থনাটি শুনুন।
কৃষ্ণ সবিস্তারে তার প্রার্থনা জানালেন। জ্বলজ্জট অট্টহাস্য করে বললেন, বাসুদেব, লোকে তোমাকে কুচক্রী বলে, কিন্তু আমি দেখেছি তুমি সুচক্রী, তোমার উদ্দেশ্য সাধু। নিশ্চিত থাক, তোমার অনুরোধ নিশ্চয়ই রক্ষা করব। দুদিন পরে অপরাহ্ণকালে আমি পাণ্ডবদের আশ্রমে উপস্থিত হব।
প্রণাম করে কৃষ্ণ বিদায় নিলেন এবং আরও উত্তরে যাত্রা করে রাজর্ষি রোহিতের আশ্রমে এলেন। ইনি বলদেবজননী রোহিণীর ভ্রাতা, বানপ্রস্থ অবলম্বন করে সস্ত্রীক অরণ্যবাস করছেন। কৃষ্ণকে দেখে প্রীত হয়ে বললেন, বৎস, বহুকাল পরে তোমাকে দেখছি। তুমি এখানে কিছুদিন অবস্থান করে তোমার মাতুলানী ও আমার আনন্দবর্ধন কর। দ্বারকার সব কুশল তো?
কৃষ্ণ বললেন, পূজ্যপাদ মাতুল, সমস্তই কুশল। আমি আপনাদের চরণদর্শন করতে এসেছি, দীর্ঘকাল থাকতে পারব না, দুদিন পরেই বিশেষ প্রয়োজনে পাণ্ডবাশ্রমে আমাকে ফিরে যেতে হবে।
পাণ্ডবগণের পোষ্যবর্গ প্রায় দু শ, প্রতিদিন দু বেলা এই সমস্ত লোকের আহারের ব্যবস্থা করতে হয়। দ্বৈতবনে হাটবাজার নেই, তণ্ডুলাদি শস্য পাওয়া যায় না, কালে—ভদ্রে দরদ পুক্কশ প্রভৃতি প্রত্যন্তবাসীরা কিছু যব আর মধু এনে দেয়। মৃগয়ালব্ধ পশুর মাংস এবং স্বচ্ছন্দবনজাত ফল মূল ও শাকই পাণ্ডবগণের প্রধান খাদ্য।
প্রত্যহ প্রাতঃকৃত্য সমাপন করেই পঞ্চপাণ্ডব মৃগয়ায় নির্গত হন। আজ একটি বৃহৎ বরাহ দেখে তাঁরা উৎফুল্ল হলেন, কারণ বরাহমাংস তাদের আশ্রিত বিপ্রগণের অতিশয় প্রিয়। অর্জুন শরাঘাত করলেন, কিন্তু বিদ্ধ হয়েও বরাহ মরল না, বেগে ধাবিত হয়ে নিবিড় অরণ্যে মিলিয়ে গেল। তখন পঞ্চপাণ্ডব সকলেই শরমোচন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে নারীকণ্ঠে আর্তনাদ উঠল— হা নাথ, হতোহোম্মি!
তাঁদের শরাঘাতে কি স্ত্রীহত্যা হল? পাণ্ডবগণ ব্যাকুল হয়ে অরণ্যে প্রবেশ করে দেখলেন, বরাহ গতপ্রাণ হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু আর কেউ নেই। চতুর্দিকে অন্বেষণ করেও তাঁরা কিছু দেখতে পেলেন না। ভীম বললেন, নিশ্চয় রাক্ষসী মায়া, মারীচ একই প্রকার চিৎকার করে শ্রীরামকে বিভ্রান্ত করেছিল।
যুধিষ্ঠির শঙ্কিত হয়ে বললেন, আশ্রমে শীঘ্র ফিরে চল, জানি না কোনও বিপদ হল কিনা। ভীম তুমি বরাহটাকে কাঁধে নাও।
সকলে আশ্রমে এসে দেখলেন, কোনও বিপদ ঘটে নি। পাঞ্চালী সূর্যদত্ত তাম্রস্থালীতে বরাহমাংস পাক করলেন, প্রচুর পরিমাণে ভোজন করে পরিতৃপ্ত হলেন।
অপরাহ্ণকালে একটি বৃহৎ অশ্বত্থ তরুর তলে সকলে বসেছেন, পুরোহিত ধৌম্য যম—নচিকেতার উপাখ্যান বলছেন। পাঞ্চালীও একটু পশ্চাতে বসে এই পবিত্র কথা শুনছেন। এমন সময় মূর্তিমান বিপদ রূপে জ্বলজ্জট ঋষি উপস্থিত হলেন। তাঁর জটা ও শ্মশ্রু অগ্নিজ্বালার ন্যায় ভয়ংকর, মুখ ক্রোধে রক্তবর্ণ, চক্ষু বিস্ফারিত ও ভ্রূকুটিকুটিল। হুংকার করে জ্বলজ্জট বললেন, ওরে রে নারীঘাতক পাপিবৃন্দ, আজ ব্রহ্মশাপে তোমাদের নরকে প্রেরণ করব!
যুধিষ্ঠির কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, ভগবান, আমরা কোন মহাপাপ করেছি?
জ্বলজ্জট উত্তর দিলেন, তোমরা শরাঘাতে আমার প্রিয় ভার্যাকে বধ করেছ। ধিক তোমাদের ধনুর্বিদ্যা, একটা বরাহ মারতে গিয়ে ঋষিপত্নীর প্রাণ হরণ করেছ!
যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতা কাতর হয়ে ঋষির চরণে নিপতিত হলেন। পাঞ্চালিও গলবস্ত্র হয়ে যুক্ত করে অশ্রুবর্ষণ করতে লাগলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, প্রভু, আমরা অজ্ঞাতসারে মহাপাপ করে ফেলেছি! আপনি যে দণ্ড দেবেন, যতই কঠোর হক তাই শিরোধার্য করব।
দ্রৌপদী এগিয়ে এসে বললেন, মহামুনি, আমার স্বামীদের শরাঘাতে আপনার প্রিয়া ভার্যার প্রাণবিয়োগ হয়েছে, তার দণ্ড—স্বরূপ আপনি আমার প্রাণ নিয়ে এঁদের মার্জনা করুন। মধ্যম পাণ্ডব, তুমি চিতা রচনা কর, আমি অগ্নিপ্রবেশে প্রাণ বিসর্জন দেব।
জ্বলজ্জট আবার হুংকার দিয়ে বললেন, তুমি তো দেখছি অতি নির্বুদ্ধি রমণী! তোমার প্রাণ বিসর্জনে কি আমার পত্নী জীবিত হবে? আমি পত্নী চাই, এই দণ্ডেই চাই। পাণ্ডবরা আমাকে বিপত্নীক করেছে, আমি পাণ্ডবপত্নী পাঞ্চালীকে চাই। এই বলে জ্বলজ্জট মুনি উন্মত্তের ন্যায় নৃত্য করে ভূমিতে পদাঘাত করতে লাগলেন।
যুধিষ্ঠির যুক্ত করে বললেন, প্রভু, প্রসন্ন হ’ন, পাঞ্চালী ভিন্ন যা চাইবেন তাই দেব।—
ইয়ং হি নঃ প্রিয়া ভার্যা প্রাণেভ্যেঽপি গরীয়সী।
মাতেব পরিপাল্যা চ পূজ্যা জ্যেষ্ঠেব চ স্বসা।।
আমাদের এই প্রিয়া ভার্যা প্রাণাপেক্ষা গরীয়সী, মাতার ন্যায় পরিপালনীয়া, জ্যেষ্ঠা ভগিনীর ন্যায় মাননীয়া। এঁকে আমরা কি করে ত্যাগ করব? আপনি বরং শাপানলে আমাকে ভস্মীভূত করে ফেলুন, পাঞ্চালীকে নিষ্কৃতি দিন।
