সেবন্তী একটা ঝুড়ি দেখিয়ে বললে, এই যে। অন্য ফুল পাওয়া গেল না, শুধু কদম ফুলের মালা।
কৃষ্ণ বললেন, ওতেই হবে।
ধৌম্যাদি দ্বিজগণে বেষ্টিত হয়ে পঞ্চপাণ্ডব অশ্বত্থতরুমূলে উপবিষ্ট ছিলেন, তাঁদের মন্ত্রজপ সমাপ্ত হয়েছে। কৃষ্ণ সহিত দ্রৌপদীকে আসতে দেখে সকলে গাত্রোত্থান করলেন।
পঞ্চপাণ্ডবের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করে দ্রৌপদী কৃতাঞ্জলিপুটে পাষাণপ্রতিমার ন্যায় নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কৃষ্ণ বললেন, পাঞ্চালী, তোমার মৌন ভঙ্গ কর।
পাঞ্চালী গদগদ কণ্ঠে বলতে লাগলেন। —দেবসম্ভব পঞ্চ আর্যপুত্র, পতিমহিমায় অভিভূত হয়ে আমি সম্ভাষণ করছি, যা মনে আসছে তাই বলছি, আমার প্রগলভতা ক্ষমা কর। পিতৃভবনে স্বয়ংবরসভায় ধনঞ্জয়কে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, ইনি লক্ষ্যভেদ করলে আনন্দে বিবশ হয়েছিলাম, এঁকেই পতিরূপে পাব ভেবে নিজেকে শতধন্য জ্ঞান করেছিলাম। কিন্তু বিধাতা আর গুরুজনরা আমার ইচ্ছা—অনিচ্ছার অপেক্ষা রাখেন নি, পঞ্চভ্রাতার সঙ্গে আমার বিবাহ দিলেন। অন্তর্যামী সাক্ষী, কিছুকাল পরেই আমার সকল ক্ষোভ দূর হইল, পঞ্চপতি আমার অন্তরে একীভূত হয়ে গেলেন। পঞ্চেন্দ্রিয়ের অনুভূতি যেমন পৃথক পৃথক এবং একযোগে অন্তঃকরণ রঞ্জিত করে সেইরূপ পঞ্চপতি স্বতন্ত্র ও মিলিতভাবে আমার হৃদয় উদভাসিত করেছেন।
পাণ্ডবাগ্রজ, ইন্দ্রপ্রস্থে যখন পট্টমহিষী ছিলাম, তখন বসনভূষণে ও প্রসাধনে আমি প্রচুর অর্থব্যয় করেছি, প্রিয়জনকে মুক্ত হস্তে দান করেছি। যখন যা চেয়েছি, তুমি তখনই তা দিয়েছ, প্রশ্ন কর নি, অপব্যয়ের জন্য অনুযোগ কর নি। দাসদাসীদের আমি শাসন করেছি, তোমার প্রিয় পরিচারকগণ আমার কঠোরতার জন্য তোমার কাছে অভিযোগ করেছে, কিন্তু তুমি কর্ণপাত কর নি, পাছে পাণ্ডব মহিষীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। তুমি শান্তিপ্রিয় ক্ষমাশীল ধর্মভীরু তোমার ধর্মাধর্মের বিচারপদ্ধতি না বুঝে আমি বহু ভর্ৎসনা করেছি, তথাপি এই অপ্রিয়বাদিনীর প্রতি ক্রুদ্ধ হও নি। অজাতশত্রু মহামান্য ধর্মরাজ, তোমার মহত্ত্ব বোঝবার শক্তি ক জনের আছে?
মধ্যম পাণ্ডব, তুমি জরাসন্ধবিজয়ী মহাবল, দুঃসাধ্য কর্মই তোমার যোগ্য, কিন্তু আমি ক্ষুদ্র বৃহৎ নানা কর্মে তোমাকে নিযুক্ত করেছি, আমার প্রতি প্রীতিবশে তুমি যেন ধন্য হয়ে সে সকল সম্পাদন করেছ। তুমি ভোজনবিলাসী রন্ধনবিদ্যায় পারদর্শী। ইন্দ্রপ্রস্থে বহুসংখ্যক নিপুণ সূপকার তোমার তৃপ্তিবিধান করত, কিন্তু এই অরণ্যাবাসে আমি যে সামান্য ভোজ্য এক পাকে রন্ধন করে তোমাকে দিয়ে থাকি তাতেই তুমি তুষ্ট হও, কখনও অনুযোগ কর না যে বিস্বাদ বা অতিলবণ বা ঊনলবণ হয়েছে। নরশার্দুল! তোমাদের সকলের চেষ্টায় রাজ্যোদ্ধার হবে, কিন্তু আমার লাঞ্ছনার যোগ্য প্রতিশোধ একমাত্র তুমিই নিতে পারবে। দুর্যোধন আর দুঃশাসনকে তাদের অন্তিম দশায় মনে করিয়ে দিও যে পাণ্ডবমহিষীকে নির্যাতন করে কেউ নিস্তার পায় না।
তৃতীয় পাণ্ডব! তুমি বয়োজ্যেষ্ঠ নও তথাপি তোমার ভ্রাতারা যুদ্ধকালে তোমারই নেতৃত্ব মেনে থাকেন। তুমি দেবপ্রিয় সর্বগুণাকর, অদ্বিতীয় ধনুর্ধর, দেবসেনাপতি স্কন্দতুল্য রূপবান, নৃত্যগীতাদি কলায় পটু, হৃষীকেশ কৃষ্ণ তোমার অভিন্নহৃদয় সখা। যখন সুভদ্রাকে বিবাহ করে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপুরীতে এনেছিলে তখন আমি ক্ষুদ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু সত্য বলছি, এখন আমার কোনো দুঃখ নেই। যে নারী পঞ্চপতির ভার্যা সে কোন অধিকারে সপত্নীকে ঈর্ষা করবে? সুভদ্রা আমার প্রিয়তমা ভগিনী, দ্বারকায় তার কাছে আমার পঞ্চপুত্রকে রেখে নিশ্চিন্ত আছি। পরন্তপ মহারথ, কুরুপাণ্ডবসমরে তুমিই পাণ্ডবসেনাপতি হবে, বাসুদেবের সহায়তায় বিপক্ষের সকল বীরকেই তুমি পরাস্ত করবে। কুরুপিতামহ ভীষ্ম আমার মহাগুরু, তোমাদের আচার্য দ্রোণ আমার নমস্য, কিন্তু দ্যুতসভায় তাঁরা রাজকুলবধুকে রক্ষা করেন নি, বীরের কর্তব্য পালন করেন নি, কাপুরুষবৎ নিশ্চেষ্ট ছিলেন। সব্যসাচী, সম্মুখ সমরে মর্মভেদী শরাঘাতে তাঁদের সেই কর্তব্যচ্যুতি স্মরণ করিয়ে দিও।
চতুর্থ পাণ্ডব, তুমি সুকুমারদর্শন বিলাসপ্রিয়, কিন্তু যুদ্ধে দুর্ধর্ষ। ইন্দ্রপ্রস্থে তুমি বিচিত্র পরিচ্ছদ, এবং বহু রত্নালংকার ধারণ করতে, কিন্তু এখানে আমাকে অল্পভূষণা দেখে তুমিও নিরাভরণ হয়েছ, গন্ধমাল্যাদি বর্জন করেছ। তোমার সমবেদনায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। রাজসূয় যজ্ঞের পূর্বে তুমি দশার্ণ ত্রিগর্ত পঞ্চনদ প্রভৃতি বহু দেশ জয় করেছিলে। আগামী সমরেও তুমি জয়লাভ করে যশস্বী হবে।
কনিষ্ঠ পাণ্ডব! তুমি আমার পতি ও দেবর, প্রেম ও স্নেহের পাত্র, বিশেষভাবে স্নেহেরই পাত্র। বনযাত্রাকালে আর্যা কুন্তী আমাকে বলেছিলেন, পাঞ্চালী, আমার পুত্র সহদেবকে দেখো, সে যেন বিপদে অবসন্ন না হয়। নির্ভীক অরিন্দম। তুমি অবসন্ন হও নি, যুদ্ধের জন্য অধীর হয়ে আছ। পূর্বে তুমি মাহিষ্মতীরাজ দুর্মতি নীলকে এবং কালমুখ নামক নররাক্ষসগণকে পরাস্ত করেছিলে। দুরাত্মা কৌরবগণের সহিত যুদ্ধেও তুমি নিশ্চয় বিজয়ী হবে।
হে দেবপ্রতিম মহাপ্রাণ পঞ্চপতি! দেববন্দনাকালে দেবতার দোষকীর্তন কেউ করে না, তোমাদের দোষের কথাও এখন আমার মনে নেই। আজ আমার জন্য তোমরা জীবন দিতে উদ্যত হয়েছিলে, দাসত্ব বরণ করেছিলে। কোন নারী আমার তুল্য পতিপ্রিয়া? পতিনির্বাসিতা সীতা নয়, পতিপরিত্যক্তা দময়ন্তীও নয়। তোমরা অপর পত্নীদের পিত্রালয়ে রেখে কেবল আমাকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ ত্রয়োদশ বৎসর যাপন করতে এসেছ, এক দুই বা তিন অখণ্ড পত্নীর পরিবর্তে আমার পঞ্চমাংশেই তুষ্ট আছ। কোন স্ত্রী আমার ন্যায় গৌরবিণী? কোন পতি তোমাদের ন্যায় সংযমী? বহুবর্ষপূর্বে পিতৃগৃহে বিবাহমণ্ডপে একই দিনে তোমাদের কণ্ঠে একে একে মাল্য দিয়েছিলাম, আজ এই অরণ্যভূমিতে মুক্তাকাশতলে একই ক্ষণে পুনর্বার দিচ্ছি। মহানুভব পঞ্চপতি, প্রসন্ন হও, স্নিগ্ধনয়নে আমাকে দেখ।
