কৃষ্ণ বললেন, বিস্তর, বিস্তর। আমার যে কোনও পত্নীকে জিজ্ঞাসা করলে শুনবে তিনিই অদ্বিতীয়া হতভাগিনী, অনুপমা দগ্ধকপালিনী। তাঁরা মনে করেন আমিই তাঁদের সমস্ত আধিদৈবিক আধিভৌতিক আর আধ্যাত্মিক দুঃখের কারণ। কৃষ্ণা, দুঃশ্চিন্তা দূর কর। বিধাতা বিশ্বপিতা মঙ্গলদাতা করুণাময়।
—তুমি বিধাতার চাটুকার, তাঁর নিষ্ঠুরতা দেখেও দেখছ না, কেবল করুণাই দেখছ।
—যাজ্ঞসেনী, তুমি কেবল নিজের দুর্ভাগ্যের বিষয় ভাবছ কেন, সৌভাগ্যও স্মরণ কর। তুমি ইন্দ্রপ্রস্থের রাজমহিষী, তোমার তুল্য গৌরবময়ী নারী আর কে আছে? তোমার বর্তমান দুর্দশা চিরদিন থাকবে না, আবার তুমি স্বপদে প্রতিষ্ঠিত হবে। যজ্ঞের অনল থেকে তোমার উৎপত্তি, তুমি অপূর্ব রূপবতী, তোমার পিতা পঞ্চালরাজ দ্রুপদ বর্তমান আছেন, তোমার দুই মহাবল ভ্রাতা আছেন। তোমার পাঁচ বীরপুত্র অভিমন্যুর সঙ্গে দ্বারকায় আমাদের ভবনে শিক্ষালাভ করছে। পাঁচ পুরুষসিংহ তোমার স্বামী, চার ভাসুর, চার দেবর—
ভাশুর দেবর আবার কোথায় পেলে? ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।
—ভাশুর আর দেবর তোমার কাছেই আছেন। কৃষ্ণা, এই শ্লোকটি কি তুমি শোন নি?—
পতিশ্বশুরতা জ্যেষ্ঠে পতিদেবরতানুজে।
মধ্যমেষু চ পাঞ্চাল্যাস্ত্রিতয়ং ত্রিতয়ং ত্রিষু।।
—জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব পাঞ্চালীর পতি ও ভ্রাতৃশ্বশুর (ভাশুর), কনিষ্ঠ পাণ্ডব পতি ও দেবর, মাঝের তিনজন প্রত্যেকেই পতি ভাশুর ও দেবর।
—তাতেই আমি ধন্য হয়ে গেছি?
—পাঞ্চালী, তুমি ক্রোধ সংবরণ কর। দোষশূন্য মানুষ জগতে নেই, যুধিষ্ঠির দ্যূতপ্রিয় ও সরলস্বভাব, তাই এই বিপদ হয়েছে। তিনি অনুতপ্ত, তাঁকে আর মনঃপীড়া দিও না। তোমার অন্য পতিরা যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞাবহ, অগ্রজের মতের বিরুদ্ধে তাঁরা যেতে পারেন না। তাঁদের অকর্মণ্য মনে ক’রো না।
কৃষ্ণ আরও অনেক প্রবোধবাক্য বললেন, নানা শাস্ত্র থেকে ভার্যার কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ দিলেন, কিন্তু পাঞ্চালীর ক্ষোভ দূর হল না। তখন কৃষ্ণ স্মিতমুখে বিদায় নিয়ে পাণ্ডবদের কাছে গেলেন।
একটি প্রকাণ্ড আটচালায় পুরোহিত ধৌম্য আর অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ বাস করেন। কৃষ্ণের আগমন উপলক্ষ্যে সেখানে একটি মন্ত্রণাসভা বসেছে। যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভ্রাতারা কৃষ্ণকে সাদরে সেই সভায় নিয়ে গেলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, পূজ্যপাদ ধৌম্য ও উপস্থিত বিপ্রগণ, আপনারা সকলে অবধান করুন। বাসুদেব কৃষ্ণ, তুমিও শোন। কৌরবসভায় লাঞ্ছনা ও রাজ্যনাশের শোকে পাঞ্চালীর চিত্তবিকার হয়েছে, পঞ্চপতির প্রতি তাঁর নিদারুণ অভিমান জন্মেছে, তিনি এক মাস আমাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করেন নি। এই দুঃসহ অবস্থার প্রতিকার কোন উপায়ে হতে পারে তা আপনারা নির্ধারণ করুন।
ধৌম্য বললেন, আমি বেদ পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্র থেকে শ্লোক উদ্ধার করে পাঞ্চালীকে পতিব্রতা সহধর্মিণীর কর্তব্য বিষয়ে উপদেশ দিতে পারি, পাপের ভয়ও দেখাতে পারি।
কৃষ্ণ বললেন, দ্বিজবর, কিছুই হবে না। আমি এইমাত্র তাঁকে বিস্তর শাস্ত্রীয় উপদেশ শুনিয়ে এখানে এসেছি, আমার চেষ্টায় কোনও ফল হয় নি।
যুধিষ্ঠির বললেন, তবে উপায়?
পুরোহিত ধৌম্যের খুল্লতাত হৌম্য নামক এক তেজস্বী বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বললেন, পাঞ্চালীকে বিনীত করা মোটেই দুরূহ নয়। পাণ্ডবগণ স্ত্রৈণ হয়ে পড়েছেন, দ্রুপদ নন্দিনীকে অত্যন্ত প্রশ্রয় দিয়েছেন, পঞ্চভ্রাতা তাঁদের এই যৌথ কলত্রটিকে ভয় করেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, আমি অতি সুসাধ্য উপায় বলছি শুনুন। পাঞ্চালীই আপনাদের একমাত্র পত্নী নন। আপনার আর একটি নিজস্ব পত্নী আছেন, রাজা শৈব্যের কন্যা দেবিকা। ভীমের আরও তিন জন পত্নী আছেন, রাক্ষসী হিড়িম্বা, শল্যের ভগিনী কালী, কাশীরাজকন্যা বলন্ধরা। অর্জুনেরও তিন পত্নী আছেন, মণিপুররাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা, নাগকন্যা উলুপী, আর কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রা। নকুলের আর এক পত্নী আছেন, চেদিরাজকন্যা করেণুমতী। সহদেবেরও আর এক পত্নী আছেন জরাসন্ধকন্যা, তাঁর নামটি আমার মনে নেই। পাঞ্চালীর এই ন জন সপত্নীকে সত্বর আনাবার ব্যবস্থা করুন। তাঁদের আগমনে দ্রৌপদীর অহংকার দূর হবে, আপনারাও বহু পত্নীর সহিত মিলিত হয়ে পরমানন্দে কালযাপন করবেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, তপোধন, আপনার প্রস্তাব অতি গর্হিত। দ্রৌপদী বহু মনস্তাপ ভোগ করেছেন, আরও দুঃখ কি করে তাঁকে দেব? আমাদের অনেক ভার্যা আছেন সত্য, কিন্তু তারা কেউ সহধর্মিণী পট্টমহিষী নন। আমরা এই যে বনবাসব্রত পালন করছি, এতে পাঞ্চালী ভিন্ন আর কেউ আমাদের সঙ্গিনী হতে পারেন না। কৃষ্ণ, সকল আপদে তুমিই আমাদের সহায়, পাঞ্চালী যাতে প্রকৃতিস্থ হন তার একটা উপায় কর।
একটু চিন্তা করে কৃষ্ণ বললেন, ধর্মরাজ, আমি যথোচিত ব্যবস্থা করব। আজ আমাকে বিদায় দিন, আমার এক মাতুল রাজর্ষি রোহিত এই দ্বৈতবনের পাঁচ ক্রোশ উত্তরে বানপ্রস্থ আশ্রমে বাস করেন। আমি তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করে দু দিনের মধ্যে ফিরে আসব।
রথে উঠে কৃষ্ণ তার সারথি দারুককে বললেন, এখান থেকে কিছু উত্তরে জ্বলজ্জট ঋষির আশ্রম আছে, সেখানে চল।
ঋষির বয়স পঞ্চাশ। তাঁর দেহ বিশাল, গাত্রবর্ণ আরক্ত গৌর, জটা ও শ্মশ্রু অগ্নিশিখার ন্যায় অরুণবর্ণ, সেজন্য লোকে তাঁকে জ্বলজ্জট বলে। কৃষ্ণকে সাদরে অভিনন্দন করে তিনি বললেন, জনার্দন, তিন বৎসর পূর্বে প্রভাসতীর্থে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, ভাগ্যবশে আজ আবার মিলন হল। তোমার কোন প্রিয়কার্য সাধন করব তা বল।
