ভজু—মামা বললেন, আরে তুমিই আমাদের নীলকণ্ঠ? এতক্ষণ বলতে হয়! আশ্চর্য, রাখে কৃষ্ণ মারে কে। আজকেই কালীঘাটে একটা পুজো দিতে হবে বাবা, দাও তো পাঁচটা টাকা। তোমার জন্যে আমি একটি চমৎকার সম্বন্ধ এনেছি নীলু, একেবারে ডানাকাটা পরী।
সম্বন্ধের কথা শুনেই নীলকণ্ঠ ভয় পেয়েই সিঁড়ি দিয়ে তর তর করে দোতলায় চলে গেলেন। ভজু—মামা বললেন, পালিয়ে গেল কেন!
আমি উত্তর দিলাম, নীলকণ্ঠবাবুর বিবাহে অরুচি হয়ে গেছে। ওঁর শরীর আর মন ভাল নেই, আপনি ওঁকে বিরক্ত করবেন না, চলে যান।
—আপনি আমাকে তাড়াবার কে মশায়? নীলু আমার ভাগনে, ওর কিসে ভাল হয় তা আমি বুঝব। আপনি এর মধ্যে আসেন কেন? ডেকে আনুন নীলুকে।
এই সময় বঙ্কিম ডাক্তার ওপর থেকে নেমে এলেন। ভজুকে বললেন, আবার কি করতে এসেছ হে?
—আমার ভাগনে নীলকণ্ঠকে এখনি ডেকে দিন।
—তার সঙ্গে দেখা হবে না। দূর হও এখান থেকে।
—আপনি বললেই দূর হব। আগে নীলকণ্ঠ আসুক, তাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। এখানে পরের বাড়িতে কেন সে থাকবে?
—সুশীলবাবু দেখবেন এই লোকটা যেন না পালায়, আমি পুলিসে টেলিফোন করছি। ওরে ফটকটা বন্ধ করে দে।
ফটক বন্ধ হবার আগেই ভজু—মামা নক্ষত্র বেগে সরে পড়লেন।
১৩৬১ (১৯৫৪)
পঞ্চপ্রিয়া পাঞ্চালী
পঞ্চপাণ্ডব অত্যন্ত অশান্তিতে আছেন। ইন্দ্রপ্রস্থের ঐশ্বর্য ত্যাগ করে বার বৎসর বনবাস আর এক বৎসর অজ্ঞাতবাস করতে হবে, এজন্য নয়। এই কাল উত্তীর্ণ হলেও হয়তো দুর্যোধন রাজ্য ফেরত দেবেন না, তখন আত্মীয় কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে, এজন্যও নয়। অশান্তির কারণ, পাঞ্চালী এক মাস তাঁর পঞ্চপতির সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ করেছেন।
রাজ্যত্যাগের পর পান্ডবরা প্রথমে কাম্যকবনে এসেছিলেন, এখন দ্বৈতবনে নদীর তীরে আশ্রম নির্মাণ করে বাস করছেন। তাঁদের সঙ্গে পুরোহিত ধৌম্য এবং আরও অনেক ব্রাহ্মণ আছেন, সারথি ইন্দ্রসেন এবং অনান্য দাসদাসী আছে, দ্রৌপদীর সহচরী ধাত্রীকন্যা বালিকা সেবন্তী আছে। দ্রৌপদীর বিস্তর কাজ, বনবাসেও তাকে বৃহৎ সংসার চালাতে হয়। ভগবান সূর্যের দয়ায় তিনি যে তামার হাঁড়িটি পেয়েছেন তাতে রান্না সহজ হয়ে গেছে, দ্রৌপদীর না খাওয়া পর্যন্ত খাদ্য আপনিই বেড়ে যায়, সহস্র লোককে পরিবেশন করলেও কম পড়ে না। গৃহিণীর সকল কর্তব্যই দ্রৌপদী পালন করছেন, শুধু স্বামীদের সঙ্গে কথা বলেন না। কোনও অভাব হলে সেবন্তীই তা পাণ্ডবদের জানায়।
প্রায় চার মাস হল পাণ্ডবরা বনবাসে আছেন। এ পর্যন্ত যুধিষ্ঠির প্রসন্ন মনে দিনযাপন করছিলেন, যেন বনবাসেই তিনি আজীবন অভ্যস্ত। ভীম প্রথম প্রথম কিছু অসন্তাোষ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু পরে বেশ প্রফুল্ল হয়ে মৃগয়া নিয়েই থাকতেন। অর্জুন নকুল সহদেবও রাজ্যনাশের দুঃখ ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি পাঞ্চালীর ভাবান্তর দেখে পাঁচজনেই উদবিগ্ন হয়েছেন।
দ্যুতসভায় অপমান আর রাজ্যনাশের দুঃখ দ্রৌপদী ভুলতে পারেন নি। তিনি প্রায়ই বিলাপ করতেন যে তাঁর জ্যেষ্ঠ পতির নির্বুদ্ধিতা এবং অন্যান্য পতির অকর্মণ্যতার জন্যই এই দুর্দশায় পড়তে হয়েছে। যুধিষ্ঠির তাকে শান্ত করবার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন, ভীম বার বার আশ্বাস দিয়েছেন যে দুঃশাসনের রক্তপান আর দুর্যোধনের উরুভঙ্গ না করে তিনি ছাড়বেন না, অর্জুন নকুল সহদেবও তাকে বহুবার বলেছেন যে ত্রয়োদশ বর্ষ দেখতে দেখতে কেটে যাবে, তার পর আবার সুদিন আসবে। কিন্তু কোনও ফল হয় নি, দ্রৌপদী তাঁর রোষ দমন করতে না পেরে অবশেষে পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে কথা বন্ধ করেছেন।
দ্বৈতবন থেকে দ্বারকা বহু দূর, তথাপি কৃষ্ণ রথে চড়ে মাঝে মাঝে পাণ্ডবদের দেখতে আসেন, দু—একবার সত্যভামাকেও সঙ্গে এনেছেন। এবারে তিনি একাই এসেছেন। যুধিষ্ঠিরের কাছে সকল বৃত্তান্ত শুনে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর গৃহে এলেন।
কৃষ্ণ পাণ্ডবদের মামাতো ভাই, অর্জুনের সমবয়স্ক। সেকালে বউদিদি আর বউমার অনুরূপ কোনও সম্বোধন ছিল কিনা জানা যায় না। থাকলেও তার বাধা ছিল, কারণ সম্পর্কে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর ভাশুরও বটেন দেওরও বটেন। দ্রৌপদীর প্রকৃত নাম কৃষ্ণা, সেজন্য কৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে সখীসম্বন্ধ পাতিয়েছিলেন এবং দুজনেই পরস্পরকে নাম ধরে ডাকতেন।
অভিবাদন ও কুশলপ্রশ্ন বিনিময়ের পর কৃষ্ণ সহাস্যে বললেন, সখী কৃষ্ণা, তোমার চন্দ্রবদন রন্ধনশালার হন্ডিকার ন্যায় দেখাচ্ছে কেন?
দ্রৌপদী বললেন, কৃষ্ণ, সব সময় পরিহাস ভাল লাগে না।
কৃষ্ণ বললেন, তোমার কিসের দুঃখ? পাণ্ডবরা তোমার কোন অভাব পূর্ণ করতে পারছেন না তা আমাকে বল। সূক্ষ্ম কৌষেয় বস্ত্র আর রত্নাভরণ চাও? গন্ধ দ্রব্য চাও? এখানে শস্য দুর্লভ, তোমরা মৃগয়ালব্ধ মাংস আর বন্য ফল মূল শাকাদি খেয়ে জীবন ধারণ করছ, তাতে অরুচি হবার কথা, তার ফলে মনও অপ্রসন্ন হয়। যব গোধূম তণ্ডুল মুদগাদি চাও? দুগ্ধবতী ধেনু চাও? ঘৃত তৈল গুড় লবণ হরিদ্রা আর্দ্রক চাও? দশ বিশ কলস উত্তম আসব পাঠিয়ে দেব? পৈষ্টী মাধ্বী আর গৌড়ী মদিরা মৈরেয় আর দ্রাক্ষেয় মদ্য, সবই দ্বারকায় প্রচুর পাওয়া যায়। এখানে বোধ হয় তালরস ভিন্ন কিছুই মেলে না।
দ্রৌপদী হাত নেড়ে বললেন, ওসব কিছুই চাই না। মাধব, তুমি তো মহাপণ্ডিত, লোকে তোমাকে সর্বজ্ঞ বলে। আমার দুর্ভাগ্যের কারণ কি তা বলতে পার? আমার তুল্য হতভাগিনী আর কোথাও দেখেছ?
