—পুরুষের সঙ্গে আপনার বিয়ে হয়েছিল নাকি?
—হাঁ মশায়। আমি বিয়ে পাগলা নই, এমন কিছু বুড়োও হই নি, তবু আমাকে ঠকিয়েছিল। পরদিন হেবোকে গালাগাল দিতেই সে বলল, কি সর্বনাশ, দেশের লোককে বিশ্বাস করবার জো নেই। ওই বজ্জাত নিমাই মিত্তিরটার এই কাজ, নিজের শালীপো মটরাকে কনে সাজিয়ে ঠকিয়েছে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন দাদা, নিমে শালাকে আমি দেখে নেব। যা হবার হয়ে গেছে, এখন মটরাকে গোটা পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বিদেয় করুন, নইলে আদালতে খোরপোশের দাবি করবে।
আমি বললাম, খুব করুণ ইতিহাস নীলকণ্ঠবাবু। কিন্তু পনেরো মিনিট কাবার হতে চলল, এখনও তো আপনি মরলেন না।
—আঃ, ব্যস্ত হন কেন। বিদ্যাসাগর লিখেছেন, মরণের অবধারিত কাল নাই। বিষ খেলেই যে বাঁধাধরা সময়ের মধ্যে মরতে হবে এমন কোনও নিয়ম নেই, মানুষের ধাত অনুসারে কিছু এদিক ওদিক হয়। আচ্ছা, আমার নাড়ীটা একবার দেখুন তো, বড্ড যেন কাহিল ঠেকছে।
নাড়ী দেখে আমি বললাম, দিব্যি সুস্থ সবল লোকের নাড়ী, ক্ষীণে বলবতী প্রাণঘাতিকা নয়। আপনি এখনই মরবেন না নীলকণ্ঠবাবু, অনর্থক আমাকে আটকে রেখেছেন। আমি এখন উঠি।
—আপনি তো ভারী স্বার্থপর লোক মশায়! একটা মানুষ মরতে বসেছে, তার শেষ অনুরোধ রাখবেন না? পনেরো মিনিটের জায়গায় না হয় বিশ কি পঁচিশ মিনিটই হল। যা বলছিলাম শুনুন। হেবো আমাকে বলল, আবার আপনার বিয়ে দেব দাদা, আমাদের ভজু—মামাকে লাগিয়ে দেব, তুখড় লোক, তাকে কেউ ঠকাতে পারবেন না। আপনি এখন কলকাতায় ফিরে যান, ভজু—মামা পাত্রী স্থির করেই আপনার সঙ্গে দেখা করবে।
—তবে আপনি মরতে চান কেন! বিবাহ তো হবেই।
—আর বিশ্বাস করি না মশায়, এখন ইহলোক ছেড়ে চলে যাওয়াই ভাল মনে করি।
—কোথায় যেতে চান স্বর্গে?
—রাম বল, স্বর্গেও ভেজাল। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ইন্দ্র বরুণ সব পালিয়েছেন, এখানকার অবতাররা সেখানে গিয়ে জাঁকিয়ে বসেছেন। আমি মঙ্গল গ্রহে যাব স্থির করেছি। পরশু শেষ রাত্রে স্বপ্ন দেখেছিলাম—
আমি উঠে পড়ে বললাম, মাপ করবেন নীলকণ্ঠবাবু, আমাকে এখন যেতেই হবে। আপনার মৃত্যুর ঢের দেরি, বহু বৎসর বাঁচবেন। আপনার বন্ধু বঙ্কিম ডাক্তার আপনাকে ঠকিয়েছেন। আচ্ছা বসুন, নমস্কার।
নীলকণ্ঠবাবু আমাকে ফেরাবার জন্য চিৎকার করতে লাগলেন, কিন্তু আমি আর দাঁড়ালাম না।
পরদিন ঘুম থেকে উঠেই মনে হল, আহা, পাগল লোকটিকে একলা ফেলে এসেছি, আজ একবার খোঁজ নেওয়া উচিত। ডাক্তার বঙ্কিম পালকে চিনি, বেলা নটার সময় তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হলাম।
নীলকণ্ঠবাবু নীচের বারান্দায় বসে সিগারেট টানছেন। আমাকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, আসুন আসুন সুশীলবাবু। দেখুন জগতে আপনিই একমাত্র খাঁটি মানুষ, আমার বন্ধু বঙ্কিম ডাক্তারও ভেজাল চালিয়েছে, হাইড্রোসায়ানিকের বদলে বাদামের শরবৎ খাইয়েছে। নেহাৎ বন্ধু লোক, নইলে পুলিসে খবর দিতাম।
আমি বললাম, বঙ্কিম ডাক্তার খুব ভাল কাজ করেছেন, তিনি আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু তাই আপনার বেয়াড়া অনুরোধ রাখেন নি।
এই সময় একটি লোক এসে বলল, নীলকণ্ঠ তবলদার এখানে থাকতেন?
নীলকণ্ঠ বললেন, আপনি কে মশায়?
—আমি সম্পর্কে নীলকণ্ঠের মামা হই, ভজু—মামা চালতাডাঙার হেবো আমাকে পাঠিয়েছে।
নীলকণ্ঠ ভয় পেয়ে চুপি চুপি আমাকে বললেন, আপনিই কথা বলুন দাদা, আমি আর ওদের ফাঁদে পা দিচ্ছি না।
আমি প্রশ্ন করলাম, কি দরকার আপনার?
—বড়ই দুঃসংবাদ, নীলকণ্ঠ বেচারা মারা গেছে।
আমরা দুজনেই চমকে উঠে বললাম, অ্যাঁ, বলেন কি!
—হ্যাঁ মশায়। কাল সন্ধ্যেয় কলকাতায় পৌঁছেই সোজা এখানে এসেছিলাম, একটা ভাল সম্বন্ধ পেয়েছি কিনা। এসে দেখি নীলকণ্ঠ নেই, ডাক্তারবাবুও বেরিয়ে গেছেন। একটি ছোকরা কম্পাউণ্ডার বলল, নীলকণ্ঠবাবু চার আউন্স বিষ নিয়ে লেকে গেছেন, তাঁর মতলব ভাল নয়, এখনই সেখানে গিয়ে খবর নিন। গিয়ে শুনলাম, লেকের ধারে একটা লাশ পাওয়া গেছে, পুলিস মর্গে চালান দিয়েছে।
আমি বললাম, লেকে তো প্রায়ই লাশ পাওয়া যায়, ও জায়গাটা হলো হতাশ প্রেমের ভাগাড়। নীলকণ্ঠবাবু কি দুঃখে মরবেন?
ভজু—মামা বললেন, না মশায়, আপনি জানেন না, নির্ঘাৎ নীলকণ্ঠ। বেচারা বিয়ে করে হতাশ হয়েছে কিনা। আমি তখনই ছুটে মর্গে গেলাম, কিন্তু ঢুকতে পেলাম না। বলল, এখন ঘর বন্ধ, কাল সকালে এসো। আজ সকালে আবার সেখানে গেলাম। সারি সারি সব শুয়ে আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে আমাদের নীলকণ্ঠ। হেবোর কাছে তার চেহারার যেমন বর্ণনা শুনেছি হুবহু মিলে গেল।
নীলকণ্ঠ এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন। এখন আতঙ্কিত হয়ে বললেন, বয়স কত?
—তা পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে।
—বলেন কি! রং ফরসা না ময়লা?
—ময়লাই বটে।
—তবেই তো সর্বনাশ! গায়ে কোট না পাঞ্জাবি?
—পাঞ্জাবি। ধুতির ওপর আজকাল কেউ কোট পরে না মশায়, পশ্চিমে বাঙালী ছাড়া।
—গোঁফ আছে না নেই? পায়ে কি রকম জুতো?
—গোঁফ আছে বই কি। পায়ে কাবুলী জুতো।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নীলকণ্ঠ বললেন, তবে সে লাশ আমার নয়। আমি পাঞ্জাবি পরি না, গোঁফ রাখি না, কাবুলী জুতোও আমার নেই। যাক, বাঁচা গেল। মরবার মতলবটা এখন ছেড়ে দিয়েছি।
আমি বললাম, ভগবান আপনাকে রক্ষা করেছেন নীলকণ্ঠবাবু।
