আর কেউ হঠাৎ এমন প্রশ্ন করলে ধমক দিতাম, কিন্তু এর উপর রাগ হল না। বললাম, আমার নাম সুশীলচন্দ্র চন্দ্র, কাছেই থাকি একুশ নম্বর কার্তিক নশকর লেন। কেন বলুন তো?
ভদ্রলোক নোটবুক বার করে একটা পাতা ছিঁড়ে খচখচ করে কিছু লিখলেন। তারপর কাগজটি মুড়ে আমাকে বললেন, ধরুন, পকেটে রেখে দিন, হারাবেন না যেন।
আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এ কাগজ নিয়ে আমি কি করব! আপনার নাম কি মশায়?
—আমার নাম শ্রী নীলকণ্ঠ তবলদার। হাল ঠিকানা প্লট নম্বর পঞ্চান্ন, কপিল রোড এক্সটেনশন, ডাক্তার বঙ্কিম পালের বাড়ি। কাগজটা যত্ন করে রাখবেন, আপনি যাতে বিপদে না পড়েন তার জন্য লিখে দিয়েছি।
—বিপদে পড়ব কেন?
—পুলিশ আপনাকে নিয়ে টানাটানি করতে পারে তাই লিখে দিয়েছি—আমার মৃত্যুর জন্যে আমি ভিন্ন আর কেউ দায়ী নয়।
—আপনারই বা মৃত্যু হবে কেন?
নীলকণ্ঠ তবলদার চক্ষু বিস্ফারিত করে বিকৃতমুখে একটু হেসে বললেন, বিশ্বাস হচ্ছে না? তবে এই দেখুন। … বলে পকেট থেকে একটা শিশি বার করে ঢকঢক করে সবটা খেয়ে ফেললেন।
লোকটির কাণ্ড দেখে ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, একি করলেন! আমি লোক ডাকছি—
নীলকণ্ঠ বজ্রমুষ্টিতে আমার হাত ধরলেন এবং পকেট থেকে একটা ছুরি বার করে বললেন, খবরদার উঠবেন না বলছি, তাহলে আমার টুঁটি কেটে ফেলব।
বদ্ধ পাগল। একে বাঁচানো যাবে কী করে? কাছাকাছি কেউ নেই, দূরে কয়েক জন বেড়াচ্ছে। চিৎকার করে ডাকতে যাচ্ছি, নীলকণ্ঠ আমার মুখ চেপে ধরে বললেন, খবরদার টুঁ শব্দটি করলেই আমি নিজেকে জবাই করব।
বললাম, আপনার মতলবটা কি মশায়? একাই তো মরতে পারতেন, আমাকে ডাকবার কি দরকার ছিল?
নীলকণ্ঠ একটু নরম হয়ে বললেন, রাগ করবেন না সুশীলবাবু। অন্তিম মুহূর্তে আমার ইতিহাসটি আপনাকে শোনাতে চাই, নইলে মরেও শান্তি পাব না।
—আপনি তো এখনই মরবেন, ইতিহাস শোনাবেন কখন?
নীলকণ্ঠ তাঁর হাতঘড়ি দেখে বললেন, এখন সওয়া ছটা, সাড়ে ছটা পর্যন্ত সময় পাওয়া যাবে। পনেরো মিনিট পরে মরব।
—কি খেয়েছেন?
—হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিড। শিশিটা শুঁকে দেখুন, বাদামের গন্ধ পাবেন।
—ও জিনিস খেলে তো সঙ্গে সঙ্গে মরবার কথা। এখনও বেঁচে আছেন কি করে?
—হুঁ হুঁ, এটি আমারই আবিষ্কার দাদা। ফটোগ্রাফি করেছেন কখনও? এক্সপোজ করে দোকানে ফিল্ম দিলেন, সব কাজ তারাই করে দিল, সে রকম ফাঁকির ফোটোগ্রাফি নয়। নিজে ডেভেলপ করেছেন কখনও? পটাশ ব্রোমাইডে কি হয় জানেন? রিটার্ডেশন হয়, ছবি ফুটে উঠতে দেরি হয়। যা খেয়েছি তাতে টু পারসেণ্ট হাইড্রোসায়নিক অ্যাসিড আর তিন গ্রেন ব্রোমাইড আছে, তার ফলে বিষক্রিয়া পিছিয়ে গেছে। বুঝতে পারছেন না? সিদ্ধির সঙ্গে মাকড়শার ঝুল মিশিয়ে খেলে জোর নেশা হয় জানেন তো? একে বলে সিনারজিস্টিক এফেক্ট। কিন্তু ঝুলের বদলে যদি ইঁদুর—নাদি মেশান তবে নেশা ধরতে দেরি হবে, কারণ ইঁদুর—নাদি হল অ্যাণ্টি সিনারজিষ্টিক। পটাশ ব্রোমাইডের ক্রিয়াও সেই রকম। পাস করি নি বটে, কিন্তু বাড়িতে বিস্তর পড়েছি, হেন সায়েন্স নেই যা জানি না। আমার বন্ধু বঙ্কিম পাল তার ডিসপেনসারিতে আমারই প্রিসক্রিপশন মাফিক মিকশ্চার বানিয়ে দিয়েছে।
—বন্ধু হয়ে আপনাকে বিষ দিলেন?
—তা না দেবে কেন। আমার প্রাণ আমার নিজের সম্পত্তি, নির্বূঢ় স্বত্বে ভোগ দখল করতে পারি, যেমন খুশি দান বিক্রয় বা ধ্বংসের অধিকারও আমার আছে। আপনাদের আইন আমি গ্রাহ্য করি না। বঙ্কিম ডাক্তারও উদার লোক, তার প্রেজুডিস মোটেই নেই। সে তার বন্ধুর অন্তিম অনুরোধ পালন করেছে।
—শুধু শুধু মরছেন কেন?
—শুধু শুধু নয় মশায়। এই পৃথিবীর ওপর ঘেন্না ধরে গেছে, কেবল ভেজাল নকল ঠকামি আর জোচ্চুরি। এই সামনের দুটো দাঁত দেখুন, কাঁকর মিশানো চাল খেয়ে ভেঙ্গে গেছে। পাঁচটি বচ্ছর ড্রপসিতে ভুগেছি, ভেজাল সরষের তেল খেয়ে। দু বছর ধরে সর্দিতে ভুগছি, মুরগির মাংস বলে ব্যাটারা কচ্ছপ খাইয়েছে। তেল ঘি দুধ দই মশলা সর্বত্র ভেজাল। কংগ্রেস সরকারও ভেজাল, সর্বত্যাগী গান্ধীজীর নাম করে সমস্ত ক্ষমতা হাতিয়েছে আর মোটা মোটা মাইনে দিয়ে এক পাল খাঞ্জা খাঁ নবাব পুষছে। কমিউনিস্ট পার্টিও ভেজাল, দেশ সুদ্ধ লোককে ভেড়া বানিয়ে ডিকটেটরি চালাবার মতলব। অধিক কি বলব মশায়, বিবাহে পর্যন্ত ভেজাল। আর সব কোনও রকমে সইতে পারি, কিন্তু ভেজাল বউ অসহ্য।
—ভেজাল বউ কি রকম? কালো মেয়ে রং মেখে আপনাকে ঠকিয়েছে নাকি?
—আরে না মশায়, কালোতে আমার কোনও আপত্তি নেই। আমি নিজেই বা কোন ফরসা।
—কুলকন্যা সেজে কুলটা আপনার ঘরে এসেছে?
—তা হলে তো উপায় ছিল, শুদ্ধি অর্থাৎ ডিসইনফেক্ট করিয়ে নিয়ে সংসার ধর্ম করতাম। বলছি শুনুন। আমি ছেলেবেলা থেকেই প্রবাসী। বাবা ডোংগরগড়ে কাঠের কারবার করতেন, তিনি গত হবার পর আমিও তা করছি। বন্ধুরা বলল, ওহে নীলকণ্ঠ বুড়ো হতে চললে, এইবারে একটি বউ আন। কথাটা মনে লাগল, তাই বিবাহ করবার জন্যে কলকাতায় এলাম। বঙ্কিম ডাক্তার আমার বাল্যবন্ধু, সে ছাড়া কলকাতায় আমার চেনা লোক নেই। তার বাড়িতেই আছি। হঠাৎ একদিন হেবো এসে উপস্থিত। তাকে আগে কখনও দেখি নি, পরিচয় দিল—সে আমার দূর সম্পর্কের পিসতুতো ভাই। খুব চালাক ছোকরা। আমাকে বলল, শুনুন দাদা, শহুরে মেয়েরা রাবিশ, আমাদের গ্রামে চলুন, খুব ভাল পাত্রী আমার সন্ধানে আছে। হেবোর সঙ্গে চালতাডাঙায় গেলাম, খরচের জন্যে তিন শ টাকাও তাকে দিলাম। পাত্রীটি দেখলাম নেহাত মন্দ নয়। নম নম করে বিবাহ হয়ে গেল। তারপর ফুলশয্যার রাত্রে একলা পেয়ে কনে আমাকে কি বলল জানেন? —ও মোসাই, দুটো সিগ্রেট দিন তো, সমস্ত দিন না খেয়ে ভোচকানি লেগেছে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে চাইতেই বলল, ঘাবড়াও কেন প্রাণনাথ? ক্যায়সা বউ পেয়েছ দেখ না ঠাওর করে। আমার চাঁদমুখে একবার হাতটি বুলিয়ে দেখ, দু নম্বর শিরিষ কাগজের মতন ঠেকছে না? দু দিন পরে দেখবে ইয়া মোচ ইয়া দাড়ি।
