—সেই পাত্রের পরিচয় আপনি জানেন?
—তার সঙ্গেই কথা বলছি। নাম রাখাল মুস্তৌফী, স্কুল মাস্টার, নিজেকে খুব বড় কবি মনে করে, যদিও তার একটা কবিতাও এ পর্যন্ত ছাপা হয় নি।
—নিজেকে বড় মনে করা কি দোষের?
—বোকা লোকের পক্ষে দোষের, তোমার আর আমার মতন বুদ্ধিমানের পক্ষে দোষের নয়।
—তারপর বলে যান।
—নূতন রানী সাবিত্রী বহুদিন পীড়িত ছিলেন। তাঁকে খুশী করে বশে আনবার জন্য রাজা চেষ্টার ত্রুটি করেন নি, বিস্তর অলংকার মায় নীল তারা দিয়েছিলেন, বাসের জন্য আলাদা মহল আর অনেক দাসদাসীও দিয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষার জন্য, মিশন স্কুলের সিস্টার থিওডোরাকে বহাল করেছিলেন। কিন্তু বিবাহের পাঁচ মাস পরেই রাজা মাতাল অবস্থায় পড়ে গিয়ে জখম হয়ে শয্যা নিলেন। নূতন রানী তাঁর টীচারের সঙ্গেই সময় কাটাতে লাগলেন।
—সাবিত্রী এখন কোথায় আছে তাই বলুন।
—ব্যস্ত হয়ো না, সব কথা একে একে বলছি। রাজার মৃত্যুর পর নূতন রানীর উপর কড়া পাহারা বসল। তিনি খুব বুদ্ধিমতী, সিস্টার থিওডোরার সঙ্গে পরামর্শ করে পালাবার ব্যবস্থা করলেন। একদিন দুপুর রাত্রে চুপি চুপি রাজবাড়ি ত্যাগ করলেন, সঙ্গে নিলেন কিছু টাকা আর অলংকার এবং একজন বিশ্বস্ত দাসী। নীল তারা নিয়ে যাবার ইচ্ছা তাঁর ছিল না, কিন্তু থিওডোরার সনির্বন্ধ অনুরোধে তাও নিলেন। তারপর কলকাতায় এসে মিস সিসিলিয়া ব্যানার্জি নামে এক বাঙালী খ্রীষ্টান মহিলার বাড়িতে উঠলেন। থিওডোরাই সে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
—সাবিত্রীর সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে?
—হয়েছে। রানী বললেন, আমি রাজবাড়ি থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন হয়েছি, এখানে এক মেয়ে স্কুলে চাকরিও যোগাড় করেছি। নীল তারা আমি রাখতে চাই না, আপনি নিয়ে যান, কুমারকে দেবেন। আমি বললাম, বিনামূল্যে দেবেন কেন, আপনার আর মুস্তৌফীর উপর যে অত্যাচার হয়েছে তার খেসারত আদায় করে তবে দেবেন। রানী বললেন, আমার কিছু স্থির করবার শক্তি নেই, মামা মামীও বেঁচে নেই যে তাঁদের উপদেশ নেব। আপনি মুস্তৌফীর সঙ্গে কথা বলবেন, তিনি যা বলবেন তাই হবে। মুস্তৌফী, তোমার উপর তাঁর খুব শ্রদ্ধা আছে, গ্রেট রিগার্ড।
—তিনি কি খ্রীষ্টান হয়েছেন?
—সিস্টার থিওডোরা তার জন্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রানী মোটেই রাজী হন নি।
—রানী বলবেন না, বলুন সাবিত্রী দেবী।
—ভেরি ওয়েল, সাবিত্রী দেবী, দি গডেস সাবিত্রী। দেখ ওআটসন, প্রেমে পড়লে নজর খুব উঁচু হয়, মনের ম্যাগনিফাইং পাওআর বেড়ে যায়। তোমার বিবাহের আগেও এই রকম দেখেছিলাম।
হোমস তাঁর পকেট থেকে একটি বাক্স বার করে খুলে দেখালেন—সোনার ফ্রেমে বসানো নীল তারা, সুপারির মতন গড়ন, কিন্তু আরও বড়, ফিকে ঘোলাটে নীল রং, ভিতরে উজ্জ্বল তারার মতন একটি চিহ্ন, তা থেকে ছ দিকে ছটি রশ্মি বেরিয়েছে।
হোমস বললেন, বহু কোটি বৎসর পূর্বে ভূগর্ভে তরল উত্তপ্ত অ্যালুমিনা ধীরে ধীরে জমে গিয়ে এই রত্ন উৎপন্ন হয়েছিল। এর বাজার দর খুব বেশী হবে না, বড় জোর দশ হাজার টাকা। কিন্তু কুমার যখন এর অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস করেন আর ফিরে পাবার জন্য লালায়িত হয়েছেন তখন তাঁকে চড়া দাম দিতে হবে। মুস্তৌফী, বল কত টাকা আদায় করব?
রাখাল বলল, আমার মাথা গুলিয়ে গেছে, যা স্থির করবার আপনিই করুন।
—কবিদের বিষয়বুদ্ধি বড় কম, অবশ্য অনারেবল এক্সেপশন আছে, যেমন লর্ড টেনিসন। শোন মুস্তৌফী আমি চার লাখ আদায় করব, সাবিত্রী দেবীর দুই, তোমার দুই। এর বেশী চাইলে কুমার ভড়কে যেতে পারেন। তা ছাড়া আমাদের এদেশে আসার খরচ আর পারিশ্রমিকও তাঁকে দিতে হবে। ব্যাংক অভ বেঙ্গলে সাবিত্রীর অ্যাকাউন্ট আছে, কুমার সেখানে চার লাখ জমা দিলেই তাঁকে নীল তারা সমর্পণ করব। আজ সন্ধ্যায় তিনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন।
—সাবিত্রীর ঠিকানা কি?
—তিন নম্বর কর্নওআলিস থার্ড লেন। মুস্তৌফী, আজই বিকালে তাঁর কাছে যেও। আশা করি তোমার কুসংস্কার নেই, বিধবা হলেও বাগদত্তা পাত্রীকে বিবাহ করতে রাজী আছ?…তবে আর ভাবনা কি, go, woo and win her। কাল সকালে হোটেলে আমার সঙ্গে দেখা ক’রো। গুড বাই।
ওআটসন বললেন, এক্সকিউজ মি মুস্তৌফী বাবু দাড়িটা কামিয়ে ফেলো। গুড বাই।
রাখাল বিকালে চারটের সময় সাবিত্রীর কাছে গিয়ে রাত সাড়ে আটটায় ফিরে এল। তার ছাত্র নারান বারান্দায় বসে ছিল। রাখাল বলল, কে ও নারান নাকি? হ্যারিকেনটা উসকে দে।
আলো বাড়িয়ে দিয়ে নারান বলল, একি মাস্টার মশায়, আপনাকে যে চেনাই যায় না!
—দাড়িটা কামিয়ে ফেলেছি। এত রাত্রে তুই যে এখানে?
—বাঃ ভুলে গেছেন! আপনি যে বলেছিলেন, আজ সন্ধ্যেবেলা ব্যাটল অভ সেজমুর পড়াবেন।
—দুত্তোর সেজমুর, ও আর একদিন হবে। আজ ট্রামে আসতে আসতে কি একটা বানিয়েছি শুনবি?—বরষে ধারা, ভূমি শীতল, তাপিত তরু পেয়েছে জল; টানিছে রস তৃষিত মূল, ধরিবে পাতা ফুটিবে ফুল। তোদের হেম বাঁড়ুজ্যে নবীন সেন পারে এমন লিখতে?
১৩৬১ (১৯৫৪)
নীলকণ্ঠ
লেকের ধারে তিন বার চক্কর দিয়েছি, সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাড়িমুখো হব এমন সময় কাতর কণ্ঠস্বর কানে এল—ও মশায়, দয়া করে আমার কাছে একটু বসুন না।
ভদ্রলোক একটা বেঞ্চে একা বসে আছেন। রোগা চেহারা, চুল উস্ক খুস্ক, দাড়িও সম্প্রতি কামান নি। বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। মুখ দেখে মনে হল শারীরিক বা মানসিক কষ্ট ভোগ করছেন। আমি তাঁর পাশে বসতেই বললেন, আপনার নাম আর ঠিকানা?
