জগবন্ধু বললেন, আমারও মুখে দুপাটি নকল দাঁত এসে গেছে। সব তো হল, এখন বাড়ি গিয়ে বলবে কি? দু—হপ্তা আমরা গায়েব হয়ে আছি, তার একটা ভাল রকম কৈফিয়ত দেওয়া চাই।
—সে তুমি ভেবো না। তুমি তা পারবেও না, চিরকাল মাস্টারি করে ছেলেদের শিখিয়েছ—সদা সত্য কথা কহিবে। যা বলবার আমিই বলব। আজ রাতে আর বাড়ি গিয়ে কাজ নেই, হোটেলে ফিরে চল।
হোটেলে এসে দেখলেন, তাঁদের ঘরে চার জন বিছানা পেতে শুয়ে আছে। উদ্ধব ম্যানেজারকে বললেন, আচ্ছালোক তো আপনি, কিছু না জানিয়ে আমার রিজার্ভ করা ঘরে অন্য লোক ঢুকিয়েছেন! এর মানে কি?
ম্যানেজার আশ্চর্য হয়ে বললেন, কে আপনারা?
—ন্যাকা, চিনতে পারছেন না! উমেশ পাল আর জলধর গাঙ্গুলী। উনিশে বোশেখ মানে দোসরা মে বুধবার থেকে দু—হপ্তা এই ঘর আমাদের দখলে আছে।
—দু—হপ্তা বলছেন কি মশাই, নেশা করেছেন নাকি? আজই তো বুধবার দোসরা মে উনিশে বোশেখ।
উদ্ধবকে টেনে নিয়ে রাস্তায় এসে জগবন্ধু বললেন, সবই ধুস্তুরী মায়া। গত দু—হপ্তা জগতের ইতিহাস থেকে একেবারে লোপ পেয়ে গেছে। এখন বাড়ি চল।
রাত প্রায় বারোটার সময় জগবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে উদ্ধব নিজের বাড়িতে পৌঁছলেন। উদ্ধব—গৃহিণী কালিদাসী তারস্বরে বললেন, বলি দুপুর রাত পর্যন্ত দুই ইয়ারে ছিলে কোন চুলোয়? ওঁর লক্ষ্মী না হয় ছেড়ে গেছে তোমার তো ঘরে একটা আপদ—বালাই আছে। দেরি দেখে মানুষটা ভেবে মরছে সে হুঁশ হয় নি বুঝি?
উদ্ধব হাঁপাতে হাঁপাতে কান্নার সুরে বললেন, ওঃ গিন্নী, তোমার শাখা—সিঁদুরের জোরে আর এই জগু ভাই—এর হিম্মতে আজ প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছি। সন্ধ্যার সময় দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ঘাটে গঙ্গার ধারে বসেছিলুম। ভাবলুম মুখ হাত পা ধুয়ে নিই, তার পর মায়ের আরতি দেখব। যেমন জলে নাবা অমনি এক মস্ত কুমির পা কামড়ে ধরে টেনে নিয়ে চলল–
উদ্ধবের দু পায়ে হাত বুলিয়ে কালিদাসী বললেন, কই দাঁত বসায় নি তো!
–ফোকলা কুমির গিন্নী, একদম ফোকলা। ভাগ্যিস কুমিরটা বুড়ো ছিল তাই পা বেঁচে গেছে। আমার বিপদ দেখে জগু লাঠি নিয়ে লাফিয়ে জলে পড়ল। এক হাতে সাঁতার দেয়, আর এক হাতে ধপাধপ লাঠি চালায়। শেষে চাঁদপাল ঘাটে এসে কুমিরটা মারের চোটে কাবু হয়ে আমাকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেল। তার পর এক ময়রার দোকানে উনুন—পাড়ে বসে জামাকাপড় শুকিয়ে ঘরে ফিরেছি।
কালিদাসী বললেন, মা দক্ষিণেশ্বরী রক্ষা করেছেন, কালই পূজো পাঠাব। রান্না সব জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে, গরম করে দিচ্ছি, লুচিও এখনি ভেজে দিচ্ছি। ততক্ষণ তোমরা মুখ হাত পা ধুয়ে একটু জিরিয়ে নাও। গাঙ্গুলী মশায়ের বাড়ি খবর পাঠাচ্ছি, উনি এখানেই খেয়ে দেয়ে যাবেন এখন।
উদ্ধব বললেন, নিশ্চয় নিশ্চয়, এখানেই খাবে হে জগু, এখানেই খাবে। গিন্নীর রান্না তো নয়, অমৃত।
১৩৫৭ (১৯৫০)
নবজাতক
সোমনাথের বউ উমা আসন্নপ্রসবা। পাশের ঘরে ডাক্তার নার্স ধাই মোতায়েন আছে। বাইরের বসবার ঘরে শুভাকাঙ্ক্ষী স্বজনবর্গ অপেক্ষা করছে, উমা আর সোমনাথ দুজনেরই ইচ্ছে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবামাত্র যেন সকলের আশীর্বাদ পায়। সোমনাথ অস্থির হয়ে এ ঘর ও ঘর করে বেড়াচ্ছে। ডাক্তার বার বার তাকে বোঝাচ্ছেন, অত উতলা হচ্ছেন কেন, হলেনই বা প্রথম পোয়াতী, আপনার স্ত্রীর স্বাস্থ্য তো বেশ ভালই, কিছুমাত্র চিন্তার কারণ নেই।
সন্ধ্যা সাড়ে সাত। উদীয়মান জ্যোতিঃসম্রাট তারক সান্যাল তার হাতঘড়ি দেখে বলল, রেডিওর সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছি, কারেক্ট টাইম। যদি ঠিক আটটা পাঁচ মিনিটে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তবে সে রাজচক্রবর্তী হবে। ডাক্তারের উচিত ততক্ষণ ছেলেকে ঠেকিয়ে রাখা।
নাস্তিক ভুজঙ্গ ভঞ্জ বলল, যত সব গাঁজা। তোমাদের জ্যোতিষ তো আগাগোড়া ভুল, জন্মক্ষণ ঠিক করেই বা কি হবে? যে আসছে সে তোমার কথা শুনবে না, ডাক্তারের বাধাও মানবে না, নিজের মর্জিতে যথাকালে বেরিয়ে আসবে। আর, ছেলে হবে তাই বা ধরে নিচ্ছ কেন?
—নির্ঘাত ছেলে হবে। আমি সোমনাথের বউএর কররেখা দেখেছি, তা ছাড়া খনার ফরমুলা কষে ভাগশেষ এক পেয়েছি—একে সূত দুইএ সূতা তিন হইলে গর্ভ মিথ্যা।
সোমনাথ হঠাৎ ছুটে এসে মাথার চুল টেনে বলল, ওঃ, আর তো যন্ত্রণা দেখতে পারি না। কি পাপই করেছি, আমার জন্যেই এত কষ্ট পাচ্ছে।
সোমনাথের ভগিনীপতি পাঁচুবাবু বললেন, তোমার মুণ্ডু। পাপ কিচ্ছু কর নি, মানবধর্ম পালন করেছ, বউকে শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছ। না দিলে চিরকাল গঞ্জনা খেতে। তবে হাঁ, যদি তাকে তিন বারের বেশি আঁতুড় ঘরে পাঠাও তবে তোমাকে বর্বর স্বার্থপর সমাজদ্রোহী বলব। কুইন ভিকটোরিয়ার যুগ আর নেই, গণ্ডা গণ্ডা সন্তানের জন্ম দিলে দেশের লোক কৃতার্থ হবে না।
পণ্ডিত হরিবিষ্ণু সত্যার্থী বললেন, ওহে সোমনাথ, বউমাকে জম্ভলার নাম নিতে বল। অস্তি গোদাবরীতীরে জম্ভলা নাম রাক্ষসী, তস্যাঃ স্মরণমাত্রেণ গর্ভিণী বিশল্যাভবেৎ। অর্থাৎ গোদাবরীর তীরে জম্ভলা রাক্ষসী থাকে, তার নাম স্মরণ করলেই গর্ভিণীর যন্ত্রণা দূর হয়ে সুপ্রসব হয়।
তারক জ্যোতিষী বলল, এখন নয়, আটটা বেজে তিন মিনিটের সময় জম্ভলার নাম নিতে বলবেন। কাল সকালেই আমি কোষ্ঠী গণনায় লেগে যাব, প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য সিদ্ধান্ত, ভৃগু আর জ্যাডকিল, দুটোরই সমন্বয় করব, প্রাচীন নবগ্রহ আর আধুনিক ইউরেনস, নেপচুন, প্লুটো কিছুই বাদ দেব না। দেখে নেবেন আমার ভবিষ্যৎ গণনা কি নির্ভুল হবে।
