পাঁচুবাবু বললেন, ভবিষ্যৎ তো পরের কথা, সন্তানের বর্তমান হালচাল কিছু বলতে পার?
—না, বর্তমান আমার গণ্ডির বাইরে, আমার কারবার শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে।
হরিবিষ্ণু সত্যার্থী বললেন, গীতায় আছে, জীবের শুধু মধ্য অবস্থা অর্থাৎ জীবিতাবস্থাই আমরা জানতে পারি, তার পূর্বে কি ছিল এবং মরণের পরে কি হবে তা অব্যক্ত। সোমনাথের সন্তান এখন অতীত আর বর্তমানের সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এ সম্বন্ধে আমাদের শাস্ত্রে যা আছে বলছি শুনুন। পরলোকবাসী মানবাত্মার পাপপুণ্যের ফলভোগ যখন সমাপ্ত হয় তখন সে মর্ত্যলোকে পতিত হয় এবং মেঘে প্রবেশ করে জলময় রূপ পায়। সেই জল বৃষ্টি রূপে পত্র পুষ্প ফল মূল ওষধি বনস্পতিতে সঞ্চারিত হয় এবং তা ভক্ষণের ফলে নরনারীর দেহে শুক্রও শোণিত উৎপন্ন হয়। গর্ভাধানকালে শুক্রের আধিক্যে পুরুষ, শোণিতের আধিক্যে স্ত্রী, এবং উভয়ের সমতায় ক্লীবের সৃষ্টি হয়। জরায়ুমধ্যস্থ ভ্রূণ প্রথম দিনে পঙ্কতুল্য, পাঁচ দিনে বুদবুদ, সাত দিনে পেশী, এক পক্ষে অর্বুদ, পঁচিশ দিনে ঘন, এবং এক মাসে কঠিন আকার পায়। দুই মাসে মস্তক, তিন মাসে গ্রীবা, চার মাসে ত্বক, পাঁচ মাসে নখ এবং রোম, ছমাসে চক্ষু কর্ণ নাসা আর মুখের সৃষ্টি হয়। সপ্তম মাসে ভ্রূণ স্পন্দিত হয়, অষ্টম মাসে বুদ্ধি যোগ হয়, এবং নবম মাসে সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পূর্ণতা পায়। জন্মের পরেই শিশুর অনুভূতি হয়। তারপর সে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, প্রাক্তন কর্ম অনুসারে সংসারে সুখদুঃখ ভোগ করে, এবং মৃত্যুর পরে পুনর্বার দেহান্তর পায়।
পাঁচুবাবু বললেন, ওহে প্রফেসর অনাদি, তোমাদের শাস্ত্রে কি বলে?
বায়োলজিস্ট অনাদি রায় বললেন, সত্যার্থী মশায় নেহাত মন্দ বলেন নি। আমরা যা জানি তা বলছি শুনুন। প্রথমে দুটি অতি ক্ষুদ্র কোষের সংযোগ, তা থেকে ক্রমশঃ অসংখ্য কোষের উৎপত্তি, তারই পরিণাম এই মানবদেহ। প্রথম কয়েক মাস ভ্রূণকে মানুষ বলে চেনা যায় না, মনে হয় মাছ টিকটিকি বা বেড়ালছানা। কোটি কোটি বৎসরে মানুষের যে ক্রমিক রূপান্তর হয়েছে, জরায়ুস্থ ভ্রূণ যেন তারই পুনরভিনয় করে। চার—পাঁচ মাসে তার চেহারা মানুষের মতন হয়, সে হাত—পা নাড়ে, মাঝে মাঝে মাথা দিয়ে গর্ভধারিণীকে গুঁতো মারে, হয়তো আঙুলও চোষে। গর্ভবাসকালে সে শ্বাস নেয় না, কিন্তু দেড় মাসের হলেই ভ্রূণের বুক ধুকধুক করতে থাকে। পুষ্টির জন্যে যা দরকার সবই তার মায়ের রক্ত থেকে ফুল বা প্লাসেণ্টার মধ্যে ফিলটার হয়ে গর্ভনাড়ী দিয়ে ভ্রূণের দেহে প্রবেশ করে। জরায়ুস্থ তরল পদার্থের মধ্যে সে যেন জলচর প্রাণী রূপে বাস করছিল, ভূমিষ্ঠ হয়েই সে হঠাৎ স্থলচর হয়ে যায়। দু—এক মিনিটের মধ্যেই সে শ্বাস নেবার চেষ্টা করে, খাবি খেয়ে কেঁদে ওঠে, নাক মুখ দিয়ে লালা বার করে ফেলে। নবজাত মনুষ্যশাবক লম্বায় এক হাতের কম, ওজনে প্রায় সাড়ে তিন সের, মাথা বড়, পেট লম্বা, হাত—পা ছোট ছোট। মা বাপ ভাই বোনের সঙ্গে তার চেহারার যতই মিল থাকুক, সে একজন স্বতন্ত্র অদ্বিতীয় মানুষ। প্রথম কয়েক মাস সে সমবয়সী ছাগলছানার চাইতেও অসহায়, কিন্তু তার পর তার শক্তি আর বুদ্ধি ক্রমশঃ বাড়তে থাকে।
হরিবিষ্ণু সত্যার্থী বললেন, অনাদিবাবু শুধু স্থূল দেহের উৎপত্তির বিবরণ দিলেন, কিন্তু মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার আর আত্মার কথা তো বললেন না।
অনাদি রায় বললেন, ওসব কিছুই জানি না সত্যার্থী মশায়, বলব কি করে?
সোমনাথ কান খাড়া করে ছিল, হঠাৎ একটা অস্ফুট আর্তনাদ শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল। তারক সান্যাল তার হাত—ঘড়িতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রইল। আর সকলে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ আওয়াজ এল—ওয়াঁ ওয়াঁ।
তারক জ্যোতিষী বলল, আটটা বেজে তিন মিনিট, আহাহা, আর দু মিনিট পরে হলেই খাসা হত। যাই হোক, আমার গণনায় ভুল হয়নি, পুত্র সন্তানই হয়েছে।
ভুজঙ্গ ভঞ্জ বলল, তা তুমি জানলে কি করে?
—ওই যে, হুলো বেড়ালের মতন ডেকে উঠল। মেয়ে হলে উয়াঁ উয়াঁ করত।
কবি শ্রীকণ্ঠ নন্দী এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। এখন বললেন তারকবাবুর কথা ঠিক। কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, জনক রাজা লাঙল চালাতে চালাতে হঠাৎ দেখলেন, মাটির ডেলা থেকে ছোট্ট একটি মেয়ে বেরিয়েছে, ‘উঙা উঙা করি কাঁদে যেন সৌদামিনী।’
ভুজঙ্গ ভঞ্জ বলল, তারকের মতন গুনে বলতে সবাই পারে। হয় ছেলে না হয় মেয়ে, এই দুটোর মধ্যে একটা যদি বাই চান্স মিলে যায় তাতে বাহাদুরিটা কি?
সোমনাথের ভাগনী তোতা শাঁখ বাজাতে বাজাতে এসে বলল, মামীর খোকা হয়েছে, এই অ্যাত্তো বড়, গোলাপ ফুলের মতন লাল টুকটুকে।
পাঁচুবাবু বললেন, লাল টুকটুকে রঙ একমাসের মধ্যেই নবঘনশ্যাম হয়ে যাবে। তোর মামা কি করছে রে?
—নার্স বলছে চলে যেতে, কিন্তু মামা ঘর থেকে নড়বে না, খালি খালি ছেলের দিকে চেয়ে আছে।
—হুঁ। প্রথম যখন ছেলে হল ভাবলুম বাহা বাহা রে, সোমনাথের সেই দশা হয়েছে। আর দেরি করে কি হবে, আমাদের আশীর্বাদটা এখনই সেরে ফেলা যাক। সোমনাথকে ডাকবার দরকার নেই, পরে জানিয়ে দিলেই চলবে। সে এখন পুত্রের চন্দ্রমুখ নিরীক্ষণ করতে থাকুক। সত্যার্থী মশায়, আপনিই আরম্ভ করুন।
