—পাকিস্থানে পড়েছে, অনেক কাল আদায় হয় নি। তবে ভাবনার কিছু নেই। খাঁ সায়েব বদরুদ্দিন আমার বাবার বন্ধু, তিনি বলেছেন সব আদায় করে দেবেন।
—তবেই হয়েছে। বেচে ফেল, বেচে ফেল।
—বেশ তো। আপনিই তার ব্যবস্থা করবেন।
—আচ্ছা। বৈষয়িক আলাপ তো এক রকম হল, এখন একটু প্রেমালাপ করা যাক। দেখ পদীরানী, আমার সঙ্গে দু দিন ঘর করলেই টের পাবে আমি কি রকম দিলদরিয়া চমৎকার লোক। পষ্ট করে বল দিকি—আমাকে মনে ধরেছে।
—তা ধরেছে।
একজন প্যাণ্ট—শার্ট পরা আধাবয়সী ভদ্রলোক পাইপ টানতে টানতে ঘরে ঢুকলেন। স্পন্দচ্ছন্দা দু পক্ষের পরিচয় করিয়ে দিলেন—ইনি হচ্ছেন মিস্টার মকর রায়, বার—অ্যাট—ল, সম্পর্কে আমার দাদা হন। আর ইনি উমেশ পাল, খুব ধনী পেণ্ট—মার্চেন্ট, আমার ভাবী বর।
মকর রায় বললেন, আরে তাই নাকি! এরই না আজ আসবার কথা ছিল? বাহাদুর লোক, এসেই হৃদয় জয় করেছেন, একেবারে ব্লিৎস ক্রিগ। কংগ্রাচুলেশন মিস্টার পাল, লাকি ডগ, ভাগ্যবান কুত্তা! এই বলে উদ্ধবের হাত সজোরে নেড়ে দিলেন। তারপর বললেন, স্পন্দার মতন মেয়ে লাখে একটি মেলে না মশাই, নাচ গান অ্যাকটিং সব তাতে চৌকস। সিনেমার লোকে সাধাসাধি করছে। এর কাঁচপোকা—নৃত্য যদি দেখেন তো অবাক হয়ে যাবেন।
—কাঁচপোকা নাচে নাকি?
—যখন তখন নাচে না, আরশোলা ধরার সময় নাচে।
স্পন্দচ্ছন্দা বললেন, জান মকর—দা, মিস্টার পাল হচ্ছেন একজন আদিম হি—ম্যান।
উদ্ধব প্রশ্ন করলেন, সে আবার কাকে বলে? হি—গোটই তো জানি।
মকর রায় বললেন, হি—ম্যান জানেন না? মদ্দা পুরুষ। আমাদের ঋষিরা যাকে বলতেন নরপুংগব বা পুরুষর্ষভ, অর্থাৎ যিনি ষাঁড়ের মতন শিং বাগিয়ে সোজা ছুটে গিয়ে লক্ষ্যস্থানে পৌঁছে যান। দেখুন মিস্টার পাল, যদি রঙের কারবার বাড়াতে চান তো আমাকে বলবেন। হুণ্ডাগড় স্টেটের সমস্ত খনি আমার হাতে, অজস্র গেরি মাটি আর এলা মাটি আছে। দুলাখ যদি ঢালেন তবে এক বছরেই তিন লাখ ফিরে পাবেন। আচ্ছা, সে কথা পরে হবে, আপনারা এখন আলাপ করুন, আমি ওপরে গিয়ে বসছি।
উদ্ধব বললেন,আরে না না, এইখানেই বসুন। আমার ঢাক—ঢাক গুড়—গুড় নেই মশাই, বিশেষত আপনি যখন সম্পর্কে শালা। দেখুন মকরবাবু, আপনার এই বোনটি হচ্ছেন আমার মার্গিতব্যা।
—সে আবার কি চিজ?
—জানেন না? চিরকাল খোঁজবার আর চাইবার জিনিস। একজন হেডমাস্টার কথাটির মানে বলে দিয়েছেন। আচ্ছা, আজকের মতন উঠি, তামাক খেতে হবে, আপনাদের এখানে তো সে পাট নেই। না না, সিগারেট ফিগারেট চলবে না, গুড়ুক চাই। কাল বিকেলে আবার আসব, গড়গড়া আর তামাকের সরঞ্জামও সব নিয়ে আসব। হাঁ, ভাল কথা—আমার আর একটু জানবার আছে। হ্যাঁগা পদীরানী, শুক্ত, মোচার ঘণ্ট, ছোলার ডালের ধোঁকা–এসব রাঁধতে জান?
স্পন্দচ্ছন্দা ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, ওসব আমি খাই না।
—আমি খেতে ভালবাসি। আচ্ছা, মাগুর মাছের কালিয়া, ইলিশের পাতুরি, ভাপা দই—এসব করতে জান?
—ও তো বাবুর্চীর কাজ।
—তবে কি ছাই জান! এসব রান্না বাবুর্চীর কাজ নয়, গিন্নীরই করা উচিত। তোমার নাচ দেখে তো আমার পেট ভরবে না।
—ও, আপনি রাঁধুনি গিন্নী চান! একটা কেষ্টদাসী কি কালিদাসী ঘরে আনলেই পারতেন।
হঠাৎ রেগে গিয়ে উদ্ধব বললেন, কি বললে! কালিদাসীর সামনে তুমি দাঁড়াতে পার নাকি?
—অত রাগ কেন মশাই, তিনি বুঝি আপনার আগেকার গিন্নী?
উদ্ধব গর্জন করে বললেন, আগেকার কি, দস্তুর মত জলজ্যান্ত এখনকার! তার কাছে তুমি? তরমুজের কাছে তেলাকুচো, কামধেনুর কাছে মেনী বেড়াল!
স্পন্দচ্ছন্দা চিৎকার করে বললেন, অ্যাঁ, এক স্ত্রী থাকতে আবার বিয়ে করতে এসেছ? ঠক, জোচ্চোর, বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও!
মকর রায় বললেন, যাবে কোথায়! রীতিমত ক্রিমিনাল কাণ্ড, ধাপ্পা দিয়ে রাজকন্যা আর রাজ্য আদায় করতে এসেছে। থাম, মজা টের পাইয়ে দেব।
উদ্ধব দাঁত খিঁচিয়ে কিল দেখিয়ে গট গট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সমস্ত শুনে জগবন্ধু বললেন, ব্যাপারটা ভাল হল না। ওরা অমনি ছাড়বে না, তোমাকে জব্দ করবার চেষ্টা করবে।
উদ্ধব বললেন, গিন্নীর নামটা শুনে হঠাৎ কেমন মন খারাপ হয়ে গেল, সামলাতে পারলুম না। তা যাক গে, কি আর করবে।
দু দিন পরে সলিসিটার গুঁই অ্যাণ্ড হুঁই—এর চিঠি এল।—রাজকুমারী শ্রীযুক্তেশ্বরী স্পন্দচ্ছন্দা চৌধুরানীকে যে মানসিক আঘাত দেওয়া হয়েছে এবং তজ্জনিত তাঁর যে স্বাস্থ্যহানি ঘটেছে তার খেসারত স্বরূপ এক লক্ষ টাকা তিন দিনের মধ্যে পাঠানো চাই, অন্যথায় উমেশ পালের বিরুদ্ধে মকদ্দমা রুজু করা হবে।
জগবন্ধু বললেন, মুশকিলে ফেললে দেখছি। মকদ্দমার ফল যাই হক, হয়রানি আর কেলেঙ্কারি হবে। ভাবিয়ে তুললে হে!
উদ্ধব বললেন, ভাবনা কিসের! মোক্ষম উপায় আমাদের হাতে রয়েছে। ব্যাঙ্গমার কথা মনে নেই?
জগবন্ধু সোৎসাহে বললেন, রাজী আছ তুমি?
—খুব রাজী। শখ মিটে গেছে, হোটেলের জঘন্য রান্না আর খেতে পারি না। দেখ তো পূর্ণিমা কবে।
পাঁজি দেখে জগবন্ধু বললেন, আজই তো!
সন্ধ্যার সময় দুজনে দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে এলেন এবং তিনটি বেলপাতা চিবিয়ে মন্ত্রপাঠ করলেন—বম মহাদেব, সকল বস্তু আগের মতন আবার অস্তু। বলেই একটি ডুব দিলেন।
ঘাটে উঠে মাথা মুছতে মুছতে উদ্ধব বললেন, ওহে জগু, আবার দিব্যি একমাথা টাক হয়েছে, শরীরটাও আড়াইমনী হয়ে গেছে। তোমার কেমন হল?
