—ও, আপনি একজন ক্যাণ্ডিডেট?
উদ্ধব একটু গরম হয়ে বললেন, ক্যাণ্ডিডেট আপনাদের রাজকুমারী, তাঁর তরফ থেকেই তো বিজ্ঞাপনের উত্তরে দরখাস্ত পেয়েছি।
—দরখাস্ত বলছেন কেন। আমিই রাজকুমারী, আপনি দেখা করতে চান তো সন্ধ্যায় আসতে পারেন।
উদ্ধব নীচু গলায় জগবন্ধুকে বললেন, জানিয়ে দিই যে আমরা দুজনে যাব, কি বল? জগবন্ধু বললেন, আরে না না, এসব ব্যাপারে সঙ্গী নেওয়া চলে না।
উত্তর আসতে দেরি হচ্ছে দেখে রাজকুমারী বললেন, হেলো।
উদ্ধব জবাব দিলেন, কিলো।
—ও আবার কি রকম! ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা কইতে জানেন না?
—খুব জানি। আলাপ তো হবেই, এখনই শুরু করলে দোষ কি। আজই সন্ধ্যায় আপনার কাছে যাব।
—আপনাকে বকাটে ছোকরা বলে মনে হচ্ছে।
—ঠিক ধরেছেন। বয়স যদিচ পঁয়ত্রিশ, কিন্তু স্বভাব কুড়ি—পঁচিশের মতন। দেখুন, আপনার গলার সুরটি খাসা। চেহারাটিও ওই রকম হবে তো?
—দেখতেই পাবেন। মশাই নিজে কেমন?
—চমৎকার। দেখলেই মোহিত হয়ে যাবেন?
টেলিফোনের আলাপ শেষ হলে জগবন্ধু বললেন, হাঁ হে উদ্ধব, ভুলে তিনটের জায়গায় চার—পাঁচটা ছোলা খেয়ে ফেল নি তো? ফাজিল ছোকরার মত কথা বলছিলে।
—তিনটেই খেয়েছিলুম। কি জান, ছেলেবেলায় বাবার শাসনে কোনও রকম আড্ডা দেওয়া বা বকামি করবার সুবিধে ছিল না। এখন আবার কাঁচা বয়সে এসে ফুর্তি চাগিয়ে উঠেছে। তুমি কিছু ভেবো না, আমার বুদ্ধি ঠিক আছে, বেচাল হবে না।
জগবন্ধু কিছুতেই সঙ্গে যেতে রাজী হলেন না। অগত্যা উদ্ধব একলাই রাজকুমারী স্পন্দচ্ছন্দা চৌধুরানীর কাছে গেলেন। বাড়িটা জীর্ণ, অনেক কাল মেরামত হয় নি, সামনের বাগানেও জঙ্গল হয়েছে। বৃদ্ধ নায়েব রামশশী সরকার উদ্ধবকে একটি বড় ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। একটু পরে পাশের পর্দা ঠেলে স্পন্দচ্ছন্দা এলেন।
উদ্ধব স্থির করে এসেছেন যে হ্যাংলামি দেখাবেন না, রসিকতা করবেন বটে, কিন্তু মুরুব্বীর চালে। হলেনই বা রাজকুমারী, উদ্ধব নিজেও তো কম কেও—কেটা নন।
ঘরের ল্যাম্প শেড দিয়ে ঢাকা সেজন্য আলো কম। উদ্ধব দেখলেন, স্পন্দচ্ছন্দা লম্বা, দোহারা, কিন্তু মাংসের চেয়ে হাড় বেশী। মেমের চাইতেও ফরসা, গোলাপী গাল, লাল ঠোঁট, লাল নখ, চাঁচা ভুরু, কাঁধ পর্যন্ত ঝোলা কোঁকড়ানো চুল, নীল শাড়ি। জগবন্ধুর শিক্ষা অনুসারে উদ্ধব দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, নমস্কার।
—নমস্কার। আপনি বসুন।
—ইয়ে, দেখুন শ্রীযুক্তেশ্বরী রাজকুমারী পণ্ডচণ্ডা দেবী—
—স্পন্দচ্ছন্দা।
—হাঁ হাঁ স্পন্দচ্ছন্দা। দেখুন, একটি কথা গোড়াতেই নিবেদন করি। আপনার নামটা উচ্চারণ করা বড় শক্ত, আমি হেন জোয়ান মরদ হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। যদি আপনাকে পদীরানী বলি তো কেমন হয়?
—স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন। আমিও আপনাকে উমশে বলব।
সেটা কি ভাল দেখাবে? প্রজাপতির নির্বন্ধে আমি তো আপনার স্বামী হতে পারি। হবু স্বামীকে নাম ধরে ডাকা আমাদের হিঁদু ঘরের দস্তুর নয়।
স্পন্দচ্ছন্দা হি হি করে হেসে বললেন, আপনি দেখছি অজ পাড়াগেঁয়ে।
—আমি আসল শহুরে, চার পুরুষ কলকাতায় বাস। আপনিই তো পাড়াগাঁ থেকে এসেছেন। বেশ, নাম ধরেই ডাকবেন, তাতে আমার ক্ষতিটা কি! এখন কাজের কথা শুরু হক। আমার চেহারাটা কেমন দেখছেন?
—মন্দ কি। একটু বেঁটে আর কালো, তা সেটুকু ক্রমে সয়ে যাবে। আমাকে কেমন দেখছেন।
—খাসা, যেন পটের বিবিটি। অত ফরসা কি করে হলেন?
—আমার গায়ের রংই এই রকম।
উদ্ধব সশব্দে হেসে বললেন, ওগো চণ্ডপণ্ডা পদীরানী, রঙের ব্যাপারে আমাকে ঠকাতে পারবে না, ওই হল আমার ব্যবসা। তুমি এক কোট অস্তরের ওপর তিন পোঁচ পেণ্ট চড়িয়েছ –হবকস জিঙ্ক, একটু পিউড়ি, আর একটু মেটে সিঁদুর। তা লাগিয়েছ বেশ করেছ, কিন্তু জমির আদত রংটি কেমন?
—আপনি অতি অসভ্য।
—আচ্ছা, আচ্ছা, তোমার গায়ের রং তোমারই থাক, আমার তা জানবার দরকার কি। তবে একটা কথা বলি—মূর্তিটা কুমোরটুলি ঢঙের করতে পার নি। যদি আরও বেশী পিউড়ি কি এলামাটি দিতে আর চোখের কাজলটা কান পর্যন্ত টেনে দিতে তবেই খোলতাই হত।
আপনি নিজে কি মাখেন? আলকাতরা?
উদ্ধব সহাস্যে বললেন, সরষের তেল ছাড়া আর কিছুই মাখি না। আমার হচ্ছে খোদ রং, নারকেল ছোবড়া দিয়ে ঘষলেও উঠবে না, একেবারে পাকা। আমার কাছে তঞ্চকতা পাবে না। বয়সও ভাঁড়াতে চাই না, ঠিক পঁয়ত্রিশ। তোমার কত?
—বাইশ।
—উঁহু, বেয়াল্লিশ।
—স্পন্দচ্ছন্দা চেঁচিয়ে বললেন, বাইশ।
আরও চেঁচিয়ে টেবিলে কিল মেরে উদ্ধব বললেন, বেয়াল্লিশ!
—আপনি আমায় অপমান করছেন?
আরে না, না, একটু দরদস্তুর করছি। আচ্ছা, তোমার কথা থাকুক, আমার কথাও থাকুক একটা মাঝামাঝি রফা করা যাক। তোমার বয়স বত্রিশ।
স্পন্দচ্ছন্দা মুখ ভার করে বললেন, বেশ, তাই না হয় হল।
—লেখাপড়া কদ্দুর? মাছ—তরকারি ধোপার হিসেব এসব লিখতে পারবে?
নাকটি ওপর দিকে তুলে স্পন্দচ্ছন্দা বললেন মেমের কাছে এম. এ. ক্লাসের চাইতে বেশী পড়েছি। মশায়ের বিদ্যে কতদূর?
—ফোর্থ কেলাস পর্যন্ত। তবে রবিঠাকুর জানি—ওরে দুরাচার হিন্দু কুলাঙ্গার এই কি তোদের—
কানে আঙ্গুল দিয়ে স্পন্দচ্ছন্দা বললেন, থাক থাক, খুব হয়েছে। আয় কত?
—তোমার কোনও চিন্তা নেই। ব্যাঙ্কে খোঁজ নিলেই জানতে পারবে যে আমার দেদার টাকা আছে। বাড়ি, গাড়ি, আসবাব, গহনা, সবই তোমার মনের মতন হবে। তোমার এস্টেটের আয় কত?
